প্রধান খবরবাংলাদেশ

শামীমের ওপর ৩ দফায় হয় ‘মব’, জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পরিবারের

সাতক্ষীরার দেবহাটায় দফায় দফায় মারধরের শিকার হয়ে মারা গেছেন ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। গত মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যু হলেও পরদিন বুধবার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এই মবে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে দাবি করেছে পরিবার। তবে স্থানীয় জামায়াত নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, ‘এলাকার সবাই ছিল’।
এদিকে এ ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আজকেই তারা থানায় অভিযোগ দায়ের করবেন।

তিন দফায় হামলা

‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে শামীমের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে মারধর করে। খবর পেয়ে পুলিশ সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

সেখানেও তাকে ‘তৌহিদী জনতা’ এসে মারধর করে।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টায় ‘উত্তেজিত জনতা’ বলেন আর তৌহিদী জনতা—যে নামেই হোক, তারা এসে আবার মারধর করে।
পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে সাতক্ষীরা মেডিক্যালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানান ওসি।

তবে পরিবারের দাবি, মোট তিনবার মারধর করা হয় শামীমকে।

প্রথমে এলাকাতে মারধর করা হয়। পরে শামীম বিষপান করলে তাকে এক ডাক্তারের চেম্বারে নেওয়া হয়। সেখানেও শামীমের ওপর চড়াও হয় কিছু লোক। পরে পুলিশ তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে তৃতীয় দফায় সেখানে শামীমের ওপর হামলা হয়।

পরিবারের দাবি পরিকল্পিত হত্যা

নিহতের পরিবারের দাবি, ‘পরিকল্পিতভাবে’ শামীমকে হত্যা করা হয়েছে। শামীমের ছোট ভাই তাওছিফ রহমান সাগর বলেন, ‘উসকানিমূলক একটা ভিডিও দিয়ে মানুষকে তার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে।’

শামীমকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে দাবি করেন সাগর। বলেন, ‘আইন যদি তাকে শাস্তি দিত তাহলে আমরা মেনে নিতাম। কিন্তু আমার ভাইকে এভাবে বিনা বিচারে পিটিয়ে মারবে কেন?’

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সোমবার প্রথম দফায় শামীমের বাড়িতে হামলা করা হয় বলে জানান সাগর। এ সময় স্থানীয় জামায়াতের একদল নেতাকর্মী লোকজন জড়ো করে মব সৃষ্টি করে বলে দাবি করেন তিনি।

স্থানীয় জামায়াত নেতা কামরুল ইসলাম গাজী সেই দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘ডাক্তারের চেম্বারের পাশে সাধারণ মানুষ তারে মারধর করে। এই পর্যন্ত জানি আমরা।’ জামায়াতের কেউ ছিল কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘না…এলাকার সবাই ছিল।’

যেভাবে সূত্রপাত ও জামায়াত নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

তাওছিফ রহমান সাগর জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছিলেন শামীম। বেশ কয়েক বছর আগে বাসে যাতায়াতের সময় ‘অজ্ঞান পার্টির’ লোকজন তাকে কিছু একটা খাইয়ে দিলে পরিবারের সদস্যরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে।

চিকিৎসা নেওয়ার পর শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মাঝেমধ্যে ‘মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত’ আচরণ করতেন শামীম। এ কারণে তার প্রথম সংসার ভেঙে যায় বলেও জানান সাগর। সেই ঘরে তার আট বছরের একটি ছেলে আছে। পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন শামীম। সেই সংসারে সাগরের সাত মাসের আরেকটি ছেলে রয়েছে।

মবের ঘটনার সূত্রপাত হয় সোমবার। পরিবার বলছে, সেদিন স্ত্রীর সঙ্গে শামীমের পারিবারিক কলহ হয়। এ সময় পাড়া-প্রতিবেশীদের কেউ কেউ শামীমকে উসকে দেয় এবং শামীমের বলা কথা রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেয় বলে দাবি করেন সাগর।

অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়লে দলবদ্ধ লোকজন তাদের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালায়। সেই ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতের একদল নেতাকর্মীরও সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে দাবি করেন সাগর। বলেন, ‘বাসায় যেদিন প্রথম হামলা হয়, সেদিন যারা আসছিল তারা সবাই জামায়াতে ইসলামের সমর্থক এবং কর্মী। মাঠ পর্যায়ের যারা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ—সভাপতি, সেক্রেটারি, এককথায় ওনাদের কমিটিতে যারা আছে।’

তিনি বলেন, ‘এরা যখন প্রথম হামলা করে, আমাদের বাজারে জামায়াতের যে অফিস আছে, ওখানে সংগঠিত হয়ে ওখান থেকে এসেই প্রথম হামলা করা হয়।’

তবে এই দাবি অস্বীকার করেছেন দুই নম্বর পারুলিয়া ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল ইসলাম গাজী। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, শামীমের বাড়িতে বউ নিয়ে ‘গ্যাঞ্জাম’ হয়।

তিনি বলেন, ‘ও রাসুল এবং আল্লাহর নামে কটূক্তি করে। এটা মোটামুটি আমাদের মাঠঘাটে ভাইরাল হয়ে যায়।’ পরে শামীম বিষ খেলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তাকে মারধর করার কথা শুনেছেন বলে মন্তব্য করেন কামরুল ইসলাম গাজী।

মামলা হয়নি এখনো

এ ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আজকেই তারা থানায় অভিযোগ দায়ের করবেন।

মঙ্গলবার নিজ ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ করেন মো. ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয়ভাবে নিজেকে মুফতি পরিচয় দেওয়া ওই লোক দুপুর সাড়ে ৩টা থেকে একের পর এক উসকানিমূলক ভিডিও প্রকাশ করেন।

সেসব ভিডিওতে কখনো তাকে জনসাধারণকে ডাক দিতে শোনা যায় তো কখনো একদল মানুষকে নিয়ে মিছিল করতে দেখা যায়। এমনকি বুধবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মৃত শামীমের ছবি প্রকাশ করে উল্লাসও প্রকাশ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সকালে ইমোতে ছড়িয়ে পড়া অডিওটি ফেসবুক উপযোগী করে ছাড়ার জন্য সাহায্য চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন আমিনী এবং দুপুরের দিকে সেই অডিও ফেসবুকে দেন। কিন্তু এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম শাহীন বলেন, ‘আমাদের এগুলো নজরে এসেছে। আমরা আমাদের কার্যক্রম করছি। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension