নির্বাচিত কলামরাজনীতি

পরাজিত চাচার ভাতিজিবিরোধী প্রলাপ

আবদুল গাফফার চৌধুরী

এটা অনেকটা সোহরাব-রুস্তমের গল্পের মতো। পিতা রুস্তমকে খুঁজতে বেরিয়ে পুত্র সোহরাব পিতার হাতেই নিহত হয়েছিলেন। বাংলাদেশে ৩০ ডিসেম্বর যে নির্বাচন যুদ্ধটি হলো, তাকে চাচা-ভাতিজির লড়াই বলা চলে। এ যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য হলো, চাচার হাতে ভাতিজি নয়, ভাতিজির হাতে চাচার পরাজয় হয়েছে। তিনি নিহত হননি বটে; তবে তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ পরাজয় ঘটেছে। তিনি এখন রাজনীতি থেকে অবসর না নিলে রাজনীতিই তাকে অবসর দেবে।

আমার সহৃদয় পাঠকবৃন্দ আশা করি বুঝতে পেরেছেন, আমি চাচা-ভাতিজি বলতে কাদের বোঝাচ্ছি। একজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যজন বিএনপি-জামায়াতের নতুন জোটের নেতা শেখ হাসিনার এককালের ‘বিগ আঙ্কেল’ ড. কামাল হোসেন। ঢাকার কাগজে খবর দেখলাম, তিনি ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ে লজ্জা পাননি। ৯ জানুয়ারির ডেটলাইনের খবরে বলা হয়েছে, তিনি বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গীদের নিয়ে বৈঠক করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এই কর্মসূচি হলো- নতুন নির্বাচনের দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা, নতুন করে সংলাপ এবং দাবি আদায়ে জেলা সফর।

এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে ড. কামাল হোসেন তার পুরনো আপ্তবাক্যটি আবার উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, ‘জনগণের ভোটের অধিকার তার ভাতিজির সরকার কেড়ে নিয়েছে। তিনি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করবেন। তার কাছে অনেকের প্রশ্ন, তার সারাজীবনের রাজনীতিতে তিনি কখনও জনগণকে সঙ্গে পেয়েছেন, না জনগণ তাকে সঙ্গে পেয়েছে? ভাতিজির সঙ্গে যুদ্ধে সফল হওয়ার জন্য তিনি এবারের নির্বাচনে প্রকাশ্যে জনগণের শত্রুশিবিরে যোগ দিয়েছেন। জনগণ আবারও তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ড. কামালের এই দশা দেখে পুঁথির ভাষায় বলতে ইচ্ছা করে- ‘ভাতিজির সঙ্গে রণে চাচা কুপোকাৎ/ভূমিশয্যা থেকে চাচা দিনকে বলেন রাত।’

ড. কামালের নাম যদি একদিন মধ্যযুগের ভারতের বৈরাম খাঁ এবং বর্তমান যুগের ভারতের কামরাজের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বিস্মিত হবো না। মোগল সম্রাট হুমায়ুন যখন মারা যান, তখন তার পুত্র আকবরের বয়স ছিল চার বছর। বৈরাম খাঁ ছিলেন হুমায়ুনের সেনাপতি। তিনি দিল্লির সিংহাসনে বসতে পারবেন না জেনে একটা মতলব আঁটেন। শিশু আকবরকে সিংহাসনে বসিয়ে তিনি তার নামে রাজ্য চালাবেন এবং প্রকারান্তরে প্রকৃত বাদশা হয়ে থাকবেন ভেবেছিলেন। কার্যত তিনি তাই হয়েছিলেন।

আকবর ১২ বছর (কেউ কেউ বলেন ১৪ বছর) বয়সে পা দেওয়ার পর বৈরাম খাঁর চালাকি বুঝতে পারলেন এবং নিজেও একটি বুদ্ধি আঁটলেন। তিনি বৈরাম খাঁকে বললেন- চাচা, আপনার বয়স হয়েছে। মক্কায় গিয়ে পবিত্র হজ সেরে আসুন। বৈরাম খাঁ খুশিমনে মক্কায় রওনা হলেন। পথিমধ্যে গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন। তাকে আর দিল্লি ফিরে আসতে হয়নি। এ যুগের ভারতের কামরাজের পরিণতিও কম ট্র্যাজিক নয়।

