
ভারতে কৃষক আন্দোলন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক টুইট যুদ্ধ
ভারতের চলমান কৃষক আন্দোলন ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কৃষকরা মাসের পর মাস বিক্ষোভ করে আসলেও দাবি মানতে নারাজ বিজেপি সরকার। ফলে একদিকে কঠোর হচ্ছে সরকারের অবস্থান আর অন্যদিকে কৃষকরাও দাবি না মানা পর্যন্ত রাজপথ দখলে রাখার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।
দুপক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থানের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক মাধ্যমেও। বিক্ষোভ নিয়ে টুইটারে সেলিব্রেটিদের পোস্ট নিয়ে শুরু হয়েছে আরেক তোলপাড়। ভারতীয় তারকারা নিশ্চুপ থাকলেও কৃষক আন্দোলনে বিভিন্ন দেশের সেলিব্রেটিরা সংহতি জানিয়েছেন। তবে তাদের এই ভূমিকার নিন্দা জানিয়ে পাল্টা অবস্থান নিয়েছে ভারতীয়রা।
ঘটনার সূত্রপাত পপ সুপারস্টার রিয়ান্নার টুইটে। মার্কিন এই সঙ্গিতশিল্পী এই খবরের একটি লিঙ্ক শেয়ার করে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গন কেন এই ইস্যুতে নিরব? আর তারপরেই রিটুইট করতে থাকেন বিভিন্ন অঙ্গনের আন্তর্জাতিক তারকারা।
কৃষকদের বিক্ষোভ দমনে ভারত সরকারর ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার খবর টুইটারে শেয়ার করে পোস্টের ক্যাপশনে রিয়ান্না বলেন, “আমরা কেন এটা নিয়ে কথা বলছি না?” সঙ্গে ‘হ্যাশট্যাগ কৃষকবিক্ষোভ’ যুক্ত করে দেন।
এরপর সুইডেনের পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও এগিয়ে আসেন। টুইটারে পোস্ট দিয়ে তিনি বলেন, “আমি ভারতের বিক্ষোভরত কৃষকদের পাশে আছি।” রিহান্নার মতো একই হ্যাশট্যাগ দেন তিনিও। তবে তাঁর সেই টুইটে একটি প্রতিবাদলিপি যুক্ত থাকায় ক্ষিপ্ত হয় ভারতবাসী। টুইটের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো টুলকিট মুছে দিয়েও রেহাই পাননি গ্রেটা।
ভারতীয় সেলিব্রেটিরা প্রতিবাদ করে বলছেন, এ আন্দোলনে বিদেশিরা দর্শক হতে পারেন, এর অংশ হওয়ার কোন অধিকার তাদের নেই। আন্দোলন উস্কে দেয়ার অভিযোগ তুলে অনেক বিদেশী তারকাদের সমালোচনা করেন ভারতীয়রা।
কিংবদন্তি ক্রিকেটার সচীন টেন্ডুলকার প্রথম এক টুইতে বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। আর তাই কোনো রাখঢাক না রেখে অন্যান্য সেলিব্রেটিরাও তার সঙ্গে সুর তোলেন। এরপর ক্রিকেটারদের সঙ্গে বলিউড সেলিব্রেটিরাও তুলাধোনা করেন বিদেশীদের। অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ কোন অবস্থাতেই মেনে নেয়া হবে না বলে হুংকার দেয় ভারত। স্বার্থান্বেষী আন্তর্জাতিক মহলের বিরুদ্ধে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে এগিয়ে আসেন অনেকেই।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, “কিছু স্বার্থান্বেষী মহল দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের চেষ্টা করছেন। এরকম স্পর্শকাতর বিষয়ে হুটহাট মন্তব্যের আগে আসল ঘটনা বোঝা দরকার এবং বাস্তব ধারণা নেয়া প্রয়োজন।”
আন্তর্জাতিক সেলিব্রেটিদের উসকানিমূলক হ্যাশট্যাগ ও মন্তব্য দায়িত্বশীল আচরণ নয় বলেও ক্ষোভ জানায় ভারত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিবৃতিসহ টুইটে ‘ঐক্যবদ্ধ ভারত’ ও ‘প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে ভারত একজোট’ এসব হ্যাশট্যাগ যুক্ত করে দেয়।
ভারতীয় সেলিব্রেটিরা সরকারের প্রতি তাদের জোর সমর্থন জানান। সচিন টেন্ডুলকার লিখেছেন, “ভারতের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোন আপস হবে না। ভারতীয়রাই ভারতের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেবেন। জাতি হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে চাই।”
‘ভারত ঐক্যবদ্ধ’ হ্যাশটাক দিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলি বলেন, “কৃষকেরা আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অস্থির সময়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও সামনে এগিয়ে যেতে শান্তিপূর্ণ সুরাহা হবে বলেই আমি নিশ্চিত।”
তারকা ক্রিকেটার রোহিত শর্মা, আজিঙ্কা রাহানে, হার্দিক পাণ্ড ও নারী ক্রীড়াবিদ পিটি ঊষারাও এই ইস্যুতে আওয়াজ তুলেছেন। কৃষি আইন নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাবে দেশটির মন্ত্রীদেরও সরব হতে দেখা গেছে। একে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রপাগান্ডা বলেই দাবি তাদের।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ টুইটারে করেছেন, “কোনো অপপ্রচার আমাদের ঐক্যকে রুখে দিতে পারবে না। অপপ্রচার ভারতের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। কেবল অগ্রগতি সেটা করতে পারে।”
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ সফল হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে তিনি বলেন, “নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণে আমরা আত্মবিশ্বাসী।”
গত বছর প্রস্তাবিত বিজেপি সরকারের নতুন কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে চল্লিশটি কৃষক ইউনিয়ন সংঘবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। দাবি না মানলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা কৃষকদের। সরকার বলছে, নতুন আইন কৃষক ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের শৃঙ্খলমুক্ত করবে। আর কৃষকরা বলছেন, এই আইনে মালিকগোষ্ঠীর কৃতদাসে পরিণত হবেন তারা।❐



