বাংলাদেশ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললেও কাটছে না পুরোনো শঙ্কা

দুই বছরের বেশি সময় পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। তবে মাত্র ২৫টি নির্বাচিত এজেন্সির হাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার মূল নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত খরচের বোঝা চাপানোর সেই পুরোনো ব্যবস্থা আবার ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গতকাল কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়। এর ফলে অনুমোদিত এজেন্সিগুলো আবেদনপত্র প্রসেস করতে পারবে এবং বিদেশ যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কর্মীরা স্বাস্থ্যপরীক্ষা করাতে পারবেন।

তবে অভিবাসন ব্যয়, দেশ ছাড়ার তারিখ কিংবা কর্মীদের কী কী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে—সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কিছু স্পষ্ট করেনি।

সরকার আরও জানিয়েছে, মালয়েশিয়া নীতিগতভাবে কোনো খরচ ছাড়াই ১০ হাজার কর্মী নিতে রাজি হয়েছে। তবে এর যোগ্যতার মানদণ্ড বা নির্বাচন প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলেনি।

বিশেষজ্ঞ এবং এজেন্সি মালিকদের মতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতার অভাব, অতিরিক্ত খরচ এবং অল্প কয়েকটি এজেন্সির একচেটিয়া আধিপত্যের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর সতর্ক করে বলেন, বিনা খরচে চাকরির ক্ষেত্রে যোগ্যতার মাপকাঠি অস্পষ্ট থাকলে তা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মনে মিথ্যা আশার জন্ম দিতে পারে। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট কিছু প্রসেসিং এজেন্সির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে অতীতের অনিয়মগুলো পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে নিবন্ধিত এক এজেন্সির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, কর্মীদের অন্তত ৫ লাখ টাকা দিতে হবে।

‘যদিও চলতি বছর সরকার অভিবাসন ব্যয় প্রায় ৮৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের অন্তত ৫ লাখ টাকাই দিতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ভেরিটে-এর একটি জরিপ অনুযায়ী, ২০২২-২০২৪ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় চাকরি পেতে কর্মীরা সরকারের নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার বিপরীতে গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন।

অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগের জেরে ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত করে মালয়েশিয়া। এর ফলে সরকারি অনুমোদন এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা সত্ত্বেও অন্তত ১৬ হাজার ৯৭০ বাংলাদেশি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি।

নতুন ব্যবস্থার অধীনে, মালয়েশিয়া ২৫টি বেসরকারি এজেন্সি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে (বোয়েসেল) প্রধান প্রসেসিং এজেন্সি হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে অন্য ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মূল প্রক্রিয়াগুলোর জন্য তাদের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এই ২৫টি এজেন্সি ও বোয়েসেল ই-ভিসা প্রসেস করবে এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনাপত্তি সনদ (এনওসি) ইস্যু করবে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেই এই ব্যবস্থা বৃহত্তর অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে।

তারা আরও বলেছে, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব যোগ্যতার মাপকাঠির ভিত্তিতে এজেন্সিগুলো নির্বাচন করেছে। এর আগে বাংলাদেশ বিবেচনার জন্য ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা জমা দিয়েছিল এবং বৃহত্তর অংশগ্রহণের সুযোগ চেয়েছিল।

তবে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার কার্যত সীমিত কিছু এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে থাকা পুরোনো সেই ব্যবস্থাকেই ফিরিয়ে এনেছে।

তিনি বলেন, জরুরি ভিসা প্রক্রিয়াকরণের জন্য ৩১২টি এজেন্সিকে এখনও ওই ২৫টি নির্বাচিত এজেন্সির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা প্রকারান্তরে তাদের সাব-এজেন্সিতে পরিণত করবে।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘একমাত্র পার্থক্য হলো, ৩১২টি এজেন্সি এখন নিজেদের লাইসেন্সে বিএমইটির ছাড়পত্র নিতে পারবে। এ ছাড়া পুরো ব্যবস্থাটি মূলত অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।’

ফখরুল এই বাছাই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন, কেন সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিকে এতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলো না।

অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা তৈরিতে সরকারের ব্যর্থতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, ‘কর্মীদের কত টাকা দিতে হবে, তা কে নির্ধারণ করবে? রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোই কি তবে এই খরচ নির্ধারণ করবে?’

নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়

গতকালের ঘোষণার পরও এজেন্সির মালিকেরা জানিয়েছেন, মেডিকেল পরীক্ষা, ভিসা প্রসেসিং ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা ঠিক কবে থেকে শুরু হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আবেদ এয়ার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মালিক কে এম মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, মালয়েশীয় নিয়োগকর্তারা কর্মী বরাদ্দ পেয়ে গেলেও মেডিকেল পরীক্ষা, কলিং ভিসা এবং সরকারি ছাড়পত্র পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর কাছে এখনো কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে নিয়োগকর্তাদের প্রত্যাশা ও বর্তমান নিয়োগ ব্যবস্থার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই দীর্ঘসূত্রতা চলতে থাকলে মালয়েশিয়ায় অন্তত দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মীর যাওয়ার সুযোগ বা চাহিদা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

শিমুল আরও বলেন, বিমান ভাড়া, প্রসেসিং খরচ এবং মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা বিবেচনা করে সরকার এখনও অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করতে পারেনি।

এজেন্সির মালিকরা এর আগে জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়ার প্রায় ৩৫০ জন নিয়োগকর্তা কর্মী কোটার জন্য আবেদন করেছেন এবং ইতোমধ্যে ৬ হাজারের বেশি পদের কোটা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সত্যায়নের জন্য কিছু চাহিদাপত্র কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশনেও পাঠানো হয়েছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর মালয়েশীয় সুপারমার্কেট চেইন এনএসকে ট্রেড সিটির ২৮ কর্মীর একটি চাহিদাপত্র হাইকমিশন সত্যায়ন করে।

আরেক এজেন্সির মালিক সতর্ক করে বলেছেন, দেরির কারণে কিছু পদের কোটা ইতোমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হলে নিয়োগকর্তারা অন্য দেশ থেকে কর্মী নিতে বাধ্য হতে পারেন।

এজেন্সি মালিকরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন বিনা খরচে এবং নিয়মিত বেসরকারি খাতের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলতে দেওয়া হয়।

তাদের একজন প্রস্তাব করেছেন, মালয়েশীয় নিয়োগকর্তারা যেহেতু ইতোমধ্যে কর্মীদের যাতায়াত ও অন্যান্য নিয়োগ খরচ বহন করছেন, তাই তাদের ওপর বাড়তি কোনো খরচ না চাপিয়ে বিনা খরচে নিয়োগের জন্য বরং আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

এদিকে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মেডিকেল পরীক্ষা প্রাথমিকভাবে মালয়েশিয়ার বর্তমান অনুমোদিত তালিকার কেন্দ্রগুলোতেই হবে। তবে যে কেন্দ্রগুলো বিতর্কিত বা অতীতের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, সেগুলোকে এই তালিকার বাইরে রাখা হবে।

নতুন তালিকা চূড়ান্ত করার আগে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের জন্য পরে বাংলাদেশ সফর করবে।

সরকার আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, মেডিকেল পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো একক কেন্দ্র যেন একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হবে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিনা খরচে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন আসিফ মুনীর। তবে তিনি বলেছেন, কর্মী সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, বিনা খরচের (জিরো কস্ট) ১০ হাজার চাকরি কি নতুন আবেদনকারীদের জন্য, নাকি এর আগে টাকা দিয়েও মালয়েশিয়া যেতে না পারা কর্মীদের জন্য—তা যেন স্পষ্ট করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘যোগ্যতার স্পষ্ট মাপকাঠি না থাকলে এই ঘোষণা চাকরিপ্রার্থীদের মনে অবাস্তব প্রত্যাশার জন্ম দিতে পারে।’

২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়ে গঠিত এই নতুন ব্যবস্থা আগের ব্যবস্থা থেকে আদতে কতটা আলাদা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই অভিবাসন বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা ছাড়া কেবল অংশগ্রহণকারী সংস্থার সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে না, আবার শোষণও রোধ করা যাবে না।

স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এবং অতীতের বিতর্কের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে এজেন্সি বাছাই প্রক্রিয়ায় অধিকতর নজরদারির আহ্বান জানান তিনি।

মুনীর জোর দিয়ে বলেন, শুধু কুয়ালালামপুরের নির্ধারিত শর্ত মেনে নিলেই চলবে না, বাংলাদেশের উদ্বেগ ও কর্মীদের স্বার্থও যেন মালয়েশিয়া গুরুত্ব দেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়ে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এলে তা সব ধরনের অনিশ্চয়তা দূর করতে সাহায্য করবে।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকটির (এমওইউ) মেয়াদ চলতি ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে উল্লেখ করে মুনীর উভয় দেশের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি করার আহ্বান জানান।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension