
‘বিএনপির জ্বালাও পোড়াও সংস্কৃতি’
রূপসী বাংলা ঢাকা ডেস্ক রিপোর্ট: সংলাপ ও সমঝোতার চেষ্টার পরও জ্বালাও পোড়াও কালচার থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি বিএনপি। আজ নভেম্বর ১৪ বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে তাদের নিজস্ব কার্যালয়ের সামনে মনোয়নপত্র কেনার সময় নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে সংঘর্ষে গড়ায়।
এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের উপর চড়াও হয়। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে পুলিশের গাড়িসহ বেশ কয়েকটি গাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। নাশকতা ঠেকাতে পুলিশ নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিয়ে টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে।
আজকের জ্বালাও পোড়াওয়ের ব্যাপারে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার মন্তব্য হলো, বিএনপির ছত্রছায়ায় জামাত-শিবির ২০১৩ সালের মত আবারও জ্বালাও পোড়াও শুরু করেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা-শাহবাগ জোনের পুলিশের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার জানান, মনোয়নয়নপত্র সংগ্রহের সময় তুচ্ছ ঘটনায় বিএনপি ভাংচুর জ্বালাও পোড়াও মতো নাশকতা শুরু করেছে। এটা তাদের পুরনো কালচার। মানুষের জানমাল রক্ষার্থে আমরা কঠোর হাতে দমনের চেষ্টা করছি।
এদিকে খবর পেয়ে নয়াপল্টনে সংঘর্ষস্থলে উপস্থিত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগের তদন্ত অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বিএনপি এবং জামায়াতের ২৬,৩৫২ নেতা এবং সমর্থকদের ওই দাঙ্গায় জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ২৬ জন মন্ত্রী এবং আইন প্রণেতারা রয়েছেন। তৎকালীন অভিযুক্ত ৬ মন্ত্রীরা হচ্ছেন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, আবদুস সালাম পিন্টু, মতিউর রহমান নিজামী, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, তারিকুল ইসলাম ও হাফিজউদ্দিন।

কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির সারাদেশে ব্যাপক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। প্রাপ্ত্য তথ্যানুযায়ী ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াত-শিবির সমর্থকরা ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য দেশের অভ্যন্তরে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ওই বিচার বানচাল করতে ২০১৩ সালে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক সহিংসতার ৪১৯টি প্রধান ঘটনায় ৪৯২ জন নিহত হয় এবং ২২০০ জন আহত হয়।
শুধু তাই নয়, বিএনপি-জামায়াতের সহিংস কর্মকান্ড এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় যে তা বিদেশি আদালত অর্থাৎ কানাডার ফেডারেল আদালতেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অটোয়াতে কানাডার ফেডারেল আদালতে (সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন) (২০১৭ এফসি ৯৪) বলা হয়েছে যে, বিএনপি প্রকৃতপক্ষে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। আদালত মনে করে যে, বিএনপি হচ্ছে একটি দল যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে সশস্ত্র সংগ্রাম বা সহিংসতার আশ্রয় নেয়। সেখানে আরও বলা হয়েছে হাতবোমা, পিস্তল ও অস্ত্র ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং জনগণের উপর হামলা চালায় বিএনপি। এমনকি অগ্নিসংযোগের মতও ঘটনা ঘটায় দলটি।
আদালত বলেছেন ‘বিএনপি কর্তৃক হরতালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুব খারাপ প্রভাব ফেলেছে যার ফলে সেবাভিত্তিক কর্মকান্ডে বাধা সৃষ্টি, সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি এবং জনগণের মৃত্যু এবং গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হয়েছে। সরকারকে অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ফেলার লক্ষ্যেই হরতাল কার্যকর করতে সহিংসতার ঘটনা ঘটায় বিএনপি, যা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। প্রকৃতপক্ষে এটি বিশ্বাসযোগ্য যে, বিএনপি একটি সবসময়ই একটি সন্ত্রাসী দল।

আদালতের বিচারক বিচারপতি ব্রাউন বলেন, বিএনপির হরতালগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খারাপ প্রভাব ফেলেছে এবং এর ফলশ্রুতিতে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও মৃত্যু এবং এর মত গুরুতর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন অনেকে।
তিনি আরও বলেন, এই কৌশলগুলো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ঊর্ধ্বে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিএনপি কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে সহিংস।
কয়েক মাস পর কানাডার আরেকটি ফেডারেল আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে অভিহিত করে। আর বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী হরতাল কার্যকর এবং সহিংসতা ও ভাংচুরের ঘটনায় দলের ভূমিকার জন্য ১২ মে এক বিএনপি নেতার কানাডায় আশ্রয় প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করে তার বিচারিক পর্যালোচনা করার কথা বলেন ফেডারেল কোর্টের বিচারক ফোথারগিল।
আদালত পূর্ববর্তী অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বিচারপতি বলেন, যে পিটিশনকারী যে রাজনৈতিক দলের সদস্য তারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত ছিল, জড়িত আছে বা ভবিষ্যতেও জড়িত থাকবে।
বিচারপতি বলেন, বিএনপির হরতাল এবং এর প্রভাব বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায় যে, অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে কোনও ভুল ছিল না এবং ওই কমিটির সিদ্ধান্তও যথার্থ। বিচারক আরও বলেন, বিএনপির ধারাবাহিক হরতাল এবং ওই সময় সহিংসতার ফলে কানাডার অভিবাসন বিষয়ক কর্মকর্তাকে এই উপসংহারে পৌঁছতে সাহায্য করেছে যে, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। বিচারপতি ফোথারগিল শুধু জুডিশিয়াল রিভিউ আবেদন খারিজই করেন নি বরং রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের জন্য এসএ পিটিশনের আবেদনও খারিজ করে দেন।

উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কাদের মোল্লার রায়ের পরই সহিংসতা শুরু করে বিএনপি-জামাত। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কাদের মোল্লার আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশের ঘোষণায় দুই দিনের হরতাল ডাকে জামায়াতে ইসলামী। সারাদেশে জামায়াত ও এর ছাত্র সংগঠন-ছাত্র শিবিরের হরতাল বিক্ষোভে কমপক্ষে তিনজন নিহত হয়। এর পর ২৪ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায় হরতালে পুলিশের সাথে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সংঘর্ষে ৪ জন নিহত এবং কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয় ।
শুধু তাই নয়, কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর সহিংসতা শুরু হয়। ওই বছর ১২ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের পর জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা এবং এদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সহিংসতায় সারাদেশে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৭ জন নিহত ও ১৫০ জন আহত হয়।
এরপরই আসে সাঈদীর পালা। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দন্ডিত করার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের নামে জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সহিংসতায় ১২ জন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হন এবং ২ হাজারেরও বেশি লোক আহত হয়। গাইবান্ধা জেলায় ৪ পুলিশ সদস্যসহ ৬ জন নিহত হয়, সাতক্ষীরায় ১ জন , ঠাকুরগাঁওয়ে ৪ জন, চট্টগ্রামে ৪, কক্সবাজার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ও নোয়াখালী জেলার ২ জন করে এবং ঢাকা, মৌলভীবাজার, নাটোর ও বগুড়া জেলায় ১ জন করে নিহত হন।
১ মার্চ সারা দেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে জামায়াতে ইসলামীর সংঘর্ষে কমপক্ষে ৭ জন নিহত হয়। এছাড়া জ্বালাও পোড়াওয়ের এই সময় বাংলাদেশের হিন্দুরা বিশেষ লক্ষ্যবস্তু থাকে।
গাইবান্ধায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে এক রিকশাচালক ও চায়ের দোকানের এক মালিক নিহত হন। সিলেট নগরীতে সন্দেহভাজন শিবির কর্মীরা ছাত্রলীগ নেতা জগৎজ্যোতি তালুকদারকে হত্যা করে । ৩ মার্চ ২৪ ঘণ্টার হরতাল ডাকে জামায়াত-শিবির। হরতালের প্রথম দিনে পুলিশের সাথে জামায়াত -শিবিরের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ২৩ জন নিহত হন। আহত হন এক হাজারের বেশি মানুষ। বগুড়া জেলায় জামায়াত শিবিরের কর্মীদের সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে তিন নারীসহ ১০ জন নিহত হয়। আর রাজশাহী জেলাতেও একই সংঘর্ষের শিকার হন নিরীহ গ্রামবাসী। আর সে সময়ই নিহত হন ৪ জন।
ঝিনাইদহ জেলায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জামায়াত-শিবির কর্মীরা হামলা চালালে ওমর ফারুক (৪০) নামে এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হন। মার্চের ৪ তারিখে হরতালের শেষদিন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে জামায়াত ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠন-ছাত্র শিবিরের সংঘর্ষে সারাদেশে ৫ জন নিহত হয় আহত হয় আরও ১৭ জন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেওয়ার পর থেকে কয়েকদিনের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে সারাদেশে যানবাহন ভাঙচুরসহ বিভিন্ন সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। এছাড়া, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ফজলে কবির, তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার রকীবউদ্দিন আহমেদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার গ্রামের বাড়িতে পেট্রোল বোমা এবং ককটেল মারে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। সাঈদীর মামলার প্রধান সাক্ষীকেও সে সময় হত্যা করে জামায়াত-শিবির।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচনের বিরোধিতা করে বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়। তারা সে সময় শত শত যানবাহন ভাঙচুর করে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় তাদের পেট্রোল বোমা, হাতে বানানো বোমা এবং অন্যান্য সহিংসতায় ২০ জন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। সহিংসতার সময় রাস্তার পাশে থাকা হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এছাড়া, ছোট দোকান, সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও আগুন দেয় তারা। বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জা ভাঙচুর এবং পবিত্র কুরআনের শত শত কপি জ্বালিয়ে দেয়।
নির্বাচনের দিন, একজন প্রিসাইডিং অফিসারসহ মোট ২৬ জনকে হত্যা করে এবং সারাদেশে ৫৮২টি স্কুলে ভোটকেন্দ্রে আগুন লাগায় বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা।
২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন আবারও জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু করতে চায় বিএনপি-জামায়াত জোট। ওই সময় ২৩১ জনকে হত্যা করে তারা। যাদের বেশিরভাগই পেট্রোল বোমা এবং আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায়। ওই ঘটনায় আহত হয় আরও ১ হাজার ১শ’ ৮০ জন। সে সময় ২,৯০৩টি গাড়ি, ১৮টি রেলগাড়ি এবং ৮টি যাত্রীবাহী জাহাজে আগুন লাগায় তারা। ওই সময় হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় সরকারি অফিসগুলো। বিএনপি-জামায়াতের ভাঙচুর এবং আগুনে পুড়ে ৬টি ভূমি অফিসসহ ৭০টি সরকারি কার্যালয় নষ্ট হয়ে যায়।



