
বিদেশি ঋণনির্ভর ‘উন্নয়ন’ চর্চার ফল
আনু মুহাম্মদ
সরকার যেসব বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে কিংবা নিচ্ছে, তার আকার ও বরাদ্দ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এসব প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দের কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই, এর যৌক্তিক বিন্যাসেরও কোনো ব্যবস্থা নেই, যৌক্তিকতা বিচারের কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও আর কার্যকর নেই। তার ফলে এগুলোর ব্যয় অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ২-৩ গুণ, এমনকি ১০ গুণ বেশি হলেও তার জবাবদিহির কোনো প্রক্রিয়া নেই। বরং সরকারি অনুমোদন নিয়েই এগুলোর ব্যয় শনৈঃ শনৈঃ বেড়ে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, সড়ক, মহাসড়ক, ফ্লাইওভার, রেলপথ, সেতু- সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ব্যয় বিশ্বে সর্বোচ্চ। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার কোনো দেশেই এত ব্যয় হয় না। এর পেছনে ঊর্ধ্বমুখী কমিশন এবং ঋণদাতা সংস্থা বা সরকার প্রভাবিত ঠিকাদার নিয়োগ অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়। গত ৬ বছরে এই অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধিতে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে।
বাংলাদেশে এখন নির্মাণ খাত সবচেয়ে বর্ধনশীল। ইটভাটা অসংখ্য, বৈধ যত তার চেয়ে অবৈধের সংখ্যা বেশি। সিমেন্ট কারখানার সংখ্যাও বেড়েছে। শীতলক্ষ্যাসহ বিভিন্ন নদীর বাতাসে পানিতে এর প্রবল ছোঁয়া পাওয়া যায়। দূষণ রোধের কোনো ব্যবস্থা কাজ করে না। রডের উৎপাদন বেড়েছে। নিয়ম মেনে বা না মেনে বালু তোলার পরিমাণ বেড়েছে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফার্নিচারের ব্যবসাও বেড়েছে। এর জন্য বনের গাছের ব্যবসা ভালো। দেশে নির্বিচারে বনজঙ্গল উজাড় করায় প্রশাসন বরাবর সক্রিয় সহযোগী।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও পরিবেশ বিনাশের ক্ষেত্রে অগ্রণী। দায়মুক্তি আইন এ ক্ষেত্রে অন্যতম রক্ষাকবচ। সরকার দেশের বিদ্যমান আইন ও নিয়মনীতি অমান্য করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিকে উচ্চমূল্যে কাজ দিচ্ছে, আইনের হাত থেকে বাঁচার জন্য ২০১০ সাল থেকে সরকার চলছে ‘দায়মুক্তি আইন’ ঢাল দিয়ে। নানা সুবিধা ছাড়াও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষতির দায় থেকে বাঁচানোর জন্য দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে রাশিয়ান ও ভারতীয়সহ বিদেশি কোম্পানিকেও (রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দ্রষ্টব্য)। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশি-বিদেশি কোম্পানির উচ্চলাভ নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশে কয়লা, পারমাণবিক ও এলএনজি-নির্ভর ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। বন, জমি, উপকূল বিনাশ, অধিক ঋণ ও বিদেশ নির্ভরতা এবং ব্যয়বহুল এই পথ নেওয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে বিদ্যুতের চাহিদার কথা। কিন্তু যখন পরিবেশবান্ধব, সুলভ এবং টেকসই বিকল্প পথ দেখানো হচ্ছে, তখন সরকার সেদিকে যাচ্ছে না। কারণ সেই পথ দেশ ও জনগণের জন্য অনেক নির্ভরযোগ্য হলেও করপোরেট গোষ্ঠীর তাতে লাভ নেই; আমলা, মন্ত্রীদের কমিশনের সুযোগ নেই।
আরেকটি ক্ষেত্র সর্বজনের অর্থ দিয়ে বিশাল কেনাকাটা। যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে, কাজ নেই; বাস কেনা হচ্ছে, কিছু দিন পরই সেগুলো হাওয়া; ডেমু ট্রেন কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই তার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হচ্ছে; সিসিটিভি কেনা হচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনের সময় তা নষ্ট; ঋণ করে সাবমেরিনসহ সমরাস্ত্র কেনা হচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ করে শত শত বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই সেগুলো বিকল হচ্ছে; কেনা হচ্ছে গাড়ি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে গাড়ির মডেল পরিবর্তন করা, আরও বড়, আরও দামি গাড়ি কেনার পথে প্রবল উৎসাহ। সর্বজনের অর্থ যে কোনোভাবে বরাদ্দে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু এই অর্থ জোগাড়ে বাড়ছে মানুষের ওপরই চাপ। গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, ভ্যাট বসছে সর্বত্র, খাজনা বাড়ছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতও এখন কিছু লোকের খুব দ্রুত টাকার মালিক হওয়ার জায়গা। এর অন্যতম সুফলভোগী কতিপয় শিক্ষকও। প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং আর টিউশনি নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন বিষময়। শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করার কারণে গাইড বই, কোচিং বাণিজ্যের পথ খুলেছে। চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। চিকিৎসা খাতের অবস্থাও তাই। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে একদিকে জৌলুস বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের ওপর বোঝাও বাড়ছে। জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ বিশ্বে নিচের সারিতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, জিডিপি অনুপাতে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আনুপাতিক হারে ব্যয় কম। ফলে সর্বজন প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সংকটগ্রস্ত, লাখো শিক্ষকের জীবনও বিপর্যস্ত। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার বহু প্রতিষ্ঠানের অনাহারি শিক্ষকরা বারবার ঢাকা আসেন; কিন্তু তাদের ন্যায্য দাবি পূরণ হয় না। তারা অনশনও করেছেন বহুবার। নন-এমপিও এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন টিচারস অ্যান্ড এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ নিকট অতীতে ঢাকায় এসে বলেছিলেন, ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই দাবি নিয়ে আমরা ২৮ বার ঢাকা শহরে এসেছি। কোনো কাজ হয় নি।
উন্নয়নের ধরনে যদি দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, জবাবহীনতা, দখল, দূষণ থাকে অর্থাৎ যদি উন্নয়ন প্রকল্প অতি উচ্চমাত্রায় সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি-বিপর্যয়ের কারণ হয়, তাহলে তা কুশাসন অবধারিত করে তোলে। ব্যবসা-লবিস্ট-রাজনীতিবিদ প্রশাসনের দুষ্ট আঁতাত আরও অনেক অপরাধ-সহিংসতাকেও ডাকে। বলপূর্বক টেন্ডার দখল, জমি-ব্যবসা দখল করতে গিয়ে খুন, রাষ্ট্রীয় সংস্থায় সহযোগিতা, গুম, আটক বাণিজ্য, দরকষাকষি- এগুলোও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যায়। প্রশাসন আর দল একাকার হয়ে গেলে দ্রুত অর্থ উপার্জনের বল্কগ্দাহীন প্রতিযোগিতা চলবেই। বাড়তেই থাকবে ধর্ষণ, নারী-শিশু-সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতন এবং সরকারি দলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর হানাহানি। এসব কিছু মিলিয়েই পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির জৌলুস বাড়তে থাকে প্রাণ-প্রকৃতির বিনাশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা-অপমান বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে।
তাই পুঁজি সংবর্ধনের এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে প্রাণ-প্রকৃতির অভূতপূর্ব বিপর্যয় হয়েছে। কারণ এই ‘উন্নয়ন’ ধারার মূল কথাই হলো প্রকৃতিকে নির্বিচারে শোষণ ও দখল করা। সামাজিক পরিবেশগত ফলাফল বিবেচনা না করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিবেচনা না করে চটজলদি মুনাফার লক্ষ্যে সব তৎপরতা পরিচালনা তাই এই দৃষ্টিতে যৌক্তিক। অতীতে নদী-নালা, খাল-বিল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে শত হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প করা হয়েছে, এখন দেখছি এর ফল স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশ বিপর্যয়। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধ, কৃত্রিম রঙ ব্যবহারের ফলে পানি দূষণ এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর বিষ প্রভাব পড়েছে মৎস্য, বৃক্ষ, তরুলতাসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর। বর্তমান নিরাপদ খাদ্যের সংকট, পানি দূষণ সবকিছুই ওই বিদেশি ঋণনির্ভর ‘উন্নয়ন’ চর্চার ফলাফল।
গত তিন দশকে একদিকে পাহাড় ও সমতলের বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক বনায়নের লক্ষ্যে বিদেশি ঋণের টাকায় এমন সব আমদানি করা গাছ লাগানো হয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে বেমানান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিকর। এসব গাছে পাখি বসে না, এসব গাছপালা অন্যান্য গাছ কিংবা তরুলতা টিকে থাকতে দেয় না। ফুল, ফলহীন এসব গাছ গবাদিপশুকেও সমর্থন দেয় না। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, সুপারি, শাল, গর্জন কিংবা বটগাছ না লাগিয়ে এসব আমদানি করা গাছ লাগানোর ফলে প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং নাজুকতা তৈরি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল প্রধানত বনাঞ্চল, সেখানে নিরাপত্তার নামে বন বিনাশ এবং পাহাড় দখল প্রক্রিয়া চলছে কয়েক দশক ধরে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা, বন বিনাশ ইত্যাদির কারণ চিহ্নিত। এর নিরসন হবে কী করে?
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



