
সম্পাদকীয়
ভাষা দিবসের অবিচ্ছেদ্য অংশ একুশে গ্রন্থমেলা
বাঙালি জাতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস ফেব্রুয়ারি। এ মাসে একসঙ্গে বেশ কটি উৎসব আমরা উদ্যাপন করি। হ্যাঁ, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা আধুনিক হয়েছি। মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপের যুগে মানুষ বই পড়তে আগ্রহ হারাচ্ছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজতে ব্যস্ত! তবুও পুরোপুরি হারিয়ে যায় নি বই।
যেমন হারিয়ে যায় নি আমাদের ঐতিহ্য। গ্রন্থমেলাও আমাদের এক ঐতিহ্য। এ মেলা মনে করিয়ে দেয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের কথা। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না-জানা শহীদদের আত্মত্যাগের কথা।
গাইতে ইচ্ছে করে- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। আমি কি ভুলিতে পারি?’ এ গান শুধু একটি সঙ্গীত নয়। এ গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় বায়ান্নর পটভূমি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা গানটি বর্তমানে হিন্দি, মালয়, ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ, জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়।
আজ আমরা স্বাধীন জাতি বলে গর্ব করি। আমাদের এই স্বাধীনতার প্রেরণা তো একুশ থেকেই পাওয়া। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঙালি নিজের অধিকার ছিনিয়ে আনতে পারে, যার সূচনা হয়েছিল একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালেই। তখন থেকে প্রতিবছর এই দিনটি শোক ও শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে এসেছে।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারিভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ ও মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। তবে ২০১০ সালে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, একুশে গ্রন্থমেলাও ততটা। বাংলাদেশ ছাড়াও কলকাতায়ও ফেব্রুয়ারি এলেই বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়।
মেলার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় স্বাধীনতা লাভের পরের বছর ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে মেলার সূচনা করেন।
এই ৩২টি বই ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা। এ বইগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত তিনি একাই মেলা চালিয়ে যান। ক্রমে অন্যরা তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি।
১৯৮৩ সালে মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে একাডেমি চত্বরে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন করেন। সেই থেকে আজ অবধি গ্রন্থমেলার আয়োজন চলে আসছে। মেলার মাধ্যমে লেখক-পাঠক সম্পর্কের সমন্বয় ঘটছে। অমর একুশ ও একুশে গ্রন্থমেলা পরস্পর নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
