
গতির জাদুকর কিলিয়ান এমবাপ্পে
হুমায়ূন কবীর ঢালী
কিলিয়ান এমবাপ্পে লোটিন—বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা এক বিস্ময়ের নাম। মাঠের গতি, চোখের পলকে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করার চাতুর্য আর অবিশ্বাস্য গোলস্কোরিং দক্ষতা তাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। মরক্কোর মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তার জাদুকরী পারফরম্যান্স বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আরও একবার স্তব্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ এবং ফ্রান্স জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে খেলা এই ফরোয়ার্ডের ফুটবলের আঙিনায় চূড়ায় পৌঁছানোর গল্পটা যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই অনুপ্রেরণাদায়ী।
১৯৯৮ সালের ২০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জন্ম নেন এই ফুটবল মহাতারকা। তবে তার বেড়ে ওঠা প্যারিসের উত্তর-পূর্ব শহরতলি বন্ডিতে, যা মূলত শ্রমজীবী এবং অভিবাসী প্রধান একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। এমবাপ্পের ধমনিতে বইছে বহুসাংস্কৃতিক রক্ত। তার বাবা উইলফ্রেড এমবাপ্পে ক্যামেরুন থেকে আসা একজন অভিবাসী এবং মা ফায়জা লামারি আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। শৈশবে বাবা-মা তাকে গানের স্কুলে ভর্তি করালেও, সেখানে তিনি গান গাওয়ার চেয়ে বাঁশি বাজানোটাকেই রপ্ত করেছিলেন বেশি। তবে সুরের চেয়ে তার মন বেশি কেড়েছিল ফুটবলের ছন্দ। ছোটবেলায় তার শোবার ঘরের দেয়াল জুড়ে থাকত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পোস্টার। রিয়াল মাদ্রিদের প্রতি এই তীব্র ভালোবাসার কারণেই খুব ছোট বয়সেই তিনি স্প্যানিশ ভাষাটা শিখে ফেলেছিলেন। ফুটবলের প্রতি গভীর একাগ্রতা না থাকলে হয়তো আজ তাকে আমরা ফুটবলারের বদলে কোনো ফ্যাশন র্যাম্পের নামী মডেল হিসেবেই দেখতে পেতাম।
এমবাপ্পের ফুটবলে হাতেখড়ি এবং গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার পরিবারের। স্থানীয় ক্লাব ‘এএস বন্ডি’র কোচ এবং পরিচালক ছিলেন তার বাবা উইলফ্রেড এমবাপ্পে। স্বাভাবিকভাবেই বাবার হাত ধরেই তার ফুটবলে পথচলা শুরু হয় এবং বাবাই ছিলেন তার জীবনের প্রথম ব্যক্তিগত কোচ। বাবার নিবিড় তত্ত্বাবধানে বন্ডির মাঠে যে প্রতিভার বীজ বপন হয়েছিল, তা দ্রুতই ডালপালা মেলতে শুরু করে। ২০১৩ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে এমবাপ্পে ফরাসি ক্লাব ‘এএস মোনাকো’র যুব দলে যোগ দেন। সেখানে নিজের জাত চিনিয়ে ২০১৬ সালে ফ্রান্স জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পায়নশিপ জেতাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার উত্থান ছিল উল্কার গতিতে। ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফ্রান্সের মূল জাতীয় দলে তার অভিষেক হয়। একই বছরের আগস্টে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে তিনি যোগ দেন ফরাসি ক্লাব পিএসজিতে। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে পুরো বিশ্ব দেখল এমবাপ্পে-ঝড়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে টুর্নামেন্টের ‘সেরা তরুণ খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ টিনেজার বা কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করার এক অনন্য কীর্তি গড়েন এমবাপ্পে।
বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই যেন এমবাপ্পের গোল উৎসব। ২০১৮ সালের অভিষেক বিশ্বকাপে ৪ গোল এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য ৮ গোল করে তিনি ‘গোল্ডেন বুট’ নিজের করে নেন। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিকসহ ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচগুলো মিলিয়ে ক্যারিয়ারে মোট ৪টি গোল করার অবিস্মরণীয় রেকর্ড গড়েন তিনি। বিশ্বমঞ্চে তার এই গোলক্ষুধা ও পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা তাকে ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তিদের কাতারে শামিল করেছে।
মাঠের ভেতরে ও বাইরে এমবাপ্পের জীবনজুড়ে রয়েছে দারুণ সব আকর্ষণীয় ও অজানা গল্প। তিনি তার গতি দিয়ে একবার অলিম্পিক কিংবদন্তি উসাইন বোল্টকেও প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছিলেন, যখন মাঠে তার গতিবেগ রেকর্ড করা হয় ঘণ্টায় প্রায় ৩৬ কিলোমিটার (২৩.৬ মাইল)। বিশ্বসেরা এই ফুটবলারের গ্যারেজে রয়েছে পৃথিবীর নামী-দামী সব বিলাসবহুল গাড়ি, অথচ মজার ব্যাপার হলো, আজ অব্দি চালক হিসেবে তার কোনো লাইসেন্সই নেই! এত বড় তারকা হওয়ার পরও পারিবারিক বন্ধন ও সংস্কারের প্রতি তিনি ভীষণ শ্রদ্ধাশীল; প্রতিটি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে এবং শেষ হওয়ার পর নিজের দাদি ক্রিস্টিনকে ফোন করা তার অবধারিত অভ্যাসের অংশ।
তবে কেবল মাঠের দুর্দান্ত ফুটবলার হিসেবেই নয়, একজন অনন্য মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও এমবাপ্পে অনন্য। ২০১৮ বিশ্বজয়ের পর তিনি যে উদারতা দেখিয়েছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়। বিশ্বকাপ থেকে প্রাপ্ত তার পুরো ম্যাচ ফি ও বোনাসের অর্থ (প্রায় ৩ লক্ষ ইউরো) তিনি নিজের কাছে না রেখে শিশুদের কল্যাণে কাজ করা একটি দাতব্য সংস্থায় দান করে দেন। বিভিন্ন সময়ে নিজের তাড়না ও দায়িত্ববোধ থেকে তিনি বলেছেন, “আমাদের মতো মানুষেরা যখন কাউকে সাহায্য করতে পারে, তখন সেটা করা কোনো বড় বিষয় নয়। এটা আমাদের দায়িত্ব। আমরা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারি এবং সেটাই সবচেয়ে আনন্দের।” ফুটবলের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা আর জীবনবোধ প্রকাশ পায় যখন তিনি বলেন, “আমি শুধু গোল করতে চাই না, আমি মানুষের মনে আনন্দ দিতে চাই। ফুটবল একটা উৎসব, আর আমি সেই উৎসবের অংশ।”
পিএসজির হয়ে দীর্ঘ ও সফল অধ্যায় শেষ করে, ২০২৪ সালের জুনে তিনি তার শৈশবের স্বপ্নের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে অফিশিয়ালি যোগ দেন। বন্ডির সেই ধুলোবালি মাখা মাঠ থেকে সান্টিয়াগো বার্নাব্যুর সবুজ গালিচা—কিলিয়ান এমবাপ্পের এই অবিস্মরণীয় যাত্রা প্রমাণ করে যে, নিখাদ প্রতিভা, মানবিক মূল্যবোধ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে বিশ্বজয় করা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।



