
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে উঠেছে কোচিং সেন্টার
শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ধরন ও শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে গত বছর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের কয়েকটি দেশে গবেষণা চালায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। পরীক্ষায় প্রস্তুতি নিতে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে শ্রেণীকক্ষের বাইরে প্রাইভেট টিউশন গ্রহণ করতে হয় বলে উঠে আসে গবেষণায়। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে প্রাইভেট টিউশন গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থীই প্রাইভেট টিউশন গ্রহণ করে; যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই হার ৫০ শতাংশ। প্রাইভেট টিউশন গ্রহণের হার সবচেয়ে কম ফিজিতে। দেশটিতে মাত্র ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বাইরে প্রাইভেট টিউশন গ্রহণ করে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাইভেট টিউশন গ্রহণের হার কাজাখস্তান ও ভিয়েতনামে ৭০ শতাংশ, রিপাবলিক অব কোরিয়ায় ৬৮ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ৩৫ শতাংশ। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাইভেট টিউশনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে কোচিং সেন্টারের সংখ্যা খুবই দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এক্ষেত্রে শহর ও গ্রামে সবখানেই সমান প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্তানের ভালো ফললাভে পিতা-মাতার উচ্চ প্রত্যাশাকেই এর অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরীক্ষায় ভালো করাই মূল উদ্দেশ্য। পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে পিতা-মাতারা সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠাচ্ছেন। এছাড়া বাংলাদেশের জরিপে অংশ নেয়া ৬২ শতাংশের মধ্যে ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই পরীক্ষা সংখ্যাকে অনেক বেশি বলে মত দিয়েছেন। দেশের ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণীকক্ষের ভেতরে সপ্তাহে সাত ঘণ্টার বেশি সময় পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ব্যয় করে, যা এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। আর ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য শ্রেণীকক্ষের বাইরে সপ্তাহে সাত ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করে। বাংলাদেশের ৮২ শতাংশ পিতা-মাতাই ভালো ফল অর্জন উদযাপন করেন।
বছর দুয়েক আগে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারসারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যে অসামঞ্জস্যতা, তাতে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের ৮২ শতাংশ কর্মে নিয়োজিত থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ৬ দশমিক ৩ শতাংশ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন। বাকিদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ আধা বা মাঝারি দক্ষ ও ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ অদক্ষ। আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করতে হবে, সেখানে শুধু একাডেমিকের ভালো ফল বোঝায় না। আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি নিশ্চিত করলেও জ্ঞানের গভীরতা তৈরিতে খুব একটা সামর্থ্য দেখাতে পারে না। তাদের পড়াশোনার চর্চা, অনুশীলন মার্ক স্কিমনির্ভর, যাতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকে প্রশ্নের কোনো অংশের উত্তর কেমন হলে কত নম্বর পাবে একজন পরীক্ষার্থী। মার্কস্কিম চর্চা করে আশানুরূপ ফল পাওয়া সহজ। বিদ্যালয়ের বাইরে বাকি সময়টুকু মার্কস্কিম চর্চা করতেই ব্যয় হয়। পাঠ্যবইয়ের বা সিলেবাসের বাইরে তাদের ইচ্ছে থাকলেও অন্যকিছু পড়ার সুয়োগ তাদের নেই; ফলে প্রকৃত সৃজনশীলতার চর্চার জায়গাটি আমরা সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। সবশেষে মনে রাখতে হবে, শ্রেণীকক্ষে আমরা যদি সুশিক্ষক না দিতে পারি; তাহলে শিক্ষা সংক্রান্ত অন্যান্য আয়োজন বৃথা যাওয়ার শামিল।
