বাংলাদেশ

বিএনপি বাড়াবাড়ি করলে খালেদা জিয়াকে আবার জেলে পাঠাব:

বিএনপির আন্দোলন-সমাবেশকে নির্দেশ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি বাড়াবাড়ি করলে খালেদা জিয়াকে আবার জেলে পাঠিয়ে দেবেন। করোনা মহামারীর সময় বিএনপি কোথায় ছিল এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, যে সময় আত্মীয়-স্বজনের লাশটা পর্যন্ত মানুষ ধরছিল না তখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে থেকে সকল সহযোগিতা করেছে।

বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে আওয়ামী লীগের স্মরণ সভায় সভাপতির বক্তব্যের তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনা সভায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দায়ী করেন তিনি। রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারণে ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড ঘটনা ঘটানো হয় বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। জিয়াউর রহামন এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত এবং খালেদা জিয়াও তা জানতেন বলে অভিযোগ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আমরা বিচার করে রায় কার্যকর করেছি। সেই খুনিদের তারা রক্ষা করেছে। আজকে তাদের কী অবস্থা? গণতন্ত্র নাকি উদ্ধার করতে হবে। অবৈধ সরকারের পকেট থেকে সৃষ্টি দল নাকি গণতন্ত্র উদ্ধার করবে—এই হলো অবস্থা।’ প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, অবধৈভাবে ক্ষমতা দলখকারীর দ্বারা সৃষ্ট সেই দল আবার গণতন্ত্র উদ্ধার করবে! তিনি আরও প্রশ্ন করেন, ‘কী করবে সেটাই হচ্ছে আমার প্রশ্ন। আর সেই কথা শুনে আবার কিছু লোক তাল মেলায়। এদের জ্ঞানবুদ্ধি কোথায় থাকে? তারা কি বাস্তবটা বুঝতে পারে না?’

বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি লাফালাফি করে। তাদের নেতা কই? জিয়া ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে। সে সাজা প্রাপ্ত। হ্যাঁ, অসুস্থ বয়োবৃদ্ধ তার (খালেদা জিয়া) বোন-ভাই, বোনের জামাই আমার কাছে এসেছে, আবেদন করেছে। আমরা তার সাজাটা স্থগিত করে বাড়িতে থাকার সুযোগ দিয়েছি। মানবিক কারণে দিয়েছি।

‘বিএনপি বেশি বাড়াবাড়ি করলে আবারও জেলে পাঠিয়ে দিব। কোনো চিন্তা নেই। এখন বলি তার ছেলেন গুণের কথা। খালেদ জিয়ার আমলে কয়টা সরকার ছিল? প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটা আর হাওয়া ভাবনে একটা। কোনো উন্নয়ন হয়নি। ব্যবসায়ীদের দুই জায়গাতেই কমিশন দিতে হতো।’

বিএনপির সময়ের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর আবার উত্তরবঙ্গে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। হাওয়া ভবনে পাওয়া না দিলে কেউ ব্যবসা করতে পারত না। সব জায়গায় দিয়ে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করতে হতো। এমন কোনো ব্যবসা ছিল না যেটা তারা দখলে নেয়নি। চরম দুর্নীতি। টাকা পাচার। আমেরিকার এফবিআইয়ের অফিসার দেশে এসে তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে যায়। সেই মামলায় তারেকের সাজা হয়। সাত বছরের জেল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির গঠনতন্ত্রে আছে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত কেউ নেতৃত্ব দিতে পারবে না। তাদের দুই নেতাই তো সাজাপ্রাপ্ত।’ তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, বিএনপি যে এত লাফালাফি করছে, তাদের জিজ্ঞেস করবেন, আপনাদের মাথা কোথায়? যারা দুর্নীতি, লুটপাট করেছে, মানুষের ওপর হামলা করেছে, তারা যদি ক্ষমমতায় আসে তাহলে দেশের অবস্থা কী হবে? সেটা কি একবার ভেবে দেখেছে এ দেশের মানুষ? একবার চিন্তা করে দেখেন। এ দেশের মানুষ জানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশের সাধারণ জনগণ কিছু পায়।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলের আদালত সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে গঠন করা দল বিএনপি তো তাহলে অবৈধ। সেনাপ্রধান থেকে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা জিয়াউর রহমান কিভাবে গণতন্ত্রের প্রবর্তক হয়? আমাদের দেশের কিছু জ্ঞানীগুণী বুদ্ধিজীবী কিভাবে বলে জিয়াউর রহমান গণগন্ত্রের প্রবর্তক?’

১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর হত্যাকাণ্ডের জন্য জিয়াউর রহমানকে দায়ী করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শ ও বিজয়কে নস্যাৎ করার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর একে একটা পরিবারের হত্যাণ্ড বোঝানোর চেষ্টা করেন জিয়াউর রহমান, কিন্তু ৩ নভেম্বর জেলহত্যার পর সবাই বুঝতে পারে এটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আদর্শিক হত্যাকাণ্ড। সেটাই মানুষ উপলব্ধি করে।

৭৫-এ দেশ স্বাধীন ছিল কি না সেই প্রশ্নও রাখেন শেখ হাসিনা।

বিএনপির সাম্প্রতিক আন্দোলনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবৈধ সরকারের অধীনে গঠিত দল (বিএনপি) আজ আন্দোলনের নামে লাফালাফি করে। ভালো কথা, আমরা বলেছি, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করেন আমরা কোনো বাধা দেব না। কিন্তু লাঠিসোটা নিয়ে এসে ভাব দেখানো, আর যদি একটা মানুষের গায়ে হাত দেয়, আমরা ছাড়ব না। কারণ তারা কী করেছে? তাদের আন্দোলন মানে হচ্ছে জ্বালাওপোড়াও। তাদের আন্দোলন মানে হচ্ছে অগ্নি সন্ত্রাস। ২০১৩-১৪-১৫ কী তাণ্ডব তারা করেছে সারা বাংলাদেশে! পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর সেটাই তারা প্রমাণ করেছে। সেই সময় তিন হাজার ৩৬ জন মানুষকে অগ্নিদ্বগ্ধ করেছে। ৫০০ জন মানুষ মারা গেছে। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্তা আমরা করেছি। আমি করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী সে সময়ের পুরো ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘৭০টা সরকারি অফিস ও ছয়টা ভূমি অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে। এরপর যেই আমি বললাম, বিএনপির কোনো নেতার জমির পরচা দেওয়া হবে না। সব জমি সরকারের হয়ে যাবে। তখন থেমেছে। যেমন কুকুর তেমনি মুগুর না হলে সোজা হয় না। আমরা গাছ লাগিয়েছি। ২৫ থেকে ৩০ হাজার গাছ কেটেছে। আমরা রাস্তা করেছি। তারা সেই রাস্তা কেটে দিয়েছে। যত রকমের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করায় বিএনপি পারদর্শী।’

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এদের এই অত্যাচারের কথা কি দেশবাসী ভুলে যাবে? নির্যাতনের কথা ভুলে যাবে? তাদের হাওয়া ভবন, খাওয়া ভবনের কথা কি দেশবাসী ভুলে যাবে? তাহলে মানুষ কেন তাদের পাশে থাকবে? ২০০৯ সালের পর যে উন্নয়নগুলো করেছি, সেগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। তাদের মনে করিয়ে দিতে হবে, কী ছিল আর কী হয়েছে। এ সময় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে সামনে নির্বাচন। মানুষের মন জয় করতে হবে, মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। তাহলে নৌকা মার্কায় জনগণ ভোট দেবে।

স্মরণ সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম এমপি, ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, কেন্দ্রীয় কর্যনির্বাহী সদস্য পারভিন জামান কল্পনা, জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি এমপি, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সভাপতি আবু হানিফ মন্নাফি, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি বজলুর রহমান প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ ও উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ, ১৫ আগস্টের সকল শহীদ, ৩ নভেম্বরের শহীদ, ২১ আগস্টের শহীদ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জীবন দেওয়া সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে সভা শুরু করা হয়।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension