
বিলবোর্ডে নির্বাচনী প্রচার, বৈষম্যের নতুন বিজ্ঞাপন
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা প্রচারের জন্য পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। পোস্টারের পরিবর্তে বিলবোর্ড বসিয়ে প্রচার চালাতে পারবেন। একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড স্থাপন করতে পারবেন। সম্প্রতি জারি করা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য আচরণ বিধিমালায় এমনটিই বলা হয়েছে।
বিলবোর্ডে প্রচার চালানোর বিষয়ে এরই মধ্যে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিত্তশালী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বিলবোর্ড বসানোর খরচ সামলানো কঠিন না হলেও অন্যদের জন্য এর ব্যয় বহন করা কঠিন হবে। ফলে নির্বাচনী প্রচারে বৈষম্য তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বিলবোর্ড স্থাপনের মতো পর্যাপ্ত স্থান আছে কিনা, নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে কিনা, পরিবেশের কতটা ক্ষতি হতে পারে, সিটি করপোরেশন এ থেকে রাজস্ব পাবে কিনা– এসব প্রশ্নও উঠেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গত ১০ নভেম্বর আচরণ বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ৭ (ক) ধারায় বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারে কোনো প্রকার পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। আর ১৪ (ক) ধারায় বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। ‘খ’ ধারায় উল্লেখ করা হয়, একজন প্রার্থী ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা জানান, একটি আসনে যদি ১০ জন প্রার্থী থাকেন, তাহলে জনবহুল ঢাকা মহানগরীতে ২০০ বিলবোর্ড বসানোর মতো স্থান পাওয়া কঠিন হবে। মহানগরীর ১৬টি সংসদীয় আসনে তিন হাজারের বেশি বিলবোর্ড বসানো হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তা ছাড়া প্রার্থীদের মধ্যে পছন্দের স্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। যত্রতত্র বিলবোর্ড বসালে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বাতাসে বিলবোর্ড ভেঙে লোকজনের আহত হওয়ার একাধিক দুর্ঘটনাও ঘটেছে।
বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে থাকে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভাগুলো। সংস্থাগুলো থেকে অনুমোদন নিয়ে বিলবোর্ড ভাড়া দেন ব্যবসায়ীরা। আকার ও এলাকাভেদে ভাড়া কমবেশি হয়। আচরণবিধিতে ১৬ ফুট প্রস্থ ও ৯ ফুট উচ্চতার বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণ বছর ভিত্তিতে বিলবোর্ড ভাড়া দেওয়া হয়। প্রতিটির জন্য ৮ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়। নির্বাচনী বিলবোর্ড এক মাসের জন্য রাখতে হলেও অন্তত ৫০ হাজার টাকা খরচ পড়বে। কেউ ২০টি করতে চাইলে তাঁকে এ খাতে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে।
কয়েকজন রাজনীতিক জানান, বড় দলগুলো এবং বিত্তবান প্রার্থীদের জন্য এ খরচ বেশি নয়। কিন্তু ছোট দলগুলো, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত প্রার্থীদের জন্য এটি বড় ধরনের চাপ। প্রচার বিজ্ঞাপনেই তারা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়বেন।
এর বাইরে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে বাড়তি কিছু সমস্যা তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা। চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দা এসএম সারোয়ার জাহান বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে এত বিলবোর্ড লাগানোর জায়গা নেই। এটা করা হলে একজন আরেকজনের মুখ দেখতে পারবে না। শুধু বিলবোর্ডই দেখতে হবে।
প্রায় একই ধরনের কথা বলেন বরিশাল নগরীর বাসিন্দা সুমন চৌধুরী। তিনি বলেন, এক সময় নগরী বিলবোর্ডে ঢেকে গিয়েছিল। এ নিয়ে গণমাধ্যমে কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সিটি করপোরেশন সেগুলো উচ্ছেদ করে। অশ্বিনী কুমার হলের চারপাশ ঢেকে গিয়েছিল। এখন সেখানে সৌন্দর্য ফিরে এসেছে। এ ছাড়া শহরের আর কোনো বড় উন্মুক্ত জায়গা তেমন নেই, যেখানে বিলবোর্ড বসানোর সুযোগ আছে। অন্য সিটি করপোরেশনগুলোতেও প্রায় একই চিত্র।
সিটি করপোরেশন বিলবোর্ডের খাত থেকে বিপুল রাজস্ব পায়। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই আচরণবিধি চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। এমনকি গেজেট হওয়ার পরও গতকাল পর্যন্ত সিটি করপোরেশনকে অবহিত করা হয়নি। সিটি করপোরেশনও বুঝতে পারছে না, কোন প্রক্রিয়ায় বিলবোর্ডগুলো স্থাপন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জহিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এ ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য ডিএসসিসি এখনও পায়নি। গণমাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছেন। বিলবোর্ড খাত থেকে ডিএসসিসি কিছু রাজস্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু সরকার সিদ্ধান্ত নিলে কোনো রাজস্ব পাওয়া যাবে না। আবার নির্বাচন শেষে ময়লা-আবর্জনা ডিএসসিসিকেই অপসারণ করতে হবে। ডিএসসিসির অনেক এলাকা ঘিঞ্জি ও সরু অলিগলি আছে। সেখানে বিলবোর্ড বসানোর মতো সুবিধাজনক স্থান পাওয়া মুশকিল হতে পারে। এ ছাড়া পরিবেশের বিষয়টিও দেখতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন রাজধানী থেকে অবৈধ বিলবোর্ড-ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণের কাজ শুরু করেছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন আর নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার হয় না। সেসব দেশে প্রচারের জন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জায়গা প্রার্থীদের সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সভা-সমাবেশের স্থানও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এতে পরিচ্ছন্ন থাকে পরিবেশ। এবার নির্বাচন কমিশনের এ রকম উদ্যোগকে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তবে ঢাকা নগরীর একেকটি নির্বাচনী আসনের আয়তন অনেক কম। সে তুলনায় অনেক বেশি পরিধি গ্রামীণ এলাকার একটি আসনে। তাই সব ক্ষেত্রে একই কৌশল হওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ। সমকালকে তিনি বলেন, অতীতে পোস্টারগুলোকে পলিথিন দিয়ে লেমিনেটিং করে প্রার্থীদের লাগাতে দেখা গেছে। কখনও বৃষ্টি বা ঘন কুয়াশা পড়লে পোস্টারগুলো পড়ে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি করেছে। আবার সেই পোস্টার অপসারণ করতেই সিটি করপোরেশনগুলোকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। সেদিক থেকে এটা অনেক ভালো উদ্যোগ। এ ছাড়া আগে প্রযুক্তি আধুনিক ছিল না। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাপানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে প্রার্থীদের প্রচারণার স্থান সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সেখানেই তারা পোস্টার লাগান। সেখানেই তারা অনুষ্ঠান করেন। সে রকম একটা নিয়মের মধ্যে রাখা গেলে ভালো হতো। নির্বাচন কমিশনের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) এলাকায় সর্বোচ্চ এক হাজার ৬২৫টি বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর বাইরে অসংখ্য অবৈধ বিলবোর্ড, ব্যানারে রাজধানী ছেয়ে যেত। ডিসিসি ভেঙে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন হওয়ার পর পরিবেশবাদী, নগরবাসী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের চাপে একসময় তৎকালীন দুই মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন বিলবোর্ড অপসারণে নামেন। এর পর থেকে আর দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীতে কোনো বিলবোর্ডের অনুমতি দেয়নি। সম্প্রতি দুই সিটি করপোরেশন আবারও বিলবোর্ডের অনুমতি দেওয়া শুরু করেছে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর কারণ দেখিয়ে তারা বিলবোর্ডের অনুমতি দিচ্ছে।
বাংলাদেশ বিলবোর্ড অ্যাডভার্টাইজিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী মো. রাশেদ সমকালকে বলেন, নির্বাচনী বিলবোর্ডের অনুমতি সিটি করপোরেশন দেবে। যারা পেশাদার বিলবোর্ড ব্যবসায়ী, তারাই সেটা পাবেন। প্রার্থীরা ভাড়া নিয়ে তাদের প্রচারণা চালাবেন। নির্বাচনের প্রচার শেষ হলে বিলবোর্ড ব্যবসায়ীরা অন্যদের কাছে ভাড়া দেবেন। নতুন করে বিলবোর্ডের অনুমতি না দিলে যেগুলো এখন আছে বা খালি আছে, সেগুলো ভাড়া নিয়ে প্রার্থীরা প্রচারণা চালাবেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নতুন করে প্রার্থীদের বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দিলে সেই বিলবোর্ড আর ওঠানো সম্ভব হবে না। তখন ঢাকা শহর আবার জঞ্জালে ভরে যাবে।
নির্বাচনী আচরণবিধি ৭-এ বলা হয়েছে, প্রার্থীরা অনধিক ২০টি বিলবোর্ড স্থাপন করতে পারবেন। তবে এ ধারার ‘ঘ’-তে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থীর বিলবোর্ডের ওপর অন্য কোনো প্রার্থীর লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ড লাগানো যাবে না এবং ওই বিলবোর্ডের কোনোরূপ ক্ষতিসাধন তথা বিকৃত বা বিনষ্ট করা যাবে না। বিলবোর্ডের আকার-আকৃতি কী রকম হবে, সেটা আচরণবিধিতে সুস্পষ্ট করা হয়নি। অবশ্য ব্যানারের আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুট উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেটা হতে হবে সাদাকালো।
রাজনৈতিক দলগুলো যা বলছে
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সংলাপে নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধন করার দাবি উঠেছে। প্রচারে পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ ও বিলবোর্ডের ব্যবহার সীমিত করার সমালোচনা করা হয়েছে। দলগুলো বলছে, পোস্টার ব্যবহার না হলে সহজে ভোটারদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণ করেনি। নিজেদের মতো করে আচরণবিধি সংশোধনের গেজেট করেছে। তাই পোস্টার থাকবে কি থাকবে না, এখন আর তা নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। এ ছাড়া ২০টি বিলবোর্ডও যথেষ্ট নয়। ইসিকে এ বিষয়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। সব প্রার্থী যেন সমান প্রচার সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ পান।
ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বলেন, বিএনপি সবসময়ই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এখন যেভাবে আইন হবে, সেভাবেই তারা কাজ করবেন। তবে দেশের মানুষের কাছে নির্বাচন এক ধরনের উৎসব। তাই এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক হবে না, যাতে সেই উৎসবে কোনো ভাটা পড়ে।



