নির্বাচিত কলামমুক্তমত

সংখ্যালঘু নির্যাতন, মার্কিন তথ্যপত্র ও সরকারি প্রতিশ্রুতি


সাইফুর রহমান তপন

দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বীর ওপর নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। যে কোনো অছিলায় হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা চলছেই। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের একটি গ্রামে। এক কিশোরের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মহানবীকে (সা.) অবমাননার অভিযোগ তুলে শনিবার রাতে অভিযুক্তের স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িঘরে হামলা ও লুটতরাজ করেছে এক দল লোক।

স্থানীয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ওই কিশোর অভিযোগটি অস্বীকার করেছে। তার স্বজনদেরও একই মত। ঘটনাস্থল ঘুরে আসা কয়েক সাংবাদিককে উদ্ধৃত করে মঙ্গলবার বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, বিতর্কিত ফেসবুক পোস্ট যে ওই কিশোরের– তা নিশ্চিত নয়। তারপরও নিজেরা হামলা থেকে বাঁচবেন– এ আশায় স্থানীয়রাই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু অতীতের মতোই এতে তাদের শেষ রক্ষা হলো না। মাইকে উস্কানি দিয়ে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে।

ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে। কক্সবাজারের রামুতে সংঘটিত ওই ঘটনায় আক্রান্ত ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ। এরপর একে একে পাবনার সাঁথিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, সুনামগঞ্জের শাল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কায়দায় হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গঙ্গাচড়ার মতো অভিযোগ ওঠার পরপরই অভিযুক্তকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলেও হামলা থেকে অভিযুক্তের স্বজন ও প্রতিবেশীরা রেহাই পাননি। যেন বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিকার নয়, হিন্দুদের ওপর হামলাই মহলবিশেষের আরাধ্য।

অদ্ভুত বিষয়, অতীতের ঘটনাগুলোর মতো গঙ্গাচড়ার ঘটনায়ও যথেষ্ট সময় পাওয়ার পরও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরীহ মানুষদের নিরাপত্তা বিধান করতে পারেনি। বরং হামলাকারীদেরই যেন সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিবিসি বাংলায় প্রচারিত স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘বিষয়টি নজরে আসার পর ওসি আমাকে জানান। সেদিনই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। এর পরও সেদিন রাত ২টা পর্যন্ত আন্দোলন করে একটি পক্ষ। আমরা কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করি। রোববার আবার দুই-তিন হাজার মানুষ আক্রমণ করে।’

হ্যাঁ, স্থানীয়রাও বলেছেন, শনিবার রাতে পুলিশ ও সেনাসদস্যরা এলাকায় গিয়েছিলেন, তবে বেশিক্ষণ থাকেননি তারা। যে কাজটি তারা রোববারের হামলার পর করতে পারলেন, সেটি শনিবারই করলেন না কেন? রহস্যই বটে।

মনে আছে, ২০২১ সালে দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লার পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখাকে কেন্দ্র করে একযোগে সে শহরে এবং নোয়াখালী ও চাঁদপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়। এতে নোয়াখালীতে এমনকি একজন পূজারি মারাও যান। অন্যদিকে, এই নৃশংসতা দেখেও সে সময় রংপুরের পীরগঞ্জের হিন্দুপল্লিতে কোনো শক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তখন রংপুর জেলা পুলিশপ্রধান অর্থাৎ এসপি নিজেও ছিলেন সনাতন ধর্মী। তিনি নাকি গঙ্গাচড়ার মতোই পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক হামলার হুমকি আছে এমন এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছিলেন। তখন অবশ্য জনপরিসরে আলোচনা উঠেছিল, সরকার ইচ্ছা করেই সেখানে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নিতে শৈথিল্য দেখিয়েছিল এই মনোভাব থেকে, সনাতনীরা বুঝুক ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্ব।

বলে রাখা দরকার, ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগের সমর্থক হলেও ওই সময়ে প্রতিকারহীন একের পর এক সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনায় সরকারি দলের ওপর ওই মানুষরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। এমনকি নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে এমন আলোচনাও ছিল। এর আরেকটা কারণ ছিল এই যে, রামুর ঘটনাসহ কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাতেই ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাননি, যদিও প্রতিটি ঘটনার পর খোদ সরকারপ্রধান তাদের এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছিলেন; এমনকি মামলাও হয়েছিল অনেক।

বিগত সরকার না হয় রাজনৈতিক হীন স্বার্থে সংখ্যালঘুদের কার্যকর সুরক্ষা দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও একই পথের যাত্রী হলো কেন? তারা যে শুধু গঙ্গাচড়ায় হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে, তা নয়; গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে প্রায় সারাদেশেই ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসা সহিংসতাকে অনেক দিন পর্যন্ত ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। বলা হয়, ভুক্তভোগীরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাই তারা ‘জনরোষের শিকার’। যেন আওয়ামী লীগই সমর্থক মাত্রই নির্যাতনযোগ্য। এখানে সংবিধান, আইনের শাসন কোনো কিছুর বালাই নেই। অবশ্য, পরবর্তী সময়ে দেশি-বিদেশি চাপে কিছু ঘটনার সত্যতা সরকার স্বীকার করেছে, অনেক মামলাও হয়েছে, যদিও বিচার কী হচ্ছে কেউ জানে না।

রামু থেকে সাঁথিয়া, নাসিরনগর, শাল্লা ইত্যাদি ঘটনায় যেসব ফেসবুক পোস্ট নিয়ে এত তুলকালাম ঘটে গেল, সেই অভিযোগগুলোও কি পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হযেছে? একটাও না। তাহলে আইনে প্রাইমা ফেসি বা প্রথম দর্শনে কোনো অভিযোগ প্রমাণযোগ্য বা ভিত্তিহীন মনে করার যে রীতি আছে তা গঙ্গাচড়ায় প্রয়োগ করা হলো না কেন? কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ওঠা মানেই তো তিনি অপরাধী নন। সরকার এবং তার প্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি এ বিষয়ে অন্তত একটা বা দুটি ঘটনায়ও জনমত গঠনে তৎপর হতো তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।

আলোচ্য ফেসবুক পোস্ট সত্যিই গঙ্গাচড়ার ওই কিশোরের কিনা- তা প্রমাণে কি খুব সময় লাগত? তেমন কোনো প্রচেষ্টা আমরা পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনকে করতে দেখিনি। করলে কিন্তু সম্প্রতি সরকার অনেক খেটেখুটে বিগত আমলের ভয়ংকর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের জায়গায় সাইবার সুরক্ষা আইন তৈরি করল, সেটিও হয়রানির উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকত না।

মনে রাখতে হবে, গঙ্গাচড়ার ঘটনার মাত্র পাঁচ দিন আগে ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার বিষয়ে ‘তথ্যপত্র’ প্রকাশ করেছে। সেখানে ইতোপূর্বে সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাবলির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনের সময়ও এমন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করা হয়েছে। এমনকি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত কমিশনগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কোনো প্রতিনিধি না থাকার বিষয়ও ওই তথ্যপত্রে আছে। দেশের জনগণকে না হয় সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ভারতীয় অপপ্রচার বলে প্রবোধ দেওয়া হলো, আন্তর্জাতিক মহলকে কী জবাব দেওয়া হবে?

অন্তর্বর্তী সরকারের কিন্তু অতীতের রাজনৈতিক সরকারগুলোর চেয়ে সব দিক থেকেই ভিন্ন হওয়ার কথা। সংখ্যালঘু অধিকারও এতে অন্তর্ভুক্ত। সম্ভবত এ কারণেই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে অতীত সরকারগুলোর উদাসীনতার প্রভাব যদি এই সরকারের মধ্যেও থাকে, তাহলে ওই প্রতিশ্রুতি যেমন বুলিসর্বস্ব রয়ে যাবে তেমনি জাতীয় ঐক্য ও সংহতিও দুর্বল থেকে দুর্বলতর হবে; কোনো নাগরিকেরই তা কাঙ্ক্ষিত নয়।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension