নির্বাচিত কলামমুক্তমত

গণতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের কোনো বিরোধ নেই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বাংলাদেশের সমষ্টিগত মানুষের অবস্থা খারাপের চেয়েও খারাপের অভিমুখে। শান্তি তো নেই-ই, স্বস্তিও যেন পালাচ্ছে। তবে মেয়েদের অবস্থা আরও খারাপ। তারা নির্যাতিত দুভাবে। এক হচ্ছে গরিব মানুষ হিসেবে আর হচ্ছে মেয়েমানুষ হিসেবে। পুঁজিবাদের শিকার তারা, শিকার আবার পুরুষতান্ত্রিকতার এবং মৌলবাদী তৎপরতারও।
ওই যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের অর্জন ও পরিবর্তনগুলোর বড় বড় ঘটনা, সেগুলোর প্রত্যেকটির পেছনে এসব খেটে খাওয়া মানুষ ছিল। উনিশ শ ছেচল্লিশে তারা ভোট দিয়েছে, ফলে পাকিস্তান হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তান এ মানুষদের কিছুই দেয়নি, যন্ত্রণা ছাড়া।

উনিশ শ চুয়ান্নয় তারা আবার ভোট দিয়েছে, এবার ওই পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে। পরিণামে যা তারা লাভ করেছে তা মুক্তি নয়, বরঞ্চ আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। সেই শাসন বাংলাদেশে টাউট, ঠিকাদার এবং নানা ধরনের নিপীড়নকারীকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গেছে। সত্তরে তারা আবার ভোট দিল, এবার ভোট স্বাধীনতার পক্ষে। এবার কেবল সামরিক শাসন নয়, সামরিক আক্রমণই নেমে এল। পাকিস্তানি হানাদাররা মানুষের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যাগুলোর একটি ঘটাল এ বাংলাদেশে। প্রাণ হারাল ৩০ লাখ মানুষ এবং সম্ভ্রম হারাল ২ লাখ নারী।

‘মুক্তির গান’ নাম দিয়ে তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ মুক্তিযুদ্ধের ওপর যে একটি প্রমাণ্যচিত্র তুলে ধরেছেন, তাতে গ্রামবাংলার নির্যাতিত মহিলারা একটি খুবই সাধারণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে, ‘আমরা কী দোষ করেছিলাম’। তাদের এবং প্রায় সব বাঙালিরই ‘দোষ’ তখন ছিল ওই একটাই, তারা স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। যারা অবস্থাপন্ন তারা নানাভাবে আত্মরক্ষা করেছে। কেউ কেউ আপস করেছে, কেউবা দালালি করেছে, যারা পেরেছে তারা ওপারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। যে সাধারণ মানুষ এসব করতে পারেনি, পড়ে থেকেছে মাটি আঁকড়ে ধরে, তারা শিকার হয়েছে গণনির্যাতনের।

মেয়েদের ওপর অত্যাচারটা হয়েছে দ্বিগুণ। যারা নেতা ছিলেন, ভোট নিয়েছিলেন, তারা দেশ ছেড়েছেন সবার আগে। কলকাতায় গিয়ে ভাতা পেয়েছেন, কেউ কেউ স্বাধীনতা যাতে না আসে তেমন তৎপরতাতেও লিপ্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পর তারা ফিরে এসেছেন, ক্ষমতা পেয়েছেন, ধনী হয়েছেন।

আক্রান্ত হয়ে যে সাধারণ মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল, তারা শহিদ হয়েছেন হাজারে হাজার। পঙ্গু হয়েছেন অসংখ্য। এবং ফিরে এসে দেখেছেন ঘরবাড়ি কিছুই নেই। স্বাধীনতার ফল গরিব মানুষ উনিশ শ সাতচল্লিশে পায়নি, একাত্তরেও পেল না। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ তাদের শত্রু ছিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদ যে মিত্র হয়েছে এমন নয়। ‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্য চিত্রে ঢাকা শহরের একজন পঙ্গু রিকশাচালকের সাক্ষাৎকার ধারণ করা হয়েছে। একাত্তরে তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তাতে একটি পা হারান। ঢাকা শহরে এখন তাকে এক পা নিয়ে রিকশা চালাতে হয়। তিনি বললেন, ‘একা মানুষ খাটনিদার, ফ্যামেলি মেম্বার পাঁচজন, না চালায়ে উপায় নেই।’

রিকশাচালক সাইদুর রহমান পা হারিয়েছেন বলে দুঃখ করেন না। স্বাধীনতার জন্য কঠিন দুঃখ সহ্য করতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন, বলেছেন তিনি তার আড়ম্বরহীন সরল ভাষায়। কিন্তু তার আরও একটা বক্তব্য আছে, ‘যে মা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে আমারে পাঠাইল সে স্বাধীনতা দেখে যেতে পারল না। বাড়ি গিয়ে আমার মাকেও আমি দেখতে পারলাম না। আরেকটা ব্যাপার ভাই, সবাই স্বাধীনতা পাইল কিন্তু আমি পঙ্গু হইয়া পরাধীন হইয়া গেলাম।’ একজন সাইদুর রহমান নয়, হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষের জীবনে ঘটেছে ওই ঘটনা। যুদ্ধে গেছে, ফিরে এসে দেখে গৃহ নেই, আপনজনরা মারা গেছে কেউ, কেউ গেছে হারিয়ে। আর ওই যে, ‘পঙ্গু হইয়া পরাধীন হইয়া গেলাম’, এটাও তো সত্য আজ অধিকাংশ দেশবাসী সম্পর্কে।

উনিশ শ সাতচল্লিশে যাদের সুবিধা হয়েছিল, বাহাত্তরে তাদের আবার সুবিধা হলো। কে কোন পক্ষে ছিল সে প্রশ্ন সাতচল্লিশে ওঠেনি। বাহাত্তরের পরে উঠলেও টেকেনি। পক্ষ শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গেছে ওই দুটিই। বিত্তবান ও বিত্তহীন। সাতচল্লিশ যাদের সাহায্য করেছে বিত্তবান হতে, বাহাত্তরের পর দেখা গেল তারাই আবার বিত্তবান হচ্ছে। সাধারণ মানুষ সাতচল্লিশে ভোট দিয়েছে মুক্তির আশায়, মুক্তি পায়নি। একাত্তরে যুদ্ধ করেছে মুক্তির ওই আশাতেই, মুক্তি পায়নি।

মুক্তি না পাওয়ার কারণটা ভুললে চলবে না। কারণ হচ্ছে এই স্থূল সত্য যে, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি। এটা সেই পুরাতন ব্যবস্থা, যাতে অল্প লোক ধনী হবে অধিকাংশ লোককে গরিব করে। আমাদের আদি সংবিধান রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির মধ্যে একটি ছিল সমাজতন্ত্র। সেটি এমনি এমনি আসেনি। কেউ করুণা করে বসিয়ে দেয়নি। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্য। ওই পথে মানুষ মুক্ত হবে, উঠে দাঁড়াবে, এটাই ছিল স্বপ্ন। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে এখন সমাজতন্ত্র নেই। এটিও কোনো দুর্ঘটনা নয়।

সমাজ বিকাশের যে পুঁজিবাদী ধারা প্রবহমান রয়েছে তারই আঘাতে সমাজতন্ত্রের অপসারণ ঘটেছে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের সঙ্গে এ অপসারণের কোনো সম্পর্ক নেই। বাইরে ঘটার আগেই আমাদের দেশে ঘটনাটা ঘটেছে এবং বাইরে না ঘটলেও এখানে ঘটত। আমাদের শাসকরা কেউই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন না। যারা মুখে বলেছেন তারাও অন্তরে বিশ্বাস করেননি, পরে যারা এসেছেন তারা সমাজতন্ত্রের কথা মুখেও বলেননি। শাসক বদলেছে, কিন্তু হিসেব করলে দেখা যাবে যে, তারা যে দায়িত্ব মূলত পালন করেছেন সেটা হলো পুঁজিবাদী বিকাশের পথটাকে প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর করা।

সমাজতন্ত্রে সমালোচকের অভাব কোনো দিনই ছিল না। এখনো নেই। বলা হয়েছে, সমাজতন্ত্র গণতন্ত্র দেয় না, কেড়ে নেয়। যেসব দেশ সমাজতন্ত্রকে ত্যাগ করে পুঁজিবাদকে গ্রহণ করেছে সেখানে এখন গণতন্ত্র কোথায় দেখা যাচ্ছে তার সন্ধান এমনকি কট্টর পুঁজিবাদীরাও দিতে পারছে না। খোদ রাশিয়ায় যখন ভিক্ষাবৃত্তি, পতিতাবৃত্তি, মাফিয়া শাসন প্রধান সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে; তখন সমাজতন্ত্রের সমালোচকরা এ কথাটা আর বলতে পারছেন না যে, সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরাও ওই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনেই আছি, এখানে যে গণতন্ত্র আছে এ কথা কেউ বলতে পারবেন না।

বলবেনও না। রাষ্ট্রীয় মূলনীতির বিবরণে ধর্মনিরপেক্ষতাও ছিল। সেটাও আজ নেই। এই অপসারণের সঙ্গে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জড়িত, সেটা না দেখলে সত্যদর্শন হবে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আজ বাংলাদেশ বলে নয়, সারা বিশ্বেই আধিপত্য করছে। আর সেই আধিপত্যের দরুন গরিব মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছে। আশ্রয়হীন হয়ে আদর্শিকভাবে সে যে পুঁজিবাদের কাছে যাবে সেটা তো সম্ভব নয়, পুঁজিবাদই তো তার ওই দশা করেছে, সমাজতন্ত্রের কাছে যেতে পারত, কিন্তু সেই পথ বন্ধ, যাচ্ছে তাই সামন্তবাদ তথা মৌলবাদের কাছে। পুঁজিবাদীরাও এ কাজে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করছে। কেননা, তারা জানে তাদের আসল শত্রু মৌলবাদ নয়; আসল শত্রু সমাজতন্ত্র, মৌলবাদের অভিমুখে মানুষ যদি দলে দলে ধাবমান হয় তবে সেটা বরঞ্চ লাভজনক; বিদ্রোহ করবে না, রুখে দাঁড়াবে না, অবনত অবস্থায় অন্ধকারে ঠেলাধাক্কা ও মারামারি করবে।

বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার এই শৃঙ্খল ছিন্ন করতেই হবে, না হলে মানুষ উঠে দাঁড়াতে পারবে না। যেমন পারছে না। কেবলি নত হচ্ছে। পঙ্গু হচ্ছে। শৃঙ্খলটা যে কেবল বৈষয়িক তা নয়, আদর্শিকও বটে। ছিন্ন করা চাই দুই বন্ধনই।

কিন্তু পথ দেখাবে কে? দেখানোর কথা বুদ্ধিজীবীদের। সেটা তারা করছেন বলে দাবি করতে পারবেন না। তারা এখন মোটামুটি দুই মতাদর্শে বিভক্ত, দুই মতাদর্শ আবার অভিন্নও, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমর্থক। বুদ্ধিজীবীরা যদি নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ না দেখে সমষ্টিগত স্বার্থ দেখেন তাহলে তারা অনুপ্রাণিত হবেন জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে, এবং সেই ঐক্যই বলে দেবে তাদের কী করণীয়। বুদ্ধিজীবীরা যতই অগ্রসর হোন, তারা সফল হবেন না জনগণকে সঙ্গে না পেলে, জনগণও এগোতে পারবে না বুদ্ধিজীবীদের সাহায্য না পেলে।
বাংলাদেশের উঠে দাঁড়ানোটা গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে জনগণের ঐক্যের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। বলা বাহুল্য, প্রকৃত গণতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের কোনো বিরোধ নেই; নামেই যা আলাদা, না হলে ভেতরে তারা একই।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension