
৩২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ—কোথায় যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি?

শাহ্ জে. চৌধুরী
ঋণের রেকর্ড উচ্চতা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় সতর্কবার্তা
বিশ্বজুড়ে ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার—যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। শুধু সরকারি ঋণই ২০২৪ সালে ছুঁয়েছে ১০২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৯৭ ট্রিলিয়ন।
ঋণ বৃদ্ধি: মূল কারণসমূহ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ব ঋণ বাড়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে—
• মহামারি-পরবর্তী ব্যয়: কোভিড-১৯ মোকাবিলা ও অর্থনীতি সচল রাখতে অনেক দেশ ব্যাপক ঋণ নিয়েছিল।
• যুদ্ধ ও ভূ-রাজনীতি: ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাত প্রতিরক্ষা খরচ বাড়িয়েছে।
• সুদের হার বৃদ্ধি: বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ায় পুরনো ঋণ শোধ আরও কঠিন হয়েছে।
• উন্নয়ন খাতে ব্যয়: অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ চালাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (UNCTAD) জানিয়েছে, এ ঋণের চাপ সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। অনেক দেশ পুরনো ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে নতুন ঋণ নিচ্ছে, ফলে তারা এক ধরনের দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার, বিনিয়োগ এবং সামাজিক খাতে ব্যয়ে।
অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থায় থাকলেও কর্পোরেট ও ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা সেখানেও দ্রুত বাড়ছে। এতে ব্যাংকিং খাত ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণের উপায়
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক ঋণ সংকট মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি—
• আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: IMF ও বিশ্বব্যাংকসহ সংস্থাগুলোর উচিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণ পরিশোধে নমনীয়তা আনা।
• স্বচ্ছ অর্থনীতি: সরকারি ব্যয়ে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে, অপচয় কমাতে হবে।
• রাজস্ব আয় বৃদ্ধি: করভিত্তি সম্প্রসারণ ও কর ফাঁকি রোধ জরুরি।
• দায়িত্বশীল ঋণনীতি: নতুন ঋণ নেয়ার আগে প্রকল্পের কার্যকারিতা যাচাই করা দরকার।
• বিকল্প অর্থায়ন: ঋণের ওপর নির্ভর না করে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
সম্পাদকীয় মতামত
আমার মতে, ৩২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ঋণ শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটি মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে প্রশ্ন করছে।
বিশ্ব অর্থনীতি যেন এক অদৃশ্য দড়ির টানে চলছে। সরকারগুলো রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে ক্রমাগত ঋণের ওপর নির্ভর করছে; কর্পোরেট খাত মুনাফার দৌড়ে সীমাহীন ধার করছে; আর সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার জন্যই ব্যাংকের শরণাপন্ন হচ্ছে। এই তিন স্তরের ঋণ মিলে এক দানবীয় চক্র তৈরি করেছে, যেখান থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো—এই ঋণের প্রকৃত বোঝা বহন করছে সাধারণ মানুষ। যখন একটি দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা—এসব খাতে ব্যয় কমানো হয়। ফলে প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়, স্বপ্নে, এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যতেও।
এখন সময় এসেছে বিশ্বকে “ঋণ-সংস্কৃতি” থেকে “উৎপাদন ও টেকসই উন্নয়ন-সংস্কৃতি”-র দিকে নিয়ে যেতে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নমনীয় শর্তে ঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিল প্রয়োজন। দেশের উচিত স্বচ্ছ অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং ঋণকে শেষ ভরসা হিসেবে ব্যবহার করা, প্রথম সমাধান হিসেবে নয়।
অন্যথায়, আজকের এই ঋণের পাহাড় একদিন ধসে পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর, এবং তার অভিঘাত সামলানো অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
সূত্র: Reuters, UNCTAD, AP News