নেহরুর মৃত্যুর পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তার আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। প্রধানমন্ত্রী পদের উমেদার হন কট্টর ডানপন্থি মোরারজি দেশাই। কামরাজ ছিলেন নেহরুর ডান হাত। কিন্তু দেশাইয়ের সঙ্গে লড়াইয়ে তার পেরে ওঠার সম্ভাবনা ছিল না। তিনি ফন্দি আঁটলেন, নেহরুর ক্যারিশমার উত্তরাধিকারী এবং কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে মোরারজির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী করে প্রধানমন্ত্রী পদে বসানো গেলে অদূর ভবিষ্যতে কামরাজের প্রধানমন্ত্রী হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না।

কামরাজের গণনা ছিল, ইন্দিরা একজন বিধবা নারী। তার পক্ষে ভারতের মতো বিশাল দেশের জটিল রাজনীতির তাল সামলানো সম্ভব হবে না। মোরারজি দেশাইও পরাজিত হলে রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে অন্তর্হিত হবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পদটি পাকা ফলের মতো কামরাজের কোলেই এসে পড়বে। এই পরিকল্পনা থেকে ইন্দিরা বনাম দেশাই নির্বাচনী যুদ্ধে কামরাজ তার দলবল নিয়ে ইন্দিরার পক্ষাবলম্বন করেন এবং ইন্দিরা জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। কামরাজ ঘোঁট পাকাতে থাকেন, কখন ইন্দিরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন এবং কামরাজ নিজে কী করে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসার সুযোগ পান।

নেহরু-কন্যাকে চিনতে ভুল করেছিলেন কামরাজ। কিছুদিনের মধ্যে কংগ্রেসের ধুরন্ধর নেতারাও বুঝতে পারলেন, ইন্দিরাকে হটানো সহজ নয়। কামরাজকে কিছুদিনের মধ্যেই কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বিদায় নিতে হয়; এমনকি রাজনীতি থেকেও। তিনি বাংলাদেশের ড. কামাল হোসেনের মতো অদূরদর্শী ছিলেন না। রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি আর ইন্দিরাবিরোধী কোনো চক্রান্তে যোগ দিতে যাননি। কংগ্রেসের কিছু আদি নেতা ইন্দিরাবিরোধী আদি কংগ্রেস গঠন করতে গিয়ে আদিতে বিলীন হয়ে গেছেন।

আমি অতীতেও বহুবার ড. কামাল হোসেনকে আমার কলামে সতর্ক করেছি এই বলে যে, শেখ হাসিনাকে আন্ডার এস্টিমেট করবেন না। আপনি আইনবিশারদ হতে পারেন, রাজনীতিবিশারদ নন। রাজনীতিবিশারদ হলে ‘৭২-এর অন্যতম সংবিধান প্রণেতাকে আজ জামায়াত-বিএনপি শিবিরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হতো না।

তিনি চরিত্রে অহঙ্কারী এবং সুবিধাবাদী। বিশ্বাস করেন মুসলিম জাতীয়তাবাদে; কিন্তু সুযোগ-সুবিধার লোভে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমর্থক সেজেছিলেন। খন্দকার মোশতাকের পর আওয়ামী লীগের ডানপন্থিদের নেতা হন তিনি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কিছুকাল আগে থেকেই তার আসল চরিত্র উন্মোচিত হতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল পদ্ধতি টিকবে না ভেবে বাকশাল মন্ত্রিসভায় শপথ না নিয়ে একটি বই লেখার অজুহাতে দীর্ঘকালের জন্য অক্সফোর্ডে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে বাকশাল টিকে গেছে ভেবে দেশে ফিরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে শপথ নেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি আবার অক্সফোর্ডে এসে আশ্রয় নেন। সর্বপ্রথম লন্ডনেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা সামরিক শাসনবিরোধী যে আন্দোলন গড়ে তোলে, তিনি তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। যখন এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল, জিয়া হটাও আন্দোলন দেশে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরার জন্য শেখ হাসিনার ডাক পড়তে পারে, তখন তিনি দেশে ফেরায় এবং হাসিনাকে দলের নেতার পদে বসানোর উদ্যোগে অংশ নেন। হাসিনা-রেহানার বিগ আঙ্কেল হয়ে ওঠেন।

