Uncategorized

বেঙ্গলিস বিগেস্ট এন্টারটেইনমেন্ট: ‘মদ’ নাকি ‘মেয়েমানুষ?’

মৌসুমী প্রামাণিক মৌসান

 

আজ একটু দেরীতেই ঘুম ভেঙেছে। অনেক রাত অবধি আজকের বাঙালির ক্ষণিকের সুখ নিয়ে চর্চা, পরিচর্চাতে ব্যস্ত ছিলাম। সকাল সকাল আনন্দ বাজার আমার হাতে লেখার টপিক তুলে দিল। অক্টোবর মাসে মদ বিক্রিতে নাম্বার ওয়ান আমাদের বাংলা। দুর্গাপুজোকে কমপিট দিতে কালীপুজোতেও মানে নভেম্বর মাসেও রেকর্ড ব্রেক করার প্রতিজ্ঞা করেছে বাঙালি সন্তানেরা, যারা নাকি দুধে-ভাতে বড় হয়েছিল। রাজ্য সরকার খুশি। কিন্তু আমরা যারা বাঙালি সমাজের ভালো না চেয়ে থাকতে পারি না, তারা? তারা কিন্তু অশনি সঙ্কেত দেখছি। কেন? বাঙালী আবার বাবুগিরিতে নাম্বার ওয়ান হবে, পণ করেছে যে!

বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে বিমল কর ইত্যাদি সাহিত্যিকের গল্পে আমরা বাঙালির বাবুগিরির নমুনা দেখেছি। মদ, বাঈজী আর প্রতিযোগিতাকে ঘিরে ছিল বাবুদের জীবন। কোটি কোটি টাকা উড়েছে, পুড়েছে শুধুমাত্র ফুর্তি আর ফুটানি করতে গিয়ে। শেষ হয়ে গিয়েছিল বাঙালীর ঐশ্বর্য্য ও ধর্মজ্ঞান। দ্বিচারিতা, তাবেদারি ও বিশ্বাসঘাতকতা, কাঁকড়ার মত একে অন্যকে টেনে নীচে নামানো ইত্যাদি গুন তাই ইস্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে অ্যাডভানটেজ দিয়েছিল বাংলা হয়ে ভারতবর্ষ দখলের।

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দ, রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর তৎকালীন বাঙালি সমাজকে কিছুটা হলেও শোধন করতে সমর্থ্য হয়েছিলেন। আমাদের আগের জেনারেশান অবধি শৃঙ্খলা, শালীনতার মাত্রা যথেষ্ট পরিমাণে বজায় ছিল। কিন্তু আমাদের জেনারেশান ও পরবর্তী জেনারেশান যে গঙ্গার কালিমালিপ্ত জলের সঙ্গে নিজেদেরকেও ভাসিয়ে দেবার প্ল্যানিং করে ফেলেছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিভাবে?

১. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বনাশ তো আমরা প্রতিনিয়ত করেই চলেছি। নিজের ছেলেমেয়েদের বাংলা সাহিত্যের থেকে দূরে আরও দূরে নিয়ে যাচ্ছি। ছেলেমেয়েদের উন্নতির জন্যে বাংলা ভাষাতে কথা বলতেও লজ্জা পাচ্ছি। পোষাকে, খাদ্যাভাসে, স্টাইলে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি না হোক ওয়েস্টার্ন ব্যবসাদারদের হাতে সন্দেহাতীতভাবে নিজেদের সমর্পণ করেছি। সপ্তাহ শেষে এবং ছুটিছাটায় মদ্যপানের আসর না বসালে আমি জাতে উঠব কেমন করে?

এটা শুধু হাই স্ট্যাটাসে নয়, নিম্নবিত্ত থেকে ধনী সব পরিবারেই বিষের মত ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্যানসার হয়ে। আমি মদ্যপানের বিরোধী নই। এনজয় করার জন্যে খাওয়া যেতেই পারে অকেশানালি। কিন্তু অবসন্নতার আবডালে নিজেকে মদে ডুবিয়ে স্বর্গসুখ খোঁজাতে এবং সেটাকে অভ্যাসে ও অকারণ ফানে পরিণত করাতে যে আখেরে নিজের ও নিজের পরিবারের ক্ষতি হচ্ছে, সেটা আমরা ভুলে গিয়েছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা আমাদের থেকে কি শিক্ষা পাচ্ছে, একবারও ভাবছি কি? প্রায়শই রাতের বেলা যুবক-যুবতী এমনকি টিনেজারদেরও দেখি রাস্তায় মদে চুর হয়ে বাইক কিংবা গাড়ি নিয়ে র‍্যাশ ড্রাইভ করতে। এটাই কি বাংলা সংস্কৃতি? এটাই কি বাঙালি সমাজের আধুনিকতা?

২. ৭০ ভাগ বাঙালী আজ পলিটিকালি বায়াসড। পলিটিক্স ও তোলাবাজি, আজ সবচাইতে বড় ব্যবসা। কে কাকে বাধা দেবে? সকলেই জড়িত। তবুও বাঙালি করে কর্মে খাচ্ছে তো!

৩. আজ সেই কালী মা আর দুর্গা মায়ের আরাধনা করছে যে বা যারা, তারাই মা-বোনদের শ্লীলতাহানি করতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করে না। যে বা যারা মেয়েদের অত্যাচারিত, অপমানিত হতে দেখেও মুখ ঘুরিয়ে নেয়। অসহায় মেয়েটির কান্না দেখেও যাদের মন বিগলিত হয় না। তারা তখন সেই মেয়েটির মধ্যে খুঁত খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যায়, মেয়েটির অতীত ঘাঁটতে ব্যস্ত হয়ে যায়। ঘটনাটি অনভিপ্রেত- মুখে বলে বটে, আর তার সঙ্গে এটাও বলে, ‘এত মেয়ে থাকতে ওই মেয়েটির সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটলো কেন?’

হায়রে! বাঙালি! তোমার ঘরেও তো মা, বোন, মেয়ে আছে। তোমাদের ঘরের মেয়ের গায়ে আঁচড় না লাগলে কি তোমরা বুঝবে না? শুনতে পাবে না অসহায় মেয়েটির বাবা-মায়ের আর্তচিৎকার? তবে এখন তো আজ যে ভাইয়া কাল তার সাঁইয়া হতে বেশি সময় লাগছে না! যাকে মা বলে ডাকছে, মত্ত অবস্থায় তাকে ধর্ষণ করতেও দ্বিধা বোধ করছে না!

৪. সাহিত্য-সংস্কৃতি জগৎ বাঙালির শিড়দাঁড়া ছিল বহু বছর ধরে। সেখানেই ঘুণ ধরেছে আজকাল। বাঙালি অভিনেতা, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকরা নামের আশায় গা বাঁচিয়ে চলছেন। অন্যায় দেখলেও প্রতিবাদ করতে ভুলে যাচ্ছেন। কূট-কাচালিতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছেন। যে সাহিত্য, সিনেমা, নাটক সমাজের দর্পণ ছিল, স্বভাবতই সেই আয়নাতে দাগ লেগেছে।

এবার আসি ‘মেয়েমানুষ’-য়ের কথায়। না, আজকের বাঙালি বাবুদের দূর দূরান্ত থেকে বাঈজী আনতে হয় না। অনেক বাঙালি মেয়েরাই নাচে, গানে ও অভিনয়ে পটু। কবিতাও লিখে ফেলছে যখন তখন। তাদের আবেগপ্রবণ, সংবেদনশীল মন। কলম তো ধরবেই। কিন্তু শুধু লিখলে তো হবে না! শুধু ভালো অভিনয় করলে তো হবে না! শুধু ভালো গান জানলে তো হবে না! ওপরে উঠতে হবে যে! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ট্যালেন্টের অভাব নেই। র‍্যাট রেসে পিছিয়ে পড়ি যদি?

অতএব…কে কতরকমভাবে বাঙালী বাবুদের খুশি করতে পারে তারও প্রতিযোগিতা চলছে। তাই তারা সময়ে অসময়ে নিজেদেরকেই উপঢৌকন করে তুলে দিচ্ছে বাবুদের হাতে।

অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আমরা বাঙালি মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের তথা সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনছি। আমরাই সুযোগ করে দিচ্ছি পুরুষদের আমাদের মন ও জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে। কথায় বার্তায়, অ্যাটিটিউডে, পোশাকে নিজেদের স্মার্ট ও সেক্সি করতে গিয়ে, এমনকি ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করার মধ্য দিয়েও পুরুষের আদিমতাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করে চলেছি প্রতিনিয়ত।

অনেক বছর ধরে হাই স্ট্যাটাসে বিলংগ্ করেছি, সেখানে দেখেছি অবাধ মেলামেশা। আর আজ সাহিত্য ও নাটক তথা সিনেমা জগতে দেখছি আর একরকম নোংরামি। দেখছি কিভাবে মাতা সরস্বতীর বরপ্রাপ্ত মানুষগুলো নিজেদের পবিত্র কর্মক্ষেত্রকে কবিতা, গল্পের আসর, নাটকের ওয়ার্কশপ, গানের মাচা ও শর্ট ফিল্মের নামে কলুষিত করছে। অলমোস্ট মধুচক্রের আসরে রূপান্তরিত করছে! হরির লুটের মত টাকা উড়ছে; সঙ্গে ক্ষণিকের ভালো লাগা ও খুশি।

আমাদের মত কিছু সংবেদনশীল, আবেগপ্রবণ মানুষ আছেন, তারা দেখছেন, কষ্ট পাচ্ছেন, কিন্তু প্রতিবাদ করতে কেউ এগিয়ে আসছেন না। সাহস পাচ্ছেন না। আইসোলেটেড হয়ে যাবার ভয় আছে তো! বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার সাহস নেতাজী সুভাষচন্দ্রের পরে আর কোনও বাঙালির হয় নি, হবেও কিনা সন্দেহ আছে। কারণ আমরা যে ইউনাইটেড নই।

এই যে আজ আমি এই লেখাটা লিখছি, হয়ত আমাকেও একঘরে করে দেওয়া হবে। আমার সাহিত্যক বন্ধুরা আমাকে ব্লক করে দেবেন না হয় এড়িয়ে চলবেন। আমার সত্যি তাতে কিছু এসে যায় না। আমার লেখার ক্ষমতার উপর আমার আত্মবিশ্বাস আছে। এতদূর আসতে আমাকে তাঁবেদারি করতে হয় নি। নিজেকে উপঢৌকন করে কারোর হাতে তুলে দিতেও হয় নি। একজন দুজন করে আমার পাঠক তৈরি হয়েছে। আর আমার পাঠকরা আমার ওয়েল উইশারও। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে তারাই আমাকে সাহস জোগান। তাই ছদ্মবেশী, ডবল স্ট্যাণ্ডার্ড সাহিত্যক বন্ধুদের আমার কোন প্রয়োজন আগেও ছিল না, এখনও নেই।

পুজোর জাস্ট আগেই আমার সঙ্গেও অন্যায় হয়েছে! চূড়ান্তভাবে আমাকে অসম্মানিত করা হয়েছে। সে কালচে রক্তের দাগ এখনও শুকায় নি। শুকাতে দেব না আমি। সময় ও সুযোগ আসলে সেই ভালোমানুষী মুখোশগুলো টেনে খুলে ফেলতে আমি নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, কারোর চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসের ওপর সুখের ইমারত গড়ে তোলা যায় না। তাই চান্স আমি পাবোই। পৃথিবীটা তো যে গোল!

তবে আমি জানি এখনও কিছু ভালো মানুষ আছেন। তাদের আজ আমি আহ্বান জানাতে চাই। ‘আসুন বন্ধুরা বাঙালির এই দুর্দিনে আমরা নতুন কিছু করার কথা ভাবি। আপনিও সাহিত্য, সিনেমা, নাট্যকর্মী, পুজো করেন আপনার কাজকে। আমার বাড়ির পাশের নর্দমাটাকে আমাদেরকেই পরিষ্কার করতে হবে। তা নাহলে পাঁকে বিষাক্ত পোকা জন্মাবে, দূরারোগ্য অসুখ ছড়াবে। বন্ধু, আগেও বলেছি, আবারও বলছি, আজ ভাবছেন আমি তো ভালো আছি, বেশ আছি। নিশ্চয় আছেন, কিন্তু আগুন লাগলে, সেই আগুন আপনার ঘরের চাল পোড়াবে না, তা কি কেউ বলতে পারে? আপনার গায়ে দাবানলের ছোঁয়াচ লাগবে না- আপনি হলফ করে বলতে পারেন?’

নইলে বাঙালি সেই পতনের দিকে যে হারে এগিয়ে চলেছে, ইতিহাস বলবে একদিন, “ওয়ান্স আপন আ টাইম  দেয়ার ওয়াজ আ কাস্ট নেইমলি বেঙ্গলি…’  ভেবে দেখুন… সেদিন আপনার দুধে ভাতে নাতি পুতিরা আপনার জন্যে গর্ববোধ করবে তো!?

কোলকাতা থেকে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension