
প্রয়োজন মৌলিক পরিবর্তন

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
দেশের শাসকেরা নির্বাচনকে খুবই গুরুত্ব দেয়; সেটা তাদের জন্য সংগত কাজ বটে, নির্বাচনই হচ্ছে তাদের জন্য ক্ষমতায় ওঠা ও থাকার বৈধ উপায়। কিন্তু নির্বাচন সরকার বদলাতে পারে ঠিকই, সব সময়ে যে পারে তাও নয়, কিন্তু নির্বাচন সমাজ বদলাবে– এ কথা কে কবে শুনেছে! আমাদের দেশেও তেমনটি ঘটেনি।
১৯৪৬-এ জনগণ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ফল হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দেশ বিভাগ। ১৯৫৪-তে নির্বাচন হয়েছে। মানুষ আবার আশা করেছে পরিবর্তনের, কিন্তু যা পেয়েছে তা হলো সামরিক শাসন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাংলার মানুষ রায় দিয়েছে স্বাধীনতার পক্ষে; পেয়েছে গণহত্যা ও যুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো তাতে জনগণের মুক্তি আসেনি, ধনীরা রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে এবং সমাজ রয়ে গেছে আগের মতোই বৈষম্যমূলক, দারিদ্র্যপীড়িত এবং নিপীড়নে জর্জরিত।
মানুষের ভেতর হতাশা দেখা দিয়েছে। কেননা, সমাজ পরিবর্তনের পক্ষের শক্তি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। বামপন্থিরা অতীতে নানা রকম ভুল করেছে, এখনও তাদের একাংশ ভাবছে, শাসক শ্রেণির সঙ্গে থেকেই মানুষকে মুক্ত করতে পারবে। এতে ফল যা হবে তা হলো ওই বামপন্থিরা জনগণের আস্থা এবং নিজেদের শক্তি দুটোই হারিয়ে হয় একেবারে বিলীন নয়তো অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়বে। জনগণের পক্ষে তাদের কাছ থেকে আশা করবার তেমন কিছু থাকবে না।
যেটা প্রয়োজন তা হলো মুক্তির সংগ্রামকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই সংগ্রাম একাত্তরে শুরুও হয়নি, শেষও হয়নি। একাত্তরের আন্দোলন একটি চরম রূপ ধারণ করেছিল মাত্র। সংগ্রামটা এখনও আছে; স্তিমিত আকারে হলেও। তাকে বেগবান ও গভীর করা প্রয়োজন; করতে হবে শাসক শ্রেণির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে; তার বিরুদ্ধে এবং সমাজে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনবার লক্ষ্যে। সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই কেবল সম্ভব হবে দেশবাসীকে স্বাধীন করা; তখন সমাজে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে; ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে; সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে; ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী উৎপাত এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন দুটোই প্রতিহত হবে। স্বাধীনতা ছিনতাইয়ের ভয় একেবারে উধাও না হলেও অনেকটা কমে যাবে। যেখানে ন্যায়বিচার থাকে না সেখানে প্রতিহিংসাপরায়ণতা দেখা দেয়, যেমনটা আমাদের সমাজে দেখা দিয়েছে। বেকারত্ব যেখানে ক্রমবর্ধমান তেমন সমাজে নৈতিকতার মান নিচে নামতে বাধ্য।
অভাবী মানুষ বাঁচার জন্য যে কোনো কাজ করতে পারে, ছিনতাই-রাহাজানি তো বটেই: এমনকি মানুষ খুন করতেও সে পিছপা হয় না। তাকে নেশায় পায়; সে মাদকাসক্ত হয়।
সমাধানটা তাহলে কী? আইনের শাসন? সেটা যে প্রতিষ্ঠা পাবে– এমন লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছে না। তা ছাড়া আইন জিনিসটা মানে কী? সে তো সমাজে যারা সুবিধাপ্রাপ্ত তাদের স্বার্থ দেখার জন্যই রচিত; তার বাইরে কিছু নয়। আর সেই আইনগুলোর সুযোগ তারাই নিতে পারে যাদের হাতে ক্ষমতা রয়েছে; টাকা ও রাজনৈতিক প্রভাবের, সমাজে যারা নানা মাপের ঈশ্বর। গরিব মানুষের জন্য আইন কোনো সুবিধা আনে না। সংবিধানের কথা বলা হয়। সংবিধান নাগরিকদের অধিকার দেয়। বাংলাদেশের সংবিধানে সাম্যের কথা ছিল। সংবিধানের ভিত্তিভূমির অন্যতম ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। সেটা যে কেবল রাষ্ট্র এবং ধর্মকে পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র রাখতে চেয়েছে, তা নয়। সব ধর্মের মানুষের মধ্যে অধিকার ও সুযোগের যে সাম্য প্রতিষ্ঠা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একেবারে প্রথম শর্ত– সেটিও পূরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মূলনীতির তালিকায় ধর্মনিরপেক্ষতা এখন আর নেই। যার অর্থ হলো রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক, তথা অগণতান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। সংবিধানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়েছিল, সে লক্ষ্যও এখন নিশ্চিহ্ন। অর্থাৎ কিনা গণতান্ত্রিক সামাজিকতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ ক্রমাগত সংকীর্ণ হয়ে আসছে। আর ঠিক তার বিপরীতে গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু যে বৈষম্য, তার বৃদ্ধিতে কোনো কমতি নেই। ফলে মানবিকতা তো অবশ্যই, মনুষ্যত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
হৃদয় পরিবর্তন, বিবেকের উদ্বোধন– এসব বাণী অনেক শোনা গেছে। কিন্তু কার্যকর হয়নি। ক’জনের হৃদয় পরিবর্তন করবেন? কতটুকু? ব্যক্তিগত বিবেকের ক্ষমতাই বা কতটা? আমরা চাইব সমষ্টিগত হৃদয় পরিবর্তন, সামাজিক বিবেকের প্রবহমানতা। সেটা নিশ্চিত করতে গেলে যা দরকার তা হলো সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। সংস্কার নয়, মৌলিক পরিবর্তন চাই। চাই গণতান্ত্রিক সামাজিকতার সুসংহত প্রতিষ্ঠা। এ জন্য আন্দোলন ভিন্ন কোনো উপায় নেই।
যে কোনো আন্দোলনেই ইতির দিকের পাশাপাশি নেতির দিক থাকে। কেবল সৃষ্টি করাই যথেষ্ট নয়; সৃষ্টির পরে ক্ষতিকর যে আবর্জনা পড়ে থাকে তাকে নিয়মিত ঝাড় দেওয়া দরকার। এক হাতে গড়া অপর হাতে পরিষ্কার করা। এই যে আবর্জনা সরিয়ে ফেলার ব্যাপারটা, ওইখানে আসে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার আবশ্যকতা। বিশেষ করে সামাজিক শত্রুদের। মীরজাফরদের। এদের শাস্তি দেওয়া কঠিন। কেননা, এরা একাধারে নিজেরা শক্তিধর এবং শক্তিধরদের আপনজন। কিন্তু শাস্তি তো না দিলেই নয়। কীভাবে দেওয়া যায়, তার লক্ষণ তো আমরা দেখছি না। বিপরীতে দেখছি অপরাধীদেরই প্রাধান্য রাষ্ট্র ও সরকারে। সেখানে কিছু মীরজাফর দেখা দিয়েছে যারা নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের কাছে দেশের ভূমি, বন্দর, করিডোর তুলে দেবার দালালি করছে। প্রতিবাদী মানুষ কেবল যে সাম্রাজ্যবাদকে বিতাড়িত করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ; তা নয়। তারা সরকারে থাকা দালালদের বিরুদ্ধেও ক্ষুব্ধ। এমনভাবে কোণঠাসা তাদের করতে হবে যেন মীরজাফরেরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে।
মানুষ অপরাধ করার জন্য জন্মায় না; জন্মানোর পর অপরাধী হয়। যেসব কারণে অপরাধী হয় সেগুলো সামাজিক। যে জন্য সমাজে মৌলিক পরিবর্তন অত্যাবশ্যক। তার জন্য চাই আন্দোলন। যার ফলে মানুষের হৃদয়, বিবেক, মনুষ্যত্ব সব কিছু নিরাপদ হবে। স্বার্থপরতা চলে আসবে সামাজিকতার নিয়ন্ত্রণে। সামাজিকতা ও স্বার্থপরতার মধ্যে দ্বন্দ্ব মনুষ্যত্বকে রক্ষা করবে, বিপন্ন না করে; প্রমাণ করবে মানুষ অনেক বড় তার অপরাধগুলোর তুলনায়। আমাদের দেশে তো বটেই, গোটা পুঁজিবাদী বিশ্বে মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামটাই এখন প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তার কারণ মনুষ্যত্ব ধ্বংসের জন্য পুঁজিবাদ এবং তার স্থানীয় দালালেরা খুবই তৎপর।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