এখন বোঝাই যায় এই উদ্যোগে তার অংশগ্রহণ ছিল উদ্দেশ্যমূলক। ভারতের কামরাজের মতো ভেবেছিলেন, দেশ শাসনে অনভিজ্ঞ হাসিনা দলনেত্রী হয়ে কী করবেন? ঘর-সংসার সামলাবেন, না বাংলাদেশের অস্থির ও জটিল রাজনীতির লাগাম টেনে ধরতে পারবেন? তারপর তো রয়েছে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস তার নেই। যার নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের প্রবীণ ও নবীন নেতারাও মেনে নেবেন না। সুতরাং শেখ হাসিনার কাঁধে বন্দুক রেখে স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময়টা মোটামুটি নিরাপদে কাটাবেন। গণআন্দোলন সফল হলে সরকার গঠনের সময় তার নেতৃত্ব গ্রহণের দাবিটাই অগ্রাধিকার পাবে। তিনি শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রগণ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন নেতা। দেশের জটিল মুহূর্তে তার মতো নেতাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এখন মেনে নিতে চাইবে।

তার এই ক্যালকুলেশন সঠিক হয়নি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেমন দলের নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকে মেনে নিয়েছে, তেমনি পার্লামেন্টারি রাজনীতিতেও সেই নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কামাল হোসেনের কামরাজি বুদ্ধি এখানে ব্যর্থ হয়েছে। এখানেই শেখ হাসিনার ওপর এই বর্ষীয়ান নেতার যত রাগ।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শেখ হাসিনার পার্থক্য এই যে, ইন্দিরা ক্ষমতায় এসেই কামরাজকে দল ও দেশের রাজনীতি থেকে তাড়িয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ড. কামালের সঙ্গে সেই আচরণ করেননি। তাকে সম্মানের সঙ্গে দলের নেতৃত্বে রেখেছেন। দলের ভেতরে বসে পিতৃপ্রতিম এই লোকটি কন্যাসম হাসিনার বিরুদ্ধে চক্রান্তের পর চক্রান্ত আঁটছেন; তা জেনেও তাকে দল থেকে বহিস্কার করেননি। চক্রান্ত সফল করতে না পারায় নিজেই বেরিয়ে গেছেন দল থেকে কামাল।

দলে থাকার সময় তিনি ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে যোগ দেওয়ার জন্য তার চাচাত্ব জাহির করে শেখ হাসিনাকে বাধ্য করেছিলেন। আবার পরাজিত হলে সংসদ বর্জনের জন্য হাসিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। এমনকি এই পরাজয়ের একক দায়িত্ব শেখ হাসিনার ওপর চাপিয়ে তাকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তা ব্যর্থ হওয়ার পর দলত্যাগ করে গণফোরাম নামে নতুন দল গঠন করেন। ইচ্ছা ছিল আওয়ামী লীগ ভাঙার। তাতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।

তারপর ভাতিজির বিরুদ্ধে একটার পর একটা চক্রান্ত করেছেন। সবগুলোতে পরাস্ত হয়েছেন। সাহাবুদ্দীন-লতিফুর কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনের সময় বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীর সঙ্গে তার আঁতাত, এক-এগারোর সময় সাবজেলে বন্দি শেখ হাসিনাকে আইনি সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি, শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে অপসারণের জন্য ‘মাইনাস টু থিয়োরি’ উদ্ভাবন, সাবেক মার্কিন বিদেশমন্ত্রী হিলারির সহায়তায় ড. ইউনূসের হাসিনাবিরোধী তৎপরতায় ইন্ধন জোগানো, তার জামাতার জামায়াতিদের অঘোষিত লবিস্ট হিসেবে ভূমিকা গ্রহণ, সর্বশেষ হাসিনাবিদ্বেষে অন্ধ হয়ে বিএনপি-জামায়াত শিবিরে প্রকাশ্যে যোগ দিয়ে হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা এবং তাতে আবারও ব্যর্থতা তাকে এখন প্রায় উন্মাদ করে ফেলেছে। তিনি প্রলাপ বকতে শুরু করেছেন।

এই নির্বাচন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার হয়নি, আবার নির্বাচন দিতে হবে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নতুন নির্বাচন আদায় করব- এসব হচ্ছে তার এখনকার প্রলাপোক্তি। আর এই প্রলাপোক্তির মধ্য দিয়ে একটা সারসত্তা বেরিয়ে এসেছে, চাচাজি এবারের যুদ্ধেও ভাতিজির কাছে পরাজিত হয়েছেন।

সম্ভবত এটাই চাচাজির শেষ যুদ্ধ এবং শেষবারের পরাজয়। ইতিহাসে বৈরাম খাঁ, কামরাজের সঙ্গেই তার নাম যুক্ত হবে।

লন্ডন, ১৮ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০১৯

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension