
বিংহামটনের সবুজ অরণ্যে এক টুকরো বাংলাদেশ
হুমায়ূন কবীর ঢালী
নিউইয়র্কের যান্ত্রিক জীবনে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসটি মূলত প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি। সারাবছরের হাড়ভাঙা খাটুনি আর কর্মব্যস্ততার ফাঁকে এই সময়টাতেই একটু বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ মেলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘ ছুটি থাকায় বাঙালি কমিউনিটির চঞ্চলতাও এ সময় বাড়ে বহুগুণ। কেউ ছোটেন নিজ জন্মভূমির টানে বাংলাদেশে, কেউ বা সপরিবারে পাড়ি জমান আমেরিকার কোনো মনোরম পর্যটন কেন্দ্রে। তবে এই গ্রীষ্মকালীন দিনগুলোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো প্রবাসে বাঙালিদের বনভোজনের হিড়িক। শনি আর রবিবারে একের পর এক উৎসব আর পিকনিকের আমন্ত্রণে মুখরিত থাকে চারপাশ। যদিও প্রবাসের বুকে এই বনভোজন মানে কেবলই ‘বনে ভোজন’ নয়, এটি আসলে আমাদের শিকড়ের টান, এক পরম বাৎসরিক মিলনমেলা।
তেমনই এক প্রাণের মিলনমেলায় শামিল হওয়ার সুযোগ এসেছিল গত ১২ জুলাই, রবিবারে। গন্তব্য—নিউইয়র্কের কুইন্স থেকে সড়কপথে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার দূরত্বের ছিমছাম পাহাড়ি শহর বিংহামটন। এক সপ্তাহ আগেই প্রিয় ময়নু জামান ভাই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কাকতালীয়ভাবে একই দিনে আরও তিনটি আমন্ত্রণ পেলেও, কেন জানি বিংহামটনের এই যাত্রার জন্যই মনের ভেতর এক তীব্র টান অনুভব করছিলাম। এর আগেও বিংহামটনে পা রেখেছিলাম বটে, তবে ময়নু ভাইয়ের সফরসঙ্গী হয়ে পথ চলার মধ্যে যে এক অনন্য অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা লুকিয়ে থাকবে, সে বিশ্বাস আমার মনে ছিল দৃঢ়।
আমাদের দলটি ছিল চারজনের। ময়নু ভাই এবং আমি ছাড়াও এই সফরের সঙ্গী হলেন লেখক শিব্বির আহমেদ এবং সাংবাদিক মো. আবুল কাশেম।
ঘড়ির কাঁটা মেনে সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে আমাদের জ্যাকসন হাইটসে উপস্থিত হওয়ার তাড়া ছিল। প্রবাসী জীবনে সময়ের মূল্য অপরিসীম, তাই যথাসময়ে সবাই হাজির হলাম এবং আমাদের গাড়িটি হাইওয়ের পিচঢালা পথ ধরে ছুটতে শুরু করল।
জ্যাকসন হাইটসের সেই চিরচেনা কোলাহল—যেখানে বাতাসে ভাজা সমোচা, চটপটি আর ফিল্টার কফির চড়া সুবাসের সঙ্গে মিশে থাকে হরেক দেশের মানুষের চঞ্চল পদচারণা আর হৈহুল্লোড়ে মুখর আড্ডা—তাকে পেছনে ফেলে আমাদের গাড়িটা যখন হাইওয়েতে ছুটে চলতে শুরু করল, তখন সকালের সোনা রোদ সবেমাত্র নিউইয়র্কের আকাশছোঁয়া দালানগুলোর গায়ে আলতো করে এসে লেগেছে। আমাদের লক্ষ্যস্থল—বিংহামটন শহরের উপকণ্ঠে, শান্ত আর নিবিড় এক অরণ্যঘেরা পিকনিক স্পট, পালমির হিল এলাকার চেনাঙ্গো ভ্যালি স্টেট পার্ক (Chenango Valley State Park)।
গাড়ি যখন এগিয়ে যেতে থাকল, চোখের সামনে ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল চারপাশের ক্যানভাস। জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন গাড়ি হাডসন নদী পার হচ্ছিল, মনে হলো যেন ব্যস্ত যান্ত্রিকতার এক বিশাল দেয়াল পার হয়ে আমরা প্রকৃতির এক অন্য শান্ত ভুবনে প্রবেশ করছি। ইন্টারস্টেট ১৭ ধরে আমাদের গাড়ি যতই বিংহামটনের দিকে এগোতে লাগল, ততই রাস্তার দুপাশের দৃশ্য এক অলৌকিক রূপ ধারণ করতে শুরু করল। আমরাও জানালার ওপাশে চোখ রেখে চলন্ত গাড়ির ভেতর থেকেই দুই পাশের সেই আদিগন্ত সবুজের ক্যানভাস মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দি করছিলাম কতক্ষণ পরপর।
পথের দুপাশে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে পাইন আর বার্চের নিবিড় বন। দূর দিগন্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ক্যাটসকিল পর্বতমালার নীলচে পাহাড়ের চূড়া।
পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া মসৃণ সর্পিল রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি যখন চড়াই-উতরাই পার হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোনো এক কুশলী শিল্পীর জলরঙের ক্যানভাসের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছি। কখনো পাহাড়ের পথ বেয়ে উপরে উঠে যাওয়া, আবার কখনো হুড়মুড় করে ঢালু বেয়ে নিচে নেমে যাওয়া—আমেরিকার এই পাহাড়ি রুটের চেনা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এটি। মাঝে মাঝেই ছোট-বড় পাহাড় আর নাম না জানা বুনো ফুলের মেলা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল।
এরই মাঝে গাড়ির ভেতর স্পিকারে বেজে উঠছিল শিব্বির আহমেদের লেখা চমৎকার সব গানের সুর, সেই সুরের মায়ায় কখনো কখনো মনে মনে হারিয়ে যাওয়া, আর ময়নু ভাইয়ের পাকা হাতের মোলায়েম গাড়ি চালনায় চোখের পাতায় আলতো ঝিমানো আসা—সব মিলিয়ে আমাদের চারজনের এই যাত্রাটি ছিল এক পরম আনন্দ আর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় ঠাসা।
প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার রোমাঞ্চকর পথচলা শেষে যখন আমরা চেনাঙ্গো ভ্যালি স্টেট পার্কে পৌঁছালাম, তখন দুপুরের সুর্য মাথার ওপর। কিন্তু বনের ঘন পাইন পাতার ছাঁকনি গলে আসা আলোয় সেই রোদের তেজ ছিল একেবারেই শান্ত, এক কোমল পরশ।

পার্কের ভেতরে পা রাখতেই নীরবতা ভেঙে কানে এল সাংবাদিক মাহফুজ আহমেদের চিরচেনা প্রীতিভরা হাঁক, “ওই মিয়া, তোমাদের কাছে কি আমার নাম্বার নাই? ফোন দিবা না?” ভালোবাসার এই আন্তরিক তিরস্কারটুকুই আসলে প্রবাসের বুকে বাঙালির খাঁটি পরশমণি।
একমুহূর্তে মনে হলো এ যেন এক পরম আদিম জগৎ, যেখানে কেবল পাখির কলকাকলি আর পাতার মর্মর ধ্বনিই একমাত্র সুর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই অরণ্য-স্তব্ধতার মাঝেও সেদিন যোগ হয়েছিল এক পরম চেনা স্পন্দন—প্রবাসের বুকে এত চেনা-অচেনা নিজ দেশের মানুষের বিপুল কোলাহল আর হাসিমুখের মেলা!
আমাদের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সবুজে ঘেরা পাইন বনের ছায়ায় ও নান্দনিক প্রাকৃতিক পরিবেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আয়োজিত ‘গ্রেটার বিংহামটন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন’-এর বার্ষিক বনভোজন ও মিলনমেলায় যোগ দেওয়া। সে কথাই এবার একটু বিশদে বলি। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মনোরম এই পাহাড়ি পার্কটিতে সেদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির সমাগম ঘটেছিল। বিশাল এই জনসমাবেশ প্রমাণ করে দেয়, ভৌগোলিক দূরত্ব আমাদের সাময়িকভাবে দূরে সরিয়ে রাখলেও, অন্তরের ও শিকড়ের টানে আমরা সবাই এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।
এইসব বনভোজন আর মিলনমেলায় সাধারণত যেমনটি হয়ে থাকে—চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে প্রবাসীদের প্রাণখোলা আড্ডা, আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর স্মৃতিচারণে—এখানেও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি।
দুপুরের খাবারের আয়োজনটি ছিল রীতিমতো রাজকীয়। ব্রঙ্কসের অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘নীরব রেস্টুরেন্ট’-এর সুস্বাদু ও ঐতিহ্যবাহী সব দেশি খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল পাইন বনের শীতল ছায়ায় বসে। বনের মিষ্টি গন্ধ আর চমৎকার আবহাওয়ায় সবার সাথে মিলেমিশে সেই দুপুরের আহার ছিল এক পরম তৃপ্তির।
পড়ন্ত বিকেলে পার্কের দোচালা ঘরের উন্মুক্ত মঞ্চে আয়োজিত হয় সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা, চমৎকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আকর্ষণীয় র্যাফেল ড্র। গ্রেটার বিংহামটন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কালাম উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক মিয়ার অত্যন্ত সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আবাসন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও নিউইয়র্ক জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চ অলঙ্কৃত করেছিলেন নিউইয়র্ক জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আতাউল গনি আসাদ, কোষাধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট রিয়েলটর ময়নু জামান চৌধুরী, সাংবাদিক মাহফুজ আহমেদ, বিংহামটনের স্থানীয় রিয়েলটর মাইনুল ইসলাম মনু, বিশিষ্ট সাংবাদিক শিবলী চৌধুরী কয়েস, এবং আমাদের সফরসঙ্গী ‘লেখক ও খবর ডটকম’-এর সম্পাদক শিব্বির আহমেদ, ‘সাপ্তাহিক বাংলা গেজেট’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক মোঃ আবুল কাশেম ও আমি নিজে। এই আয়োজনের পেছনে যার নিরলস পরিশ্রম ও আন্তরিকতা জড়িয়ে ছিল, তিনি হলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান উপদেষ্টা বেলাল হোসেন বেলাল।
দিনব্যাপী আয়োজনের ঝুলিতে ছিল নানা রঙের বৈচিত্র্য। শিশুদের জন্য ছিল পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও বয়স ভিত্তিক দৌড় প্রতিযোগিতা, আর আমাদের প্রবাসী বোনদের জন্য ছিল তুমুল আনন্দদায়ক মিউজিক্যাল পিলো পাসিং। বড়দের জন্য ছিল নানাবিধ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। তবে বিকেলের সাংস্কৃতিক পর্বটি ছিল এক অন্যতম প্রাপ্তি। প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী কালা মিয়ার সুরেলা কণ্ঠের পরিবেশনা উপস্থিত সমস্ত দর্শক-শ্রোতাকে একেবারে বিমোহিত করে রেখেছিল। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম ও মরমি সাধক হাসন রাজার কালজয়ী গানগুলো যখন চেনাঙ্গো ভ্যালির পাহাড়ি বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন প্রতিটি বাঙালির মন যেন ক্ষণিকের জন্য হলেও পদ্মা-মেঘনা-সুরমার পাড়ে ফিরে গিয়েছিল। বাদ্যযন্ত্রে তাকে চমৎকার সহযোগিতা করেছিলেন নিউইয়র্কের সুপরিচিত ঢোলবাদক সফিক মিয়া। সবশেষে অনুষ্ঠিত হলো সবার বুক ধকপকানি জাগানো সেই বহু প্রতীক্ষিত র্যাফেল ড্র। মাত্র ৫ ডলারের টিকেটের বিপরীতে পুরস্কার হিসেবে সোনার চেইন, ৮৫ ইঞ্চির বিশাল এলইডি টেলিভিশন ও ল্যাপটপের মতো আকর্ষণীয় সব সামগ্রী বিজয়ীদের মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়েছিল।
অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে এই অপরূপ শহর বিংহামটনকে নিয়ে মনে মনে কিছু ভাবনার মেঘ জমল। নিউইয়র্ক সিটি থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার দূরত্বে সাসকুয়াহানা ও চেনাঙ্গো (Chenango) নদীর তীরে অবস্থিত ব্রোম কাউন্টির এই শান্ত ও অত্যন্ত ছিমছাম শহরটি হলো বিংহামটন।
বিংহামটন কেবল একটি মানচিত্রের বিন্দু নয়; এটি পাহাড়, নদী আর কুয়াশার চাদরে মোড়ানো এক পরম শান্তির ক্যানভাস। ৪৭,৯৬৯ জন জনসংখ্যার ১১.১৩ বর্গমাইলের এই ছোট্ট শহরটির মূল প্রাণ লুকিয়ে আছে তার ভৌগোলিক সৌন্দর্যের গভীরে। সাসকুয়াহানা ও চেনাঙ্গো নদীর বয়ে চলা এই জনপদটিকে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা দিয়েছে। শীতের সকালে যখন নদী দুটির বুক চিরে হালকা কুয়াশার বাষ্প আকাশে ওড়ে, তখন মনে হয় পুরো শহরটি যেন কোনো রূপকথার মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। বসন্তে নদীর পাড় ঘেঁষে যখন বুনো ফুলের মেলা বসে, আর শরতে যখন পাহাড়ের গাছগুলোর পাতা লাল-হলুদ-কমলার রঙে আগুন জ্বেলে দেয়, তখন বিংহামটনের রূপ দেখে যেকোনো পথিকের মন উদাস হতে বাধ্য। এখানে নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা আছে, কিন্তু তার ভেতর কোনো হাহাকার নেই; ট্রাফিকের তীব্র হর্ন নেই, নেই ট্রেনের যান্ত্রিক গর্জন। মানুষ এখানে চলে ধীর পায়ে, নদীর খামখেয়ালি স্রোতের মতো শান্তিতে।
তবে বিংহামটনকে যদি কেবলই প্রকৃতির লীলাভূমি বলা হয়, তবে তার অর্ধেকটাই বলা হবে। এই ছোট শহরটির অন্য পিঠে জড়িয়ে আছে মেধা ও মননের এক চমৎকার দীপ্তি। রিপাবলিকান দলীয় মেয়র জেরেড এম. ক্র্যাহাম এবং স্থানীয় কাউন্সিল দ্বারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত এই শহরটি শিক্ষার দিক থেকেও দারুণ সমৃদ্ধ। নিউইয়র্কের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ‘বিংহামটন বিশ্ববিদ্যালয়’ (SUNY Binghamton) এই শহরের বুকেই গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যার তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রাণোচ্ছল কোলাহল শান্ত এই জনপদকে প্রতিনিয়ত এক নতুন যৌবন দান করে। এখান থেকে মাত্র সোয়া এক ঘণ্টার দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে আমেরিকার বিখ্যাত আইভি লীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়’। ফলে, শহরটির বাতাসে কেবল পাইনের গন্ধই ভেসে বেড়ায় না, মিশে থাকে জ্ঞানচর্চা আর সৃজনশীলতার এক সূক্ষ্ম সুবাসও।
বিংহামটনের বুকে সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে বেশি চোখ জুড়ায়, তা হলো আমাদের চেনা মানুষের পদচারণা। একসময় যেখানে বাঙালি পরিবারের দেখা মেলা ভার ছিল, সেখানে সময়ের সাথে সাথে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। আমেরিকার বড় শহরগুলোর তুলনায় কম মূল্যে ভালো আবাসন সুবিধা, শান্ত পরিবেশ আর সন্তানদের বেড়ে ওঠার জন্য এক নিরিবিলি আবহাওয়া—সব মিলিয়ে বাংলাদেশিদের কাছে শহরটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী এখানে স্থায়ীভাবে সুন্দর নীড় গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যে এই ছোট শহরে নিজেদের কৃষ্টি আর সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি মালিকানাধীন গ্রোসারি, রেস্টুরেন্ট ও রিয়েল এস্টেট ব্রোকার হাউজসহ বিভিন্ন সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখন বিংহামটনের রাস্তায় হাঁটলে হঠাৎ কানে আসে চেনা বাংলা ভাষার মিষ্টি সুর, আর এখানকার মসলার দোকানে ঝুলতে দেখা যায় দেশি সর্ষের তেল কিংবা রূপচাঁদা মাছের প্যাকেট। পাহাড়ি এই উপত্যকায় এখন প্রতি বছর যখন আমাদের নিজস্ব উৎসবগুলো উদযাপিত হয়, তখন চেনাঙ্গো নদীর তীরে বসে মনে হয়—এ যেন এক টুকরো বাংলাদেশ, যা পরম মমতায় আমেরিকার বুকে নিজেকে মেলে ধরেছে।
এমনই এক মিলনমেলার উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝেই ময়নু ভাই, কাশেম ভাই, শিব্বির আহমেদ আর আমি কিছুটা সময় বের করে পার্কের গহীন সৌন্দর্যে নিজেদের ডুবিয়ে দিলাম। পার্কের চারপাশের প্রাকৃতিক সবুজ অরণ্যে নিজেদের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো ধরে রাখার জন্য আমাদের মোবাইল ক্যামেরায় চলল অবিরাম ক্লিকবাজি। প্রকৃতিও যেন সাগ্রহে পোজ দিচ্ছিল আমাদের ফ্রেমে, যেখানে মোবাইল তার চিপের বুকে পরম যত্নে ধরে রাখল টুকরো টুকরো নীল আকাশ আর সবুজ বনের প্রতিচ্ছবি। পাইন বনের অবিচ্ছিন্ন সারি দাঁড়িয়ে আছে ঠিক যেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ, মাথার ওপরে অবারিত শান্ত আকাশ, আর চোখের সামনে প্রকৃতির এই অপার ঐশ্বর্য—শহুরে জীবনের সমস্ত যান্ত্রিক ক্লান্তি আর ব্যস্ততার হিসেব-নিকেশ যেন এই সবুজ অরণ্যের শান্তিময় গভীরতায় এসে এক নিমেষেই বিলীন হয়ে গেল।
বিকেলের দিকে যখন বনের মাথায় সোনা রোদ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল এবং গাছের দীর্ঘ ছায়াগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল, তখন আমাদেরও ফেরার তাড়া চলে এল। আমাদের যে যেতে হবে সকলের থেকে দূরে—সেই নিউইয়র্কের যান্ত্রিক ব্যস্ততায়। যারা এই বিংহামটন শহরের বাসিন্দা, তারা তো নিজেদের ঘরেই ফিরবেন, তাদের দেরিতে ফিরলেও কোনো তাড়া নেই; অথচ এই অফুরন্ত সবুজ অরণ্য আর প্রাণপ্রিয় দেশের মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। তবুও জীবনের অমোঘ নিয়মে বিদায় জানাতেই হয়। সবাইকে হাসিমুখে রেখে, বুকভরা বিদায়ের সুর নিয়ে আমরা চারজন গাড়িতে চেপে বসলাম।
মেলা শেষ হয়, মানুষগুলো ঘরে ফেরে, কিন্তু প্রকৃতি আর মানুষের এই মেলবন্ধনের মধুর স্মৃতি রয়ে যায় চিরকাল। চেনাঙ্গো ভ্যালির এই শান্ত জল, পাইনের বুনো সুবাস, পাখির কলতান আর অজানা এক মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে আমাদের গাড়ি ফের পিচঢালা পথ ধরে এগিয়ে চলল জ্যাকসন হাইটসের দিকে। বিংহামটনের সেই সবুজ অরণ্যের স্মৃতি আমাদের মনের মণিকোঠায় সারাজীবনের জন্য জমা রয়ে গেল এক টুকরো অম্লান ও স্নিগ্ধ জলছবি হয়ে।



