
হরমুজ নিয়ে ফের যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পালটাপালটি হামলা, ঝুঁকিতে সমঝোতা স্মারক
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
Advertisement
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে পুনর্বহাল করা নৌ অবরোধ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। খবর আলজাজিরার।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সোমবার (১৩ জুলাই) স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিট) সর্বশেষ হামলা শুরু হয়। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক নাগরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সোমবার রাতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বন্দর নগরী বান্দার আব্বাস, কিশ ও কেশম দ্বীপ ও বুশেহর প্রদেশের জাম শহরে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ফারস সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, পশ্চিম বান্দার আব্বাসে একটি প্রক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলেও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে নিয়ম লঙ্ঘনকারী কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে বান্দার আব্বাসের কাছে একটি মার্কিন তৈরি ড্রোন ভূপাতিত করারও দাবি করেছে তারা।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, ওমান উপসাগরসংলগ্ন হরমুজ প্রণালিতে তাদের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন বলে দেশটি জানিয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে।
ইরানের সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, তারা কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণাগার, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, গোলাবারুদ গুদাম এবং যোগাযোগব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে সোমবার বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতেও ইরান হামলা চালানোর দাবি করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১০ জুলাই কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, ৭ জুলাই থেকে ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষ আবার শুরু হয়েছে। তিনি নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই আরও ৬০ দিন মার্কিন বাহিনীকে অভিযানে রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে ইরান ছাড়া অন্য গন্তব্যে যাওয়া জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। মানবিক সহায়তাবাহী জাহাজও তল্লাশির পর চলাচলের অনুমতি পাবে। তবে অবরোধ এড়িয়ে পণ্য পরিবহণের সন্দেহ হলে জাহাজে অভিযান চালানো হবে এবং নির্দেশনা অমান্য করলে তা অক্ষম করে দেওয়া বা ধ্বংস করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে কথার লড়াই অব্যাহত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিটি উন্মুক্ত রয়েছে এবং মার্কিন সুরক্ষার বিনিময়ে সেখানে চলাচলকারী পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ টোল আরোপ করা হবে। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালির রক্ষক সব সময়ই ইরান ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’
হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে সংঘর্ষ চললেও এখনো একটি সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে আলজাজিরার হোয়াইট হাউস–সংবাদদাতা মাইক হান্না বলেছেন, যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলেও কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ওয়াশিংটন এখনো আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায়।
বিশ্ববাজারেও ইরান-মার্কিন সংঘাতের প্রভাব পড়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮১ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা জুনের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, ১০ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ কমে গেছে। অনেক জাহাজ ইরানের উপকূলঘেঁষা বিকল্প পথ ব্যবহার করছে অথবা নিজেদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) বন্ধ রেখে চলাচল করছে।



