
টাইমসের সম্পাদকীয়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার সহিংসতায় শুধুই ট্রাম্প দায়ী
বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মাধ্যমে উৎসাহিত হয়ে ওয়াশিংটন ডিসি’র মার্কিন আইনসভায় হাজার হাজার লোক বিদ্রোহ ও হামলা চালায়।
তারা সকল বাধা ভেঙে জোর করে কংগ্রেসের হলগুলোতে ঢুকে পড়ে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও উপস্থিত কংগ্রেস সদস্যরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এ ঘটনা জো বাইডেনকে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
এটাকে কোন পর্যায়ের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে?
কথিত আছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি আত্মঘাতী হয় তবে বাইরের শত্রু থেকে নয় বরং অভ্যন্তরীণ আক্রমণ থেকেই হবে। আর প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র এখন দেশটির আইনসভাতে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতেই নির্যাতনের শিকার। কেননা তিনি দেশের ভোটারের, রাষ্ট্রের এবং আদালতের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দেখানো এই অবিশ্বাসের এই প্রদর্শন ওসামা বিন লাদেনের চেয়েও অনেক বেশী কিংবা ভ্লাদিমির পুতিন এতে আশাবাদী হতে পারেন। এদের লক্ষ্যই ছিল এটা: রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনাকে অস্থিতিশীল এবং অবৈধ করে তোলা।
এর আগে, ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের বাইরে তার সমর্থকদের একটি সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় ভিত্তিতে তাকে প্রতারণা করা হয়েছে বলে যে ভিত্তিহীন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেছিলেন।
দিন কয়েক আগে, ট্রাম্প নিজ সমর্থকদের এক সমাবেশে উপস্থিত হয়ে নির্বাচনে প্রতারণার ভিত্তিহীন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেন। উপস্থিতদেরকে আইনসভার উদ্দেশ্যে পদযাত্রার আহ্বান জানিয়ে তিনি তাদের সাথে যোগ দেবেন বলেছিলেন। (তিনি তা করেন নি)।
পরের দৃশ্যগুলো ছিল পরাবাস্তব। ট্রাম্প সমর্থকরা পতাকা উড়িয়ে, স্লোগান আর অভিশাপ দিতে দিতে প্রতিরক্ষার সুরক্ষিত বাধা অতিক্রম করে এবং পুলিশদের ডিঙিয়ে, কয়েকজনকে আহত করে আইনসভার বারান্দায় চড়ে বসে, তখন অন্য ট্রাম্প সমর্থকরা স্ট্যাচুয়ারি হল(ভাস্কর্য ভবন) এবং রোটুন্ডা (ছাদে) পৌঁছে যায়। গুলি ছোঁড়ার খবর এবং পুলিশের সাহায্যে সদস্যদের গ্যাস মুখোশ দেওয়ার খবর পেয়ে অনেকেই তালাবন্ধ কাঁচের দরজা ভেঙে আইনসভা কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। পরবর্তীতে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে, দাঙ্গা ছত্রভঙ্গ করে ভবনটি লকডাউন করা হয়।
আইনসভার অভ্যন্তরে কমপক্ষে একজন গুলিবিদ্ধ হয়, পরে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও এই ঘটনাটি কীভাবে প্রকাশ পেল তা সুস্পষ্ট নয়।
লুটেরাদের দল অফিসে ঢুকে পড়লে কংগ্রেস সদস্যদের নিজ নিজ ডেস্কের নীচে আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়। ট্রাম্প অবশেষে তার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে একটা ফাঁকা তিরস্কার টুইট করেছিলেন: ‘দয়া করে আমাদের ক্যাপিটল পুলিশ এবং আইন প্রয়োগকারীদের সমর্থন করুন। তারা সত্যিকারভাবেই দেশের পক্ষে আছে। শান্ত হোন!’ আধা ঘন্টা পরে তিনি আবারও টুইট করেন : ‘আমি প্রত্যেককে শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে অনুরোধ করছি। কোন হিংস্রতা নয়! মনে রাখবেন, আমরাই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইন এবং আমাদের নীল পোশাকের নারী-পুরুষদের সম্মান করুন। ধন্যবাদ!’
আইনসভায় সহিংসতার বিষয়ে কিচ্ছু নেই। কংগ্রেসকে পালাতে বাধ্য করার বিষয়ে কিচ্ছু নেই। নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের বিপক্ষে তিনি নিজে যাদের সাথে নিয়ে ওয়াশিংটনে নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন সেই বাহিনীর প্রতি পিছু হটার কোনও দাবীও নেই।
(জাতীয় প্রতিরক্ষাবাহিনীকে ডাকার পরে এবং বাইডেন এই হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়ার পর, ট্রাম্প অবশেষে নির্বাচন সম্পর্কে তার মিথ্যা বক্তব্যসহ একটি ভিডিও আবারও পোস্ট করেন এবং তার সমর্থকদের ‘বাড়ি ফিরতে, এবং শান্তিপূর্ণভাবে বাড়ি ফিরতে’ অনুরোধ করেন।)
ট্রাম্পের নিয়ম ভাঙার বিষয়ে একজন রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রপতি হিসাবে অনেক কিছুই বলা হয়েছে। তবে বর্তমানের তৈরি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সবকিছুর মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, কিংবা ‘জল অনেকদূর গড়িয়েছে।’ আমেরিকার নির্বাচিত ও বরতমান একজন রাষ্ট্রপতি আমেরিকান ভোটারদের ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করতে, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে আমেরিকার আইনসভায় সহিংসতা তৈরি করেছেন।
এই হিংসাত্মক ঘটনা কেবলমাত্র ট্রাম্পের একার তৈরি নয়।টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ, মিসৌরির সিনেটর জোশুয়া ডেভিড হাওলি এবং অন্যান্য যারা ভোট জালিয়াতির বিষয়ে ট্রাম্পের মিথ্যা বিবৃতিতে ঐক্যমত পোষণ করেছেন, তাদের সবার তৈরি। একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর স্বয়ং গণতন্ত্রের আক্রমণ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ করা মানে গণতন্ত্রকেই আক্রমণ করা এবং পুরো জাতি বুধবার ওয়াশিংটনে গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ স্থিতিশীল শক্তির অস্থিতিশীল প্রয়োগের তার সাক্ষী হয়ে থাকল।
আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আমেরিকানদের দ্বারা আপোষহীন হামলার এই দিনের দায়িত্ব ট্রাম্পের।
আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার কেন্দ্রেবিন্দুতে আমেরিকানদের নিজেদেরকে দিয়েই বিবেকহীন এই হামলার দায় একমাত্র ট্রাম্পের। আর যারা এ হামলাকে সফল করতে তাকে সাহায্য করেছে তাদেরকে অনেক প্রশ্নেরই উত্তর দিতে হবে, তেমনি তাদেরকে অনেক অনুতাপও করতে হবে।❐
লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস থেকে অনুবাদ: জাহান আরা দোলন



