
সৃষ্টি মানেই ত বিলীন হওয়া!
মাহমুদ রেজা চৌধুরী
আসা, মানেই যাওয়া। বাকিটা কেবলমাত্র সময়ের ব্যবধান। মাঝে সময়টা মায়া, কুহেলিকা, স্বপ্ন, নানান আশা নিয়ে বেঁচে থাকা। খুব দীর্ঘ সময়েরও না কিন্তু। কখনো কখনো তা দীর্ঘ সময় হলেও চলে গেলেই মনে হয়, এইত সেদিনের কথা। যে বয়সেই মানুষ যাই না কেন। একমাত্র প্রাণী মানুষ অপূর্ণতা নিয়েই যাই। চলে যাবার পর আর কি কোনও অপূর্ণতা থাকে! কে জানে!
তাই যেতে হয়, যেতে দিতেও হয়। যতই বলি না কেন, যেতে না দিব। তবুও চলে যাই, ‘আলবিদা’ বলি। চলে যায়। কারণ, দুয়ারে যে প্রস্তুত গাড়ি। কোনও আকুতি, কোনও প্রার্থনা, কোনও বুক ভাঙা কাঁদা সেই যাওয়াকে রোধ করতে পারে না। যারা আমরা যাওয়ার অপেক্ষায় থাকি, আগে চলে যাওয়া মানুষটার প্রতি আমাদের একেকজনের একেক বুক ভাঙা অনুভূতি জাগে ও থাকে। এই অনুভূতির আর্তনাদ অন্যরাও বোঝেন কিন্তু সরাসরি ভুক্তভোগীর মতো বোঝেন না, বোঝার কথাও না।
চলে যাওয়াই সুন্দর আর এটাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। আমাদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ। অনেক দার্শনিক বলেন, কর্মের পরিপূর্ণতার জন্য উৎকৃষ্ট জ্ঞান না হলে হয় না। তাই প্রজ্ঞার আদর্শের প্রয়োজনে কর্মক্ষেত্রে মানুষ সবসময় জ্ঞানকে অতিক্রম করে যেতে চায়; যা প্রজ্ঞার স্বকীয় স্বভাবের প্রকাশ। কর্মক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞান ব্যক্তির অভিজ্ঞতা। একইভাবে সুন্দরের অভিজ্ঞতাও ব্যক্তির অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতা কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে বিশেষের অভিজ্ঞতা।
এই কর্মজগত ও বস্তজগতে জীবনযাপন, সুখ-দুঃখ, ব্যাথা, আকুলতা, বেকুলতা। বুক ভাঙা নিঃশব্দ অনুভূতিও থাকে অনেকের। এর সৌন্দর্যের রূপটাকে বুঝতে আমাদের প্রজ্ঞার কোনও বিকল্প নাই। আমাদের যার মধ্যে যেটুকু প্রজ্ঞা তার মধ্যে সেইটুকু সুন্দর বাস করে। নিজের ব্যক্তিগত কষ্টে বা কান্নায় ভেঙে পড়লে যদি মনে করতে পারি, এই কষ্ট এবং কান্না পৃথিবীতে শুধু আমার জন্য না। কোটি কোটি মানুষ সবার জীবনে এই কান্না এবং কষ্ট কোনও না কোনও একবার আসে, আছে, থাকে ও থাকবে।
আমি কেন ভাববো সেটা যত বড়ই কষ্ট হোক না কেন, এটা কেবলই আমার। এটা বিধাতা আমাকেই দিয়েছেন। না, তা ঠিক না। এই কষ্ট বিশেষ করে সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টি মানুষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। কোনও না কোনও সংকট বা কষ্টে আছে সব মানুষ। কেবলমাত্র কিছু মানুষ বাদে। যারা বিপদে ধৈর্য ধারণ করেন, মানুষকে সহজ সরল পথের সন্ধান দেন। মানুষের ইতিহাসও প্রথম থেকে যদি লক্ষ্য করি, দেখি, পৃথিবীতে অনাবিল সুখ বা শান্তি। ‘কখনোই’ এটা ছিল না।
পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম থেকে আজ পর্যন্ত যত মানুষ সৃষ্টি হয়েছে, তাদের সবার জীবনের কোনও না কোনও এক সময় ছিল সংগ্রাম, যুদ্ধ হানাহানি, মারামারি, দুঃখ-কষ্ট আর কান্নায় ভরা। কেউ কিছু পেয়ে কষ্ট পাই, কেউ না পেয়ে। কেউ আবার পেয়েও হারাই। এটা প্রকৃতির বিধানে বা নিয়ম। এই নিয়মের দিকে যদি একবার দৃষ্টি দিই দেখি, সেখানে কত অসহায় মানুষের অজস্র চোখের পানি, বুকের আহাজারি। পাগলের মতো কান্না। সন্তানহারা মায়ের বুক। মা হারা সন্তানের অসংখ্য, অসংখ্য বাস্তবতা আছে। এইসব অসহায়ত্বের কোনও সীমা নাই। সীমার মাঝে অসীম তিনি একাই এই খেলা সৃষ্টি করেছেন। খেলছেন আপন মনে একাই এই পৃথিবীকে নিয়ে উদাস মনে।
আমরা খুব সাধারণ মানুষ, তাই ফিরে ফিরে চাই পেছনের দিকে, যা আমাদেরকে ছেড়ে যায়, তার স্মৃতির দিকেই বারবার মন তাকায়। কিন্তু কোনও কিছুতেই আর তাকে ফিরে পাই না। তাই শিল্পী গান, ‘বড় দেখতে ইচ্ছে করে, তুমি কি আগের মতোই আছো না-কি’ … ! একবার যে আমাদের কাছ থেকে যান, তাকে আর দেখি না। কেবল স্মৃতিতে দেখি, মনে দেখি। কান্নায় দেখি। হতাশায় দেখি। কখনো, কখনো কোনও আনন্দেও দেখি। কিন্তু সেই সব দেখা শুধুই হৃদয়ের দেখা। চোখের আলোতে না। চোখের আলোর বাইরে,অন্তর দৃষ্টিতে।
গভীর দুঃখে আমাদের কারোর মগ্ন আকাশ, যতদূর সেই আকাশ, সেখানে কেবল একটাই মর্মান্তিক সুর বাজে, আর হবে কি দেখা! এই কষ্টটা আমাদের কারোরই একার না। অনেকের, অনেকের, আরো অনেকের। এই কষ্টের সুন্দর অনুভূতিকে সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রজ্ঞায় অনুধাবন করবার শক্তি দিন। যেন অনুভব করতে পারি, যে কোনও সৃষ্টি মানেই তো বিলীন। আমিও তো বিলীন হব।
তারপর যেখানেই যাব, সেখানের জন্য আমি কতটা প্রস্তুত! আদৌ কি কোনও প্রস্তুতি আছে আমার সেই ঠিকানায় আনন্দে থাকবার জন্য। অন্তত যারা বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীর কোনও ঠিকানাই চিরস্থায়ী না। আমাদের আরেকটা ঠিকানা আছে। সেটাই আমাদের স্থায়ী। সেই নতুন ঠিকানায় যাবার জন্য আমাদের আসবাবপত্র কি কি আছে! আমাদের নিজেদের ভালো কাজ, অন্যের ক্ষতি না করা। চুরি, ডাকাতি, ভয়, ব্যভিচার, অত্যাচার খুন না করা। কারো মনে কষ্ট না দেওয়া। বাবা মাকে বুকে জড়িয়ে রাখা। সহজ, সরল পথ ধরে চলা, যে পথে পৃথিবীর মহাজ্ঞানী মহাজন, সৎ মানুষরা চলেছেন। আমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানায় যে ঘড় হবে তার আসবাবপত্র হবে এইসব। সঙ্গে রাখতে পারি যেন।
এইসবের মধ্যে আরেকটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসবাবপত্র আছে যা থাকাও উচিত নিজেদের সাথে। মুসলিম হলে এবং সেই বিশ্বাস বা ঈমান দৃঢ় থাকলে। এই জ্ঞানে জাগতিক ও অজাগতিক প্রজ্ঞা থাকলে। এই বিশ্বাসের মৌলিক শর্ত পালন করে চলা যতটুকু সম্ভব। এই প্রজ্ঞা টুকু জ্ঞানের সৌন্দর্য অনুশীলনে সহায়ক হয়। সৌন্দর্যের আরো কয়েকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দার্শনিক কান্টের নন্দনতত্ত্বের চিন্তায় তা যেমন:
১. রুচির অতীন্দ্রিয় গুণ।
২. নিরপেক্ষ এবং নির্ভরশীল সৌন্দর্য জ্ঞান।
৩. আদর্শিক চিন্তার গভীরতা।
৪. প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহ।
৫. রুচি ও প্রতিভার মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়।
কথাগুলো এই কারণেই বলা যে এর সাথে যুক্ত আমাদের (এক সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী যারা) শেষ ও চূড়ান্ত ঠিকানায় ছায়া সুনিবিড় নীড় খুঁজে পাওয়া। ভেঙে পড়লে বা হতাশ হলে জীবন চলে না। জীবনকে জীবনের মতো চলে যেতে হয় ও হবে। কিন্তু সেই যাওয়াটা যেন আমরা কিছুটা মসৃণ করে দিতে পারি অন্যের জন্য এবং নিজের জন্য। আমাদের প্রজ্ঞা আমাদের এটা বুঝতে সহজ করে দিক যে, সৃষ্টি মানেই বিলীন হয়ে যাওয়া। বিলীন কিছুই হতো না তা সৃষ্টি না হলে। তাই সৃষ্টির আনন্দ সৃষ্টির সৌন্দর্য, তা বিলীনের মধ্যেও খুঁজে পেতে পারি। সর্বশক্তিমান এক আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা তিনি আমাদের সহায় হন এই সত্যকে অনুধাবন করার সফলতায়।
পুনশ্চ: পার্থিব জগতেও স্থায়ী ঠিকানা খুঁজি। সামর্থ্য থাকলে ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজের একটা ছোট্ট কুটিরেও থাকতে চাই। কারণ, বারবার ঠিকানা বদলানো, কঠিন কাজ। মৃত্যুর পর আমরা আমাদের সেই চিরস্থায়ী ঠিকানায় চলে যাই।
সেখানে আর কোনও মৃত্যু নাই, অন্তহীন অনন্ত জীবন। এর বিলীন নাই। আত্ম জিজ্ঞাসা, কোনওটা চাই!



