বিজয়ের মাসেমুক্তিযুদ্ধ

১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, বিজয়ের পথে

জাহান আরা দোলন: আজ ১৩ ডিসেম্বর। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালে এদিন বাংলার একমাত্র লক্ষ্য ছিল রাজধানী ঢাকা পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করা। যৌথবাহিনীর অগ্রগামী দল ঢাকার কাছাকাছি পৌঁছে মাত্র ৫-৬ মাইল দুরত্বে বালু এবং শীতলক্ষ্যা নদী অতিক্রম করে। পাকবাহিনী বালু নদীর পূর্ব তীরে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাসাবো ও খিলগাঁও এলাকার চারদিকে আগে থেকেই পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থাসহ অবস্থান নিয়েছিল।

ঢাকা পতনের লক্ষ্যে যৌথবাহিনী তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। এদিন ভারতীয় বাহিনী উত্তর ও পূর্ব দিক থেকে ঢাকার একেবারে দোরগোড়ায় প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যে এসে পড়ে। জেনারেল গান্ধর্ব নাগরার ব্রিগেড উত্তর দিক থেকে এগিয়ে আসে। পূব থেকে আসে ৫৭ ডিভিশনের দুটো ব্রিগেড। টাঙ্গাইলে নামে প্যারাট্রুপার বাহিনী। চতুর্থ ডিভিশন পশ্চিমে মধুমতি পার হয়ে এসে পৌঁছে যায় পদ্মা তীরে। মেজর জেনারেল নাগরা টাঙ্গাইল আসেন রাত নয়টায়। ব্রিগেডিয়ার ক্লের ও ব্রিগেডিয়ার সান সিং সন্ধ্যা থেকে টাঙ্গাইলেই ছিলেন। টাঙ্গাইল ওয়াপদা রেস্ট হাউজে রাত সাড়ে নয়টায় তারা পরবর্তী যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বসেন।

আলোচনার শুরুতে মেজর জেনারেল নাগরা মুক্তিবাহিনীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা যদি আমাদের বিনা বাধায় এতটা পথ পাড়ি দিতে সাহায্য না করতেন, তাহলে আমাদের বাহিনী দীর্ঘ রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত। রাস্তাতেই আমাদের অনেক শক্তি ক্ষয় হয়ে যেত।

উত্তরাঞ্চলে যৌথবাহিনী গোবিন্দগঞ্জ থেকে বগুড়ার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। একটি পাকিস্তানি রেজিমেন্ট কামান ও ট্যাঙ্ক নিয়ে ভারী আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।রাতে, যৌথবাহিনী বগুড়া শহর ঘিরে ফেলে। মধ্যরাতে, তিনটি ব্যাটালিয়ন উত্তর, দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্ব অংশ থেকে শহরে আক্রমণ করে। এইদিনে নীলফামারী, মানিকগঞ্জ ও বগুড়া জেলা পাক হানাদার মুক্ত হয়।

৪৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক এবং ১০৭ জন পাকিস্তানি সেনা সৈয়দপুরে আত্মসমর্পণ করে । চতুর্থ বেঙ্গল চট্টগ্রামের দিকে এগুনোর পথে হানাদাররা বাধা দেয়। নাজিরহাটে ২৪তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স তাদের তিন কোম্পানি এবং বেশকিছু ইপিসিএএফসহ অবস্থান নিয়েছিল। ব্যাপক যুদ্ধের পর হানাদাররা পালিয়ে যায়। ময়ানমতিতে আত্মসমর্পণ করে এক হাজার ১৩৪ জন।খুলনা ও চট্টগ্রামে হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনী ও স্থানীয় মানুষের অবিরাম যুদ্ধ চলে। মুজিবনগরে তখন চরম উত্তেজনা।

এদিন থেকে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্টুডিওতে বসে বার্তা বিভাগীয় প্রধান কামাল লোহানী, আলী যাকের ও আলমগীর কবির ঘন ঘন সংবাদ বুলেটিন পরিবর্তন ও পরিবেশন করেন। প্রতি মুহূর্তে খবর আসছে ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা মুক্ত।

যুদ্ধে সুনিশ্চিত জয় জানতে পেরে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘের যেসব কর্মী, কূটনৈতিক, প্রতিনিধি ও বিদেশী নাগরিক নিরাপদে সরে আসতে চান বাংলাদেশ সরকার তাদের সম্ভাব্য সবরকমের সুযোগ সুবিধা দেবে।

নিয়াজীকে জানানো হয়, পাকবাহিনীর সাহায্যের জন্য যে ‘মিত্রদের’ এসে পৌঁছনোর কথা ছিল, তা আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী সদরদপ্তরে বাংলাদেশকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক ব্যর্থ প্রয়াস দেখা যায়। মাহবুব আলম চাষী যুদ্ধবিরতির এক বিবৃতিতে স্বাক্ষর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন। বিবৃতির মূল বক্তব্য ছিল: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছার উদ্দেশ্য নিয়ে যদি শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে তৎক্ষণাৎ বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করবেন। কিন্তু সৈয়দ নজরুল বিবৃতিতে স্বাক্ষর দানে অসম্মত হন এবং বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে জানান।

এদিন লে. কর্নেল শফিউল্লাহর এস ফোর্স ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে ডেমরা পৌঁছে। বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনীর সর্বপ্রথম ইউনিট হিসেবে ২০-ইস্ট বেঙ্গল ঢাকার শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ে মুরাপাড়ায় পৌঁছে।

ডা. মালেকের মন্ত্রীসভা, শান্তি কমিটি ও স্বাধীনতাবিরোধী দালালরা বেশিরভাগই অবস্থা বেগতিক দেখে গা ঢাকা দেয়। কিন্তু ঘাতক আলবদর চক্র সক্রিয় থাকে। সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে তার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় কিছু আল বদর কর্মী। সেলিনা পারভীন ছিলেন একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক। তিনি সাপ্তাহিক বেগম, সাপ্তাহিক ললনা, ও শিলালিপি পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের অংশ হিসেবে ১৪ ডিসেম্বর আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হওয়ার পর তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে গুলিতে-বেয়নেটে ক্ষত বিক্ষত সেলিনা পারভীনের মৃতদেহ পাওয়া যায়।

২০০২ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এক আদেশবলে রাজধানী ঢাকার মৌচাক মোড় থেকে মগবাজার পর্যন্ত সড়কটির উভয় পাশ শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিনের নামে ‘শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক’ নামকরণ করা হয়।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension