
ট্রাম্পের ‘বিগ বিউটিফুল’ পুলিশি রাষ্ট্র
বেলেন ফার্নান্দেজ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪ জুলাই একটি আইনে স্বাক্ষর করেছেন, যার নাম ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’। অর্থাৎ তথাকথিত ‘একটি চমৎকার বিল’। যার মাধ্যমে ধনীদের ট্যাক্স কমানো হবে কিন্তু গরিবদের শায়েস্তা করা হবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ধনতন্ত্র সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছবে।
কিছুদিন আগে ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাঁর এক্স হ্যান্ডলে এ আইনের প্রধান উপাদানগুলো বর্ণনা করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) আইনের বাজেটের সঙ্গে তুলনা করলে সবকিছুই গুরুত্বহীন। নিশ্চয় এই বিলের মাধ্যমে অভিবাসনবিরোধী চেষ্টায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে আইসিইতে। তা ছাড়া ৪৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে নতুন অভিবাসী কারাগারের জন্য। যেটা আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের নোট অনুযায়ী, ‘আইসিইর বর্তমান কারাগারের বাজেটের তুলনায় বার্ষিক ২৬৫ শতাংশ বেড়েছে।’
বাজেটের কারণে আইসিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যে ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়ে আছে। এর খরচ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাইরে অন্য দেশগুলোর সামরিক বাজেটের চেয়ে বেশি। সম্প্রতি মাস্ক পরে মানুষকে অপহরণের ঘটনার পর বিশাল অর্থ বরাদ্দকে ‘চমৎকার’ না বলে যদি উদ্বেগজনক বলা হয়, তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। আইসিইর জন্য উন্মাদের মতো অর্থ বরাদ্দের এই হারও আশ্চর্যজনক নয়। কেননা, এখন এমন প্রেসিডেন্ট আছেন, যার কাছে লাখ লাখ মানুষের পুনর্বাসনের মোহ কখনোই তাঁকে এ বিষয়টি ভাবায়নি যে, এসব অনিবন্ধিত শ্রমিকই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তাদের অনুপস্থিতি অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে।
এই ব্যবস্থাপনার জন্য আইসিই চুক্তি করেছে ডিটেনশন কোম্পানি জিইও গ্রুপ এবং কোরসিভির সঙ্গে। ৪ জুলাই প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের ‘ডিটেনশন ব্লিৎজ’ শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয়, এসব কোম্পানি কাকতালীয়ভাবে ট্রাম্পের জানুয়ারির অভিভাষণ অনুষ্ঠানে অর্ধ মিলিয়ন ডলার ডোনেট করেছিল।
সে নিবন্ধে এই ইঙ্গিতও দেওয়া হয়, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘গণতন্ত্র’ বাস্তবে কাজ করে। ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বিশ্লেষকের মতে, জিও গ্রুপের এক্সিকিউটিভরা সরকারি এমন চুক্তির প্রধান অংশীদার, যার মাধ্যমে ৪০ শতাংশের বেশি রাজস্ব আয় হবে এবং মুনাফা হবে ৬০ শতাংশের বেশি। কিন্তু সরকার যেহেতু বলতে পারছে না, পুরো বিষয়টিই অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন, সে জন্য তারা অন্য বয়ান দিয়ে বলছে, আইসিই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভয়ংকর অবৈধ অভিবাসী অপরাধীদের থেকে’ মুক্ত করছে। এটা বিস্ময়কর নয়, এই সংস্থা যাদের কারাগারে পাঠাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। এ ধরনের বর্ণনা কেবল ভয়ের রাজনীতি তৈরিতে সহায়তা করে; দমনমূলক এই অভিবাসন ব্যবস্থায় যার মূল লক্ষ্য অনেকাংশেই অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমশক্তির শোষণ।
এমনকি আইসিইর তালিকায় ছয় বছরের এমন এক শিশুও আছে, যে মূলত হন্ডুরাসের এবং লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত। তাকে মে মাসের শেষদিকে লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিবাসী আদালত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়, যে তার পরিবারের সঙ্গে শুনানিতে এসেছিল। চলতি মাসে আইসিই ক্যালিফোর্নিয়ার দুটি ফার্মে ব্যাপক তল্লাশি করে ৩৬০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে। সেখানে ৫৭ বছরের একজন মারা যায়। জেইম আলানিস নামে এই ব্যক্তি মেক্সিকান খামারে কাজ করত।
এমনকি আইসিই যাদের গ্রেপ্তার করেছে, সবাই যে অনিবন্ধিত, তা নয়। ফার্মে তল্লাশির সময় জর্জ রেটস নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ সদস্য। তাঁকে প্রথমে পিপার (মরিচ মেশানো পানি) স্প্রে করা হয়। এর পর তিন দিনের জন্য জেল দেওয়া হয়। তিনি তাঁর তিন মাস বয়সী কন্যার জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে পারেননি। পরে তাঁকে মুক্তি দিলেও গ্রেপ্তারের কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
এখন আপনি অতিরিক্ত ১৭৫ বিলিয়ন ডলারের বিষয়টি চিন্তা করুন, যেটি জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন। যেহেতু আইসিইর গ্রেপ্তার কার্যক্রম খুব উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, সে জন্য সংস্থাটি রাজনৈতিক নিপীড়নের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি মতপ্রকাশের অপরাধে শায়েস্তারও মাধ্যম হচ্ছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো, আন্তর্জাতিক স্কলারদের সাম্প্রতিক অপহরণের ঘটনা, যারা গাজায় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ইসরায়েলি জেনোসাইডের বিরোধিতা করেছিল। এদের মধ্যে একজন ৩০ বছর বয়সী রুমাইসা ওজতুর্ক। ডক্টরাল কোর্সের এ তুর্কি শিক্ষার্থী ম্যাসাচুসেটসের টাফ্টস ইউনিভার্সিটিতে শিশু উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। মার্চ মাসে ইফতারের পর বের হওয়ার সময় ওজতুর্ককে মাস্ক পরিহিত কয়েকজন ঘিরে ধরে এবং একটি পরিবহনে উঠিয়ে নিয়ে লুইসিয়ানার আইসিইর কারাগারে পাঠানো হয়। যে কারাগারের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে জিইও গ্রুপ। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি এর আগের বছর ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্রে একটি আর্টিকেলের সহলেখক ছিলেন।
ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধে ওজতুর্ক তাঁর ৪৫ দিনের বন্দিত্বের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন। অবশ্য বন্দি অবস্থায় তিনি যে সহবন্দি নারীদের সহমর্মিতায় কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলেন, তাও উল্লেখ করেন। ওজতুর্ক লিখেছেন: ‘একবার এক কর্মকর্তা এসে সব বিস্কুটের বাক্স কেড়ে নিয়ে বলেছিল, আমরা নাকি সেগুলো দিয়ে অস্ত্র বানাতে পারি। আরেকবার আমরা হতবাক হয়ে দেখি, এক কর্মকর্তা রান্নাঘরে দুই নারীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।’
মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ যখন সম্প্রতি আইসিইকে ‘ট্রাম্পের আধুনিক গেস্টাপো’ হিসেবে উল্লেখ করেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ একে ‘ভয়ানক কথা’ বলে একটি প্রেস রিলিজ দেয়। যেখানে বলা হয়, ‘যখন গভর্নর ওয়ালজের মতো রাজনীতিবিদরা অবৈধ বিদেশি অপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছেন, তখন আইসিই কর্মকর্তারা হত্যাকারী, অপহরণকারী ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছেন।’
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অনিবন্ধিত শ্রমিকরা এই মুহূর্তে দৃশ্যত আইসিইর সবচেয়ে বড় ভিকটিম, যা ট্রাম্পের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-এর অংশ। শেষ নাগাদ পুরো যুক্তরাষ্ট্রই এর শিকারে পরিণত হবে। অ্যারন রেসলিন মেলনিক, আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো বলেছেন, ‘আপনি প্রথমে পুলিশি রাষ্ট্র গঠন করা ব্যতীত গণউচ্ছেদ যন্ত্র তৈরি করতে পারেন না। কেমব্রিজ ডিকশনারির ‘পুলিশি রাষ্ট্রের’ সংজ্ঞা বলছে, ‘যে দেশে সরকার জনগণের স্বাধীনতা কঠোরভাবে সীমিত করতে পুলিশ ব্যবহার করে।’ তার মানে, এই সংজ্ঞার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি মানিয়ে গেছে।
বেলেন ফার্নান্দেজ: আলজাজিরার কলাম লেখক; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক



