প্রধান খবরবইমেলা

শেষ প্রস্তুতিতে প্রাণের মেলা একুশে বইমেলা

দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার পালা শেষে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হতে যাচ্ছে মাসব্যাপী বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯’। বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা একাডেমির আয়োজনে  এই প্রাণের মেলায় প্রাণ নিয়ে আসতেই এখন চলছে তুমুল ব্যস্ততা। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত বাংলা একাডেমি ও তার সম্মুখের ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এখন বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বিরামহীনভাবে সাজিয়ে তুলছেন নিজেদের প্যাভিলিয়ন আর বিভিন্ন ইউনিটের স্টল। ৩০ জানুয়ারির মধ্যে স্টল নির্মাণের কাজ শেষ করার বিষয়ে মেলার আয়োজক কতৃপক্ষের নীতিগত সিদ্ধান্তের কারনে স্টল ও প্যাভিলিয়ন নির্মাণশ্রমিকদের করাতের খরখর আর হাতুড়ি বাটালের ঠুকঠাক-টুংটাং শব্দে মুখরিত মেলার দুই প্রাঙ্গণ। সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্টল ও প্যাভিলিয়নে রঙ লাগানোর কাজ শুরু হওয়াতে মেলার দুই প্রাঙ্গণেই যোগ হয়েছে বাতাসে কাঁচা রঙের গন্ধ। আর মাত্র দুইদিন পরেই যেখানের আকাশে-বাতাসে ভাসবে নতুন বইয়ের সুবাস, লেখক-পাঠকদের উচ্ছ্বসিত বিচরণ।
 
‘বিজয় ১৯৫২ থেকে একাত্তর : নবপর্যায়’ এই প্রতিপাদ্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে বিস্তৃত হবে লেখক-পাঠক আর প্রকাশকদের একসূত্রে গাঁথার এই গ্রন্থমেলা। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকালে গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গেল বছরের মতো এবারও মেলা বিকেল ৩টায় শুরু হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে। রাত সাড়ে ৮টার পর কেউ মেলায় প্রবেশ করতে পারবে না।
 
’৫২-র ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের পথ ধরেই একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় এবং বাঙালির হাজার বছরের কাঙ্খিত ‘স্বাধীনতা’ অর্জন। তারপর বাঙালির জীবনে এসেছে আরও অনেক বিজয়। আর মাত্র দুই বছর পরেই স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর এবং এক বছর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী-জাতির জীবনে এই গুরুত্বপূর্ণ দুটি সময়ের এক বছর আগে কীভাবে আমাদের বিজয়গাথার অন্বেষণ হবে, সেটিকে মাথায় রেখেই ‘বিজয়’ থিমে সাজানো হচ্ছে এবারের গ্রন্থমেলা। যে কারণে এবারের মেলার সবেচেয়ে বড় বিষয় নকশার নান্দনিকতা। নকশার নান্দনিকতা ও বিজয় থিমের পাশাপাশি এবারের এই মেলায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহারে।
 
মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, ‘বিজয়’ থিমে অমর একুশে গ্রন্থমেলা সাজানোর জন্য সব প্রস্তুতি প্রায় শেষের পথে। যার নকশা করেছেন স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর। যে নকশায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভের গ্লাস টাওয়ারের আলোয় আলোকিত করার পরিকল্পনা রয়েছে এবারের মেলাকে। এজন্য স্বাধীনতা স্তম্ভের পাশ ঘেঁষে থাকা টিনের প্রাচীরটি এবার খুলে দেওয়া হচ্ছে। মেলায় আগত দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের একটু বিশ্রামের জন্য বসার স্থান, মানসম্মত টয়লেট, সহনশীল দামে খাবার নিয়ে অভিযোগ তোলেন অনেকে পাঠকই। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেও কাজ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে একাডেমি সূত্র।
 
অন্যান্য বছর মেলা শুরুর পরও অনেক প্রকাশক স্টল নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারেন না। নির্মাণ কাজের ঠুক্ঠাক্ শব্দে মেলার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার কারণে এবারের মেলায় ৩০ জানুয়ারির পর কোনও স্টলের কাজ করতে দেওয়া হবেনা বলে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ৩০ জানুয়ারির মধ্যে কারও স্টল নির্মাণ না হলে সেই স্টল বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
 
অন্যদিকে, এবারের মেলায় প্রথমবারের যুক্ত হচ্ছে ‘লেখক বলছি’ শিরোনামের নতুন একটি মঞ্চ। যে মঞ্চে প্রতিদিন মেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে পাঁচটি মানসম্মত বইয়ের লেখকরা তাদের বই নিয়ে কথা বলবেন। সেজন্য লেখককে একদিন আগে তার সদ্য প্রকাশিত বই জমা দিতে হবে। সেখান থেকে বাছাইয়ের মাধ্যমে লেখক ও বই নির্বাচন করা হবে। এছাড়াও মেলায় থাকবে-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনের লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য গ্রন্থমেলায় আলোচনা, সেমিনারসহ নানা আয়োজন। এছাড়াও পুরো গ্রন্থমেলাকে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের (জিপিএস) আওতায় আনা হবে।
 
অন্যদিকে, পাঁচ ভাষাশহীদের নামে পাঁচটি চত্বরে বিভক্ত করা হয়েছে এবারের মেলা প্রাঙ্গণ। পৃথক পাঁচটি চত্বর থাকবে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউরের নামে। পাঁচ ভাষাশহীদের প্রতিটি চত্বরের সাজসজ্জায় থাকবে পৃথক রঙের ব্যবহার। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ ও ম্যাজেন্টা রঙের প্রাধান্যে সাজবে স্টল ও চত্বরগুলো। এর মধ্যে মেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনটি উৎসর্গ করা হয়েছে শহীদ বরকতের নামে।
 
এবারের মেলায় বাংলা একাডেমিসহ ২৪টি প্রকাশনা সংস্থাকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে দুই ক্যাটাগরিতে প্যাভিলিয়ন থাকছে ২৩টি। এর মধ্যে ২৪ বাই ২৪ ফুটের প্যাভিলিয়ন থাকছে ১০টি আর ২০ বাই ২০ ফুটের প্যাভিলিয়ন থাকছে ১৩টি। মেলায় যেসব প্রতিষ্ঠানের প্যাভিলিয়ন থাকছে সেগুলো হল-আগামী প্রকাশনী, অবসর, প্রথমা, অন্যপ্রকাশ, সময়, মাওলা ব্রাদার্স, অনুপম, ঐতিহ্য, তাম্রলিপি, শোভা প্রকাশ, কথাপ্রকাশ, অনন্যা, অন্বেষা, পাঠক সমাবেশ, কাকলী প্রকাশনী, বাংলা প্রকাশ, উৎস প্রকাশন, অনিন্দ্য প্রকাশ, নালন্দা, জার্নিম্যান বুকস, পার্ল পাবলিকেশন্স, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ এবং পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স।
 
এছাড়া এবারের মেলায় চার ইউনিটের স্টল থাকবে ১৯টি, ৩ ইউনিটের স্টল থাকবে ৩৫টি, দুই ইউনিটের ১০৯টি এবং এক ইউনিটের স্টল থাকবে ১৫৬টি। আর শিশু কর্নারে শিশুবিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জন্য রাখা হয়েছে ৭৫টি বিভিন্ন ইউনিটের স্টল এবং বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে থাকবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের শতাধিক স্টল ও লিটল ম্যাগ চত্বর। সব মিলিয়ে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মোট ইউনিট থাকছে ৬৯০টি। আর অংশ নিচ্ছে ৪৫০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে মেলায় অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছে ১৯টি নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension