সম্পাদকীয়

প্রবাসী শ্রমিকদের লাশ হওয়া থেকে রক্ষা করুন

বাংলাদেশি কর্মীরা ভাগ্য নিজেদের ফেরাতে দলে দলে বিদেশে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন অনেকে, অনেকে আবার লাশ হয়ে। গেল বছর রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ২০১৮ সালে মোট ৩ হাজার ৭৯৩ বাংলাদেশি কর্মীর মৃতদেহ দেশে আনা হয়েছে। ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৩৮৭ অভিবাসী কর্মীর মৃতদেহ এসেছিল। ওয়েজ অর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে অবৈধভাবে কর্মরত ১১৭ কর্মীর মৃতদেহও দেশে এসেছে। এই সংখ্যা গেল ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের বেশি কর্মীর মৃতদেহ বাংলাদেশে এসেছে। এ হিসেবে, গেল এক যুগে এই সংখ্যা ৩৫ হাজারের ওপর। বেশিরভাগ মৃতদেহ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সবচেয়ে বেশি মৃতদেহ এসেছে সৌদি আরব থেকে। দ্বিতীয় সর্বাধিক মৃতদেহ এসেছে মালয়েশিয়া থেকে।

প্রবাসী শ্রমিকদের লাশ, স্বজনদের আহাজারি

গেল চার বছরে যত প্রবাসীর লাশ এসেছে তাদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, অন্তত ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যু হয়েছে আকস্মিকভাবে—মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ অথবা হৃদরোগে। তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। একই সঙ্গে, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং সড়ক দুর্ঘটনায়ও প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। অর্থাৎ এরা অস্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছেন বলতে হবে। অল্প বয়সে স্ট্রোকে এবং হূদরোগে মৃত্যুর অন্যতম কারণ অতিরিক্ত মানসিক চাপ। শ্রমিকরা সর্বস্ব বেচে দিয়ে প্রবাসে যান অনেক বড় প্রত্যাশা নিয়া। কিন্তু সেখানে গিয়া তারা চরম হতাশায় পড়েন। অনেকেই ঋণ করে বিদেশে যান, সেই টাকা তুলতে গিয়ে তারা দিনে ১২ হইতে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানবিক পরিশ্রম করেন। কিন্তু তারপর তাদের আয় যে টাকা খরচ করে তারা গেছেন সেটার তুলনায় আয় খুবই কম। ফলে ঋণ পরিশোধের একটা চাপ সবসময় থাকে। অন্যদিকে প্রতিকূল কর্মপরিবেশ, অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে বসবাস, নিম্নমানের খাবার এবং দীর্ঘদিন আপনজনদের বিচ্ছিন্নতাও এই ধরনের মৃত্যু ত্বরান্বিত করছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পেছনেও শ্রমিকদের কাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় রয়েছে। শ্রমিকদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বাস বা ট্রাকে গাদাগাদি করে পরিবহনের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়ার মতো দেশে নিয়মিতই ঘটছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের লাশ

বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি শ্রমিক এখন বিদেশে কর্মরত এবং প্রতি বছর দক্ষ-অদক্ষ প্রায় ৫ লক্ষ শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছেন। প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে ৮১ শতাংশ রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে এবং ১১ শতাংশ রয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল থাকার অন্যতম চালিকাশক্তি হল প্রবাসীদের কষ্টার্জিত আয়। দেশের জিডিপির ১২ শতাংশই তাদের অবদান। অথচ তাহাদের জীবনের নিরাপত্তা ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে যথেষ্ট উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। সাধারণত কর্মীদের মৃতদেহ দেশে আনবার পর কখনও ময়না তদন্ত করা হয় না, ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণও জানা যায় না। সরকারের উচিত মৃতদেহ দেশে আসবার পর ময়না তদন্তের ব্যবস্থা করা এবং সমস্যা নির্ধারণ করে সমাধানের পথ খোঁজা। অভিবাসন খরচ কর্মীদের মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিলে ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বিদেশে কর্মীদের উন্নত কর্মপরিবেশ এবং থাকা-খাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করাটাও সরকারের দায়িত্বে রয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর্মীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন কিনা সেটা দেখাও জরুরি। আমরা আশা করব, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো অভিবাসী শ্রমিকের অনভিপ্রেত মৃত্যুরোধে সম্ভাব্য সবকিছুই করবেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension