মুক্তমত

সত্যের আলো বনাম সমাজের অন্ধকার: ইতিহাসের তিন অমর বলিদান

মামুন রেজা

পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, যুগে যুগে সমাজ যখনই অন্ধত্ব, কুসংস্কার আর ক্ষমতার লোভে নিমজ্জিত হয়েছে, তখনই সত্যের আলো ছড়াতে আসা মানুষদের চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র যাঁদের একসময় ‘অপরাধী’ বা ‘সমাজদ্রোহী’ ভেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে আজ তাঁরাই বিজয়ী ও অমর। অথচ তৎকালীন কর্তৃপক্ষ তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে, কিংবা মৃত্যুর পরও তাঁদের মরদেহের ওপর চালিয়েছে পৈশাচিক বর্বরতা। যীশু খ্রীষ্ট, সক্রেটিস এবং বর্তমান সময়ের নুরু পাগল—ভিন্ন ভিন্ন যুগের এই তিন ব্যক্তিত্বের জীবন ও পরিণতি যেন এক সুতোয় গাঁথা।
যীশু খ্রীষ্ট: শোষিতদের কণ্ঠস্বর ও ক্ষমতার ভিত কাঁপানো আলো
তৎকালীন রোমান শাসক ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্তাদের কাছে যীশু খ্রীষ্টের সবচেয়ে বড় “অপরাধ” ছিল তাদের ধর্মীয় ভণ্ডামি ও অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ করা। তৎকালীন ধর্মীয় নেতাদের চেয়ে যীশুর পথ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি শুধু সম্পদশালী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আপন করেননি; বরং সমাজচ্যুত, দরিদ্র, পীড়িত এবং অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তাঁর এই অহিংস ও মানবিক দর্শন তৎকালীন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে, সমাজপতিরা তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় এবং ক্রুশবিদ্ধ করে চরম যন্ত্রণার মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। কিন্তু যীশুর সেই আত্মত্যাগ আজ কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার আলো হয়ে জ্বলছে।
সক্রেটিস: এথেন্সের যুবসমাজকে প্রশ্ন করতে শেখানো দর্শনের জনক
গ্রিক দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর এবং পশ্চিমা চিন্তাধারার জনক বলা হয় সক্রেটিসকে। প্রাচীন এথেন্সে তিনি এক নতুন চিন্তার বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। সক্রেটিস প্রচলিত শিক্ষকদের মতো মুখস্থ বিদ্যা বা লেকচার দিতেন না; বরং তিনি মানুষকে প্রশ্ন করতেন এবং সেই উত্তরের ভেতর থেকে আরও প্রশ্ন বের করে সত্যকে উন্মোচন করতেন—যা আজ ‘সক্রেটিক মেথড’ নামে পরিচিত।
তাঁর মূল দর্শন ছিল—”নিজেকে জানো” (Know Thyself)। তিনি বলতেন, মানুষ কেবল অজ্ঞতার কারণেই পাপ করে; জেনে-বুঝে কেউ খারাপ কাজ করতে পারে না। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলতেন— “আমি শুধু একটি জিনিসই জানি যে, আমি কিছুই জানি না।” কিন্তু তরুণদের এই অন্ধবিশ্বাস ও প্রচলিত ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শেখানোটা তৎকালীন শাসকেরা মেনে নিতে পারেনি। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রস্বীকৃত দেবদেবীর অবমাননা এবং যুবসমাজকে পথভ্রষ্ট করার মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। আদালতে নিজের দর্শনের পক্ষে অটল থেকে, কোনো ক্ষমা না চেয়ে, তিনি শান্তভাবে হেমলক নামক মারাত্মক বিষ পানে মৃত্যুকে বরণ করে নেন।
নুরু পাগল: বর্তমান সমাজের এক প্রতিবাদী আলোকবর্তিকা
ইতিহাসের সেই একই নির্মমতার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান সমাজেও। লালন বা মনসুর হাল্লাজের চেনা চাদরে মোড়ানো নুরু পাগল প্রচলিত অন্যায় নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে সত্য ও মানবতার এক নতুন দিক-নির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন। “সবার উপরে মানুষ সত্য”—এই অমর বাণী এবং মানুষে মানুষে নিঃশর্ত প্রেমের বার্তা প্রচার করেছিলেন তিনি।
খুব স্বাভাবিকভাবেই গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষ তাঁর সান্নিধ্যে এসে শান্তি পাচ্ছিল। সমাজের গোঁড়ামি এবং অন্ধবিশ্বাসকে বাদ দিয়ে তিনি জ্ঞান ও প্রেমকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। গানের সুরে তাঁর এই সরল বাণী বর্তমান যুবসমাজকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করছিল। কিন্তু যুবসমাজের এই মানবিক জাগরণ এবং কুসংস্কারের বিপরীতে এক গোত্রহীন, শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্নকে সমাজপতি ও ধর্মব্যবসায়ীরা ভালো চোখে দেখেনি। ফলশ্রুতিতে, বেঁচে থাকতে তাঁর বিরুদ্ধে নানামুখী চক্রান্ত করা হয়। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও অন্যায়কারীদের ক্ষোভ কমেনি। একদল উশৃঙ্খল মানুষ তাঁর পবিত্র আঙিনায় আক্রমণ করে, কবর ভেঙে ফেলে এবং মরদেহ টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় নিয়ে এসে আগুনে পুড়িয়ে উল্লাস করে—যা আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে এক বিরল ও বর্বর দৃষ্টান্ত।
“ক্ষমতার লোভ আর অন্ধত্ব কখনোই সত্যের সরল এবং তীক্ষ্ণ রূপটিকে সহ্য করতে পারে না।”

ইতিহাসের চিরন্তন সত্য
যদি আমরা এই তিন যুগের চিত্রকে একটি বিন্দুতে মেলাই, তবে দেখব ক্ষমতার অন্ধত্ব সবসময় একই ভাষায় কথা বলে:
যীশু খ্রীষ্ট: ধর্মীয় ভণ্ডামির প্রতিবাদ ও সমাজচ্যুতদের অধিকার রক্ষার অপরাধে ক্রুশবিদ্ধ করে বীভৎস মৃত্যুদণ্ড।
সক্রেটিস: যুবসমাজকে প্রশ্ন করতে শেখানো ও সত্যের সন্ধান দেওয়ার অপরাধে হেমলক বিষ পানে ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ।
নুরু পাগল: ধর্মীয় অন্ধত্ব ও কুসংস্কারকে উপেক্ষা করে মানবতার গান গাওয়ার অপরাধে মৃত্যুর পর কবর ভাঙচুর ও মরদেহে অগ্নিসংযোগ।
শেষ কথা
যুগে যুগে সত্যের পথিক যারা পৃথিবীতে আলো দেখাতে আসেন, সমাজপতিরা বারবার তাঁদের নিভৃত ও চিহ্নহীন করার চেষ্টা করেছে। তারা ভেবেছে শরীরটা পুড়িয়ে দিলে বা বিষ খাইয়ে দিলে বুঝি সত্যকেও মেরে ফেলা যায়। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে—শরীরী মৃত্যু হলেও, তাঁদের আদর্শ ও সত্যের আলো আজ কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল প্রদীপ্ত হয়ে জ্বলছে। অন্ধকার সাময়িকভাবে আলোকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু কখনোই তাকে গ্রাস করতে পারে না।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী/ভয়েজ বাংলা বিভাগীয় প্রতিনিধি রাজশাহী।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension