
শিক্ষক থেকে প্রধানমন্ত্রী
আরব দুনিয়ায় চমক! তিউনিশিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নাজলা বাউদেন রমধান। তার মাধ্যমে আরব রাজনীতিতে নারীর-ক্ষমতায়নের যাত্রা শুরু হলো। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট কাইস সইদ সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, তিনি ও রমধান একযোগে দেশের উন্নয়নে কাজ করবেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘তিউনিশিয়ার ইতিহাসে এই প্রথম মন্ত্রিসভার নেতৃত্বে রয়েছেন কোনো নারী। তিউনিশিয়া ও দেশের মেয়েদের জন্য এটা একটা গর্বের বিষয়।
এ নিয়ে অবশ্য দ্বিমত নেই কারও। নাজলা বাউদেন রমধান রাজনৈতিক মহলে পরিচিত নন, তিনি অর্থনৈতিক আর্কাইভ থেকে অনেক দূরে, তিনি কখনো পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্গত ছিলেন না। তিনি মানবাধিকার এবং সুশীল সমাজের কাছেও পরিচিত মুখ নন। এক কথায় ৬৩ বছর বয়সী নাজলা বাউদেন রমধান রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর ভূতত্ত্ববিদের অধ্যাপিকা। পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণা মন্ত্রকে পরিচালক জেনারেল পদে নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বহু প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। এ গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলালেও সরাসরি কোনো মন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন না তিনি। তা ছাড়া রাজনীতিতেও তার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সেদিক থেকে নাজলা বাউদেন রমধানের দায়িত্ব ঐতিহাসিক। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, কেন তাকে শিক্ষাজগৎ থেকে রাজনীতিতে যুক্ত করা হলো! আদৌ কি তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাতে পারবেন! তা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। দেশের একাংশের মানুষ প্রেসিডেন্টের এ কাজকে স্বাগত জানালেও অনেকেই বলছেন, নাজলা বাউদেন রমধান আসলে হবেন পুতুল প্রধানমন্ত্রী। বকলমে চূড়ান্ত ক্ষমতা ভোগ করবেন প্রেসিডেন্ট। সে কারণেই তিনি নাজলা বাউদেন রমধানকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন।
মাত্র দুই মাস আগে ক্ষমতায় এসেছেন নতুন প্রেসিডেন্ট। এসেই পুরোনো প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। ভেঙে দিয়েছেন মন্ত্রিসভাও। নাজলা বাউদেন রমধানকে প্রধানমন্ত্রী করে দ্রুত নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নাজলা বাউদেন রমধানের কথা ঘোষণা করে প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এ এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই প্রথম কোনো নারী এ পদে এলেন। তার মধ্য দিয়েই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো।’
নতুন পদ পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই খুশি নাজলা বাউদেন রমধান। প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট বলেছেন, দু’জনে মিলে নতুন করে তিউনিশিয়াকে গড়ে তুলবেন তারা।
আরব বিশ্বে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী পেয়ে অনেকেই উচ্ছ্বসিত। কিন্তু একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেকের।
নাজলা বাউদেন রমধানের জন্ম ১৯৫৮ সালের ২৯ জুন কাইরুনে। চলতি বছরের ১১ অক্টোবর তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে ২০১১ সালে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ভূ-বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ। তিনি পিএইচডি করেছেন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ভূ-বিজ্ঞানের অংশ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সংস্কার এবং আধুনিকীকরণে কাজ করেছেন।
এন্নাহদা আন্দোলনের নেতা, সাবেক মন্ত্রী এবং মুখপাত্র সামির দিলো বলেন, একজন নারীকে সরকারপ্রধান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া সত্যিই কটি প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত, কিন্তু অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। ২২ সেপ্টেম্বর জারি করা রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ, অর্থনৈতিক, সামাজিক, আর্থিক এবং স্বাস্থ্য স্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নাজলা বাউদেনের মনোনয়ন অবৈধ কারণ এটি রাষ্ট্রপতির ডিক্রির মাধ্যমে করা হয়েছিল।
তিউনিশিয়ার বিশ্লেষক সালাহ আদ-দীন আল-জুরশি পরামর্শ দেন, সাইয়েদের বিশ্বাস নাজলা বাউদেন রমধান তার প্রতি অনুগত থাকবে, তার সিদ্ধান্তকে উৎসাহিত করার কারণ ছিল বলে তিনি দাবি করেন। রাজনৈতিক দলগুলো থেকে তার দূরত্ব ছিল, বিশেষ করে তিউনিশিয়ার প্রধান বিরোধী দল।
তিউনিশিয়ার নার্স আমিনা বেন হামু বলেন, একজন নারী প্রধানমন্ত্রী পাওয়ায় আমরা আশাবাদী, আসুন আমরা চেষ্টা করি। আমার মতামত অনুসারে, একজন নারী তিউনিশিয়াকে সফল করবে, কারণ নারীরা সংগ্রামী এবং ধৈর্যশীল। আরব দেশে কমসংখ্যক নারী জ্যৈষ্ঠ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু সায়েদের কর্মকাণ্ডে দেখা যায়, করোনাভাইরাস মহামারি এবং রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বছরের পর বছর অর্থনৈতিক স্থবিরতা বেড়েছে। জনসাধারণ আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। এখানে প্রশ্ন থেকেই যায়, একটি জাতিকে শাসন করার জন্য নাজলা বাউদেন রমধানকে তিনি পুরোপুরি দায়িত্ব দেবেন কিনা? আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত রাখার পর নতুন সরকারের বাজেট এবং ঋণ পরিশোধের জন্য জরুরিভাবে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। নাজলা বাউদেন রমধানের নিয়োগে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হবেন কিনা। এ প্রসঙ্গে শিক্ষক মওনা বেন সাদ বলেন, আমরা এ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমি কল্পনা করি যে কেবল তিউনিশিয়ায় নয়, স্বাধীন বিশ্বের যে কোনো নারী এ মুহূর্তের অপেক্ষা করছেন, তিনি একজন নারী হয়েও প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হয়েছেন। আমি আশা করি, তিনি ভালো কাজ করবেন। তিনি একটি কার্যকরী কর্মসূচি নেবেন।



