
বুয়েটছাত্র ফারদিন হত্যা: মামলার পর বান্ধবী রিমান্ডে
বুয়েটছাত্র ফারদিন নূর পরশ হত্যা মামলায় ফোনকল ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজের সূত্র ধরেই চলছে তদন্ত। নিখোঁজ হওয়ার দিন বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরাকে রামপুরা রেখে যাওয়ার পর ছয়টি নম্বরে ফোনালাপ হয়েছে তার। এর মধ্যে বেশিরভাগই তার বন্ধু-বান্ধব। তাদের সঙ্গে কি কথা হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন তারা। বুশরাকে রামপুরা নামিয়ে দেয়ার পর সেদিন তাড়াহুড়া করে ফারদিন বিভিন্ন জায়গায় ছুটোছুটি করছিলেন সে প্রশ্নের জবাব বের করা জরুরী। ফারদিনের মোবাইল ফোনের শেষ অবস্থান ছিল নারায়নগঞ্জের রুপগঞ্জের চনপাড়ায়। সেখানে কারও সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে ফারদিন খুন হতে পারেন বলে ধারণা করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর গুম করার জন্য ফারদিনের লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
এদিকে ফারদিন হত্যা রহস্য উদঘাটনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার বান্ধবী বুশরার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম মেহেদী হাসান বুশরাকে ৫ দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। বুশরাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম মাওলা।
তবে বুশরার পক্ষে জামিনের জন্য আবেদন করা হয়নি। আদালতে তার পক্ষে কোনো আইনজীবীও ছিলেন না। তাই বুশরার রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতাও করেনি কেউ। শুনানির পুরোটা সময় কাঠগড়ায় নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন বুশরা।
এর আগে বুশরাকে একমাত্র আসামি করে বৃহস্পতিবার ভোরে রামপুরা থানায় হত্যা মামলা করেন ফারদিনের বাবা। মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধারের পর বুশরাকে হেফাজতে নিয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেও হত্যাকান্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তেমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। ফারদিনের বাবার মামলায় নাম থাকায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে জানান ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বুশরাকে রামপুরায় রেখে যাওয়ার পর ছয়টি নম্বরে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে ফারদিনের কী কথা হয়েছে সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রযুক্তিকর সহায়তায় যেসব স্থানে ফারদিনের অবস্থানের খবর পাওয়া গেছে; সেসব এলাকার সিটি ফুটেজ সংগ্রের চেষ্টা চলছে। তবে এ ব্যাপারে এখনো খুব বেশি অগ্রগতি নেই।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, ৪ নভেম্বর রাতে বুশরার সঙ্গে রিকশায় রামপুরা ব্রিজের কাছে পৌছানোর কিছুক্ষণ আগে ইফাত জাহান মোমো নামে এক বান্ধবীর সঙ্গে চ্যাটিং করছিলেন ফারদিন। বুশরাকে নামিয়ে দেওয়ার পর মোটরসাইকেলে করে কেরানীগঞ্জ ও জনসন রোড এলাকার বিভিন্ন স্থানে যান ফারদিন। সেখান থেকে যান চনপাড়া এলাকায়। তখনও মোমোর সঙ্গে চ্যাটিং হয় তার। রাত ১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মোমোর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে চ্যাটিং হয় ফারদিনের। রাত ২টা ৩৫ মিনিটে তার অবস্থান চনপাড়ায় পাওয়া গেছে। সেখানে মাদকের গডফাদার শাহীনসহ মাদক কারবারিদের সঙ্গে ফারদিনের বাকবিতন্ডা হয়। তাদের মারধরেই ফারদিন খুন হয়েছেন।
কিন্তু গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মাদক কারবারি শাহিন র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ২৩ মামলার আসামি শাহীন চনপাড়া এলাকায় ছিপি শাহীন নামে পরিচিত ছিলেন। তবে ফারদিনের মৃত্যুর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা সে বিষয়ে কিছু জানে না র্যাব।
এ বিষয়ে র্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্ণেল আব্দুল্লাহ আল মোনেম সাংবাদিকদের বলেন, শাহীন দুটি হত্যা মামলাসহ ২৩টি মামলার আসামি। তাকে আগে থেকেই চোখে চোখে রেখেছিল র্যাব। বৃহস্পতিবার তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে। আত্মরক্ষার্তে র্যাব গুলি চালালে শাহিন গুরুতর আহত হয়। আর তার অন্য সহযোগীরা গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়। পরে শাহীনকে উদ্ধার করে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, র্যাবের এ অভিযানের পেছনে বুয়েট ছাত্রের ঘটনার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। শাহীন ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কিনা তাও আমরা জানিনা।
গত ৪ নভেম্বর ফারদিন নিখোঁজ হওয়ার পর ৭ নভেম্বর বিকালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসক জানান, ওই তরুণকে হত্যা করা হয়েছে। ফারদিন নিখোঁজ হওয়ার আগে তাকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল রামপুরা এলাকায় বুশরার সঙ্গে। সে কারণে রামপুরা থানাতেই একটি জিডি করেছিলেন ফারদিনের বাবা।
ওই জিডির পরিপ্রেক্ষিতে বুশরাকে জেরা করেন রামপুরা থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম। তখন বুশরা জানান, ৪ নভেম্বর ফারদিন বাসা থেকে বের হওয়ার পর ওইদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার (বুশরা) সঙ্গে সময় কাটিয়েছে। প্রথমে তারা দুজন ধানমণ্ডি সিটি কলেজ এলাকায় দেখান করেন। পরে নীলক্ষেত ও ধানমণ্ডি এলাকায় ঘুরে বেড়ান। বিকেলে ধানমণ্ডির একটি রেস্তোরাঁয় খেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘুরতে আসেন তারা। পরে রাত ১০টার দিকে রিকশায় করে রামপুরা টেলিভিশন ভবন এলাকায় আসেন।
ফারদিনের মৃত্যু প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল জানিয়েছেন, ফারদিনের সর্বশেষ অবস্থান ছিল গাজীপুর। সেখান থেকে তার মরদেহ কিভাবে শীতলক্ষ্যায় গেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি একটি হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
ফারদিনের বাবার করা হত্যা মামলা ডিবিতে হস্তান্তরের তথ্য জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ফারদিনের বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এছাড়াও অপরাধীদের ধরতে নগরীর বিভিন্ন জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই বাছাই চলছে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক, সামাজিক কোনও ঝামেলা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাটি কিভাবে ঘটেছে আমরা এখনই বলতে পারছি না। একটু সময় লাগবে। আমাদের দুই-তিনটি টিম কাজ করছে। আরও পারিপার্শ্বিক বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। রিমান্ডে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে বুশরার কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন ডিবি প্রধান।



