সম্পাদকীয়

মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৮৬ শতাংশই অদক্ষ!

আমাদের অর্থনীতি সম্ভাবনাময়- শিল্প ও সেবা থেকে সব খাতেই সম্ভাবনা রয়েছে; রয়েছে সবুজ অর্থনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার হাতছানিও। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। পরিস্থিতি কত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তা জানার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, আমাদের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৮৬ শতাংশই অদক্ষ। জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ অন্তত ২৬টি খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। এত বেশি অদক্ষতা নিয়ে যে প্রতিযোগিতার বাজারে টেকা যাবে না, তা সহজেই অনুমেয়।

দেশের অর্থনীতির গতিকে ক্রমবর্ধমান রেখেছে যে কয়টি খাত, তার সব কটিকে জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে অদক্ষ শ্রমশক্তি। উদাহরণস্বরূপ, রেমিটেন্স পাঠায় যে শ্রমিকরা তারা অদক্ষতার কারণে অন্যান্য দেশের প্রতিযোগীদের তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম উপার্জন করে থাকে। যদি আমরা দক্ষ অভিবাসী কর্মী পাঠাতে পারতাম তবে রেমিটেন্স আয় আরও অনেক বেশি হতো, তাতে সন্দেহ নেই। গার্মেন্ট শিল্পের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে ম্যানেজমেন্ট ও উচ্চপর্যায়ে দেশের দক্ষ মানবসম্পদ নেই বললেই চলে। অধিক জনসংখ্যার কারণে নিচের দিকের শ্রমিকরা কম বেতনে চাকরি করছে; কিন্তু উচ্চপর্যায়ের পদে কাজ করে দেশের অর্থ বাইরে নিয়ে যাচ্ছে ভারত, শ্রীলংকা ও অন্যান্য দেশের প্রবাসীরা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উদ্যোগ নিতে হবে অবিলম্বে।

উদ্বেগের বিষয়, দেশে শিক্ষিত মানুষ বাড়লেও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে অদক্ষ শ্রমশক্তি। প্রথাগত শিক্ষায় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনসম্পদ তৈরি তো হচ্ছেই না, অফিসিয়াল চিঠি, ই-মেইল ও অফার লেটার আদান-প্রদানের মতো বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন শ্রমশক্তিও তৈরি হচ্ছে না। এ কারণে পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষিতরা যেমন চাকরি পাচ্ছেন না, তেমনি চাকরিদাতারাও দেশের যোগ্য লোক না পেয়ে বাধ্য হয়ে বিদেশিদের নিয়োগ দিচ্ছে বেশি বেতনে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। কারণ ব্যক্তির অদক্ষতায় রাষ্ট্রেরই ক্ষতি বেশি। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ২০১৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৮ সালেও তা না হওয়ার তথ্য থেকে।

আশার কথা, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সরকার ডিজিটালাইজেশনের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এটিই যথেষ্ট নয়, প্রতিটি সেক্টরের জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলার জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের বিকল্প নেই। অদক্ষ শ্রমশক্তির কারণে বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকার জিডিপি ক্ষয় হচ্ছে। বিআইডিএসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হালকা প্রকৌশল খাতে শ্রমিকদের ৭৫, নির্মাণ খাতের ৬৮, কৃষির ৬০, জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ৯৫, তৈরি পোশাক খাতের ৯২, আইসিটির ৪০, চামড়া শিল্পের ৮৬ এবং পর্যটন খাতের ৭২ শতাংশ পর্যন্ত শ্রমশক্তি অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ। এদের দক্ষ না করে মধ্যম আয় ও পর্যায়ক্রমে উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সরকারের উচিত অর্থনীতির তথা দেশের উন্নয়নের স্বার্থে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলার দিকে নজর দেয়া এবং বেসরকারি খাতকে এক্ষেত্রে উৎসাহিত করা। কারণ দক্ষ শ্রম ৫ শতাংশ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে ৪ শতাংশ। রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব খাতে এগিয়ে যাওয়ার সাহসী উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সময়।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension