
চ্যাম্পিয়নদের উত্তরাধিকার: ফিফা মিউজিয়ামে একটি বৃষ্টিভেজা বিকেল
হুমায়ূন কবীর ঢালী
সব গল্পেরই একটা শুরু থাকে। আমাদের এই ফুটবল-অভিযাত্রার শুরুটা হয়েছিল আফতাব জনির হাত ধরে। বেশ কয়েকদিন আগে জনি যখন ফিফা মিউজিয়াম ঘুরে এসে তার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্প শোনাচ্ছিল, তখন থেকেই মনের ভেতর একটা সুপ্ত বাসনা দানা বাঁধছিল—যেভাবেই হোক, সেখানে যেতেই হবে। মিউজিয়ামে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের মূল্য লাগে না সত্য, তবে নিয়মের বেড়াজালে অনলাইনে আগেই স্লট বুকিং দিতে হয়। আমরাও আর দেরি না করে শাহ ভাইয়ের মোবাইলে অগ্রিম বুকিং সেরে ফেললাম। দিনটি ছিল জুনের ২৩ তারিখ, মঙ্গলবার।

নিউ ইয়র্কের আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা। গতকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে—কখনো গুড়ি গুড়ি, কখনো আবার বেশ ভারী। তবে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই বৃষ্টি কোনো বাধাই নয়। দুপুর তিনটে নাগাদ আমরা আমাদের জ্যাকসন হাইটসের দলবল নিয়ে রওনা হলাম। দলে আমরা দুই ভাগে মোট নয় জন। জ্যাকসন হাইটস থেকে আমাদের সাথে আছেন শাহ জে চৌধুরী, আমি, রিদোয়ানুর জুয়েল এবং আব্দুল্লাহ নোমান। অন্যদিকে নিউ জার্সি থেকে আসার কথা পলাশ ভাই, শিমুল ভাবী এবং বাংলাদেশ থেকে বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা ও আবহ উপভোগ করতে আসা বিশেষ অতিথি মিল্টন ভাই, তার মিসেস ও কন্যা। আমাদের দলনেতার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন শাহ জে. চৌধুরী।

এফ ট্রেনে চেপে আমরা যখন রকফেলার সেন্টার স্টেশনে নামলাম, তখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছে। সেখান থেকে মাত্র ৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে ফিফটি এভিনিউ। শাহ ভাই ফোনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন পলাশ ভাইরা ইতিপূর্বেই সেখানে পৌঁছে গেছেন, তবে গোলকধাঁধার মতো রাস্তায় তারা ঠিক ফিফা মিউজিয়ামটি খুঁজে পাচ্ছেন না। আমরা আর মিউজিয়ামের ভেতরে না ঢুকে তাদের এগিয়ে নিয়ে আসতে গেলাম। কাছাকাছিই দেখা মিলল সবার। তবে একটুখানি খটকা—আমরা সবাই মিলে যখন মিউজিয়ামের দিকে এগোচ্ছি, তখন আমাদের সংখ্যা নয় এর বদলে আট! কারণ, ম্যানহাটনের ব্যস্ত রাস্তায় পলাশ ভাই গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো জায়গা পাননি। অগত্যা তিনি বললেন, “আপনারা যান, আমি গাড়ি নিয়ে এখানেই থাকছি।” একজন একনিষ্ঠ সঙ্গীকে বাইরে রেখে আমাদের আট জনের দলটি এগিয়ে চলল ফিফা মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বারের দিকে।

মিউজিয়ামের গেটে পৌঁছাতেই দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মী অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে আমাদের অনলাইন টিকিট পরীক্ষা করে ভেতরে স্বাগত জানালেন। ভেতরে প্রবেশ করতেই এক অদ্ভুত ভালোলাগা আমাদের গ্রাস করল। প্রবেশমুখেই আমরা সবাই মিলে মেতে উঠলাম প্রথম ‘দলবদ্ধ সেলফি’ বা ঢালফিবন্দিতে। আর তার ঠিক পরেই শুরু হলো একের পর এক চমক, যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল বিশ্ব ফুটবলের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস।

মিউজিয়ামের শুরুতেই দেয়ালে নির্দেশিকা পত্রে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে প্রদর্শনীর মূল থিম— FIFA WORLD CUP™️ / COPA MUNDIAL DE LA FIFA™️ এবং LEGACIES OF CHAMPIONS। সেখানে থাকা লেখাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল ফুটবলের সেই অমোঘ সত্যকে—কীভাবে একটি টুর্নামেন্ট মানুষের জীবনের ব্যক্তিগত স্মৃতি, আবেগ, জয় আর বুকভাঙা হারের গল্পকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। ১৯৯৯ সাল থেকে হুন্ডাই এবং ফিফা বিশ্বকাপের এই যৌথ প্রয়াস যে বিশ্বজুড়ে মানুষকে যুক্ত করার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা, তা সেখানে স্পষ্টভাবে খোদাই করা ছিল।
আমরা এক এক করে ফুটবল ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখতে থাকলাম মিউজিয়ামের ভেতরে কী কী বিস্ময় লুকিয়ে আছে। কাঁচের সুদৃশ্য গ্যালারিতে সাজানো ইতিহাসের প্রথম অর্থাৎ ১৯৩০ সালের উরুগুয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাস। সেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিককারী মার্কিন খেলোয়াড় বার্ট প্যাটেনডের (Bert Patenaude) পরিহিত ঐতিহাসিক জার্সি। ঠিক তার পাশেই রয়েছে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের সময়কার দলনেতা ও কর্মকর্তাদের বিভিন্ন স্মারক সম্বলিত একটি চমৎকার স্ক্র্যাপবুক বা অ্যালবাম, যা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল প্রায় এক শতাব্দী আগের সেই ফুটবল উন্মাদনায়।

একটু এগোতেই চোখে পড়ল লম্বা গ্যালারি জুড়ে সাজানো প্রাচীন সব বিশ্বকাপের ইতিহাস ও রেয়ার কালেকশন। পর্যায়ক্রমে ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে, ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপ, ১৯৩৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে ১৯৫০ সালের ব্রাজিলের মারাকানাজোর ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো পোস্টার ও স্মারকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুগ্ধ নয়নে আমি দেখছিলাম ফুটবলের সেই বিবর্তনকে। পেলে, জুলিও কুরি, ট্রফির ডিজাইন পরিবর্তন। গ্যালারিতে আরও শোভা পাচ্ছিল ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ইতিহাস। যেখানে রবেন রেনসেনব্রিংকের সেই বিখ্যাত শট পোস্টে লাগার গল্প এবং আর্জেন্টিনার প্রথম শিরোপা জয়ের রোমাঞ্চকর বিবরণ লেখা রয়েছে। তার পাশেই জ্বলজ্বল করছে চামড়ার তৈরি প্রাচীন সব ফুটবল, যার গায়ে লেগে আছে ইতিহাসের ধূলিকণা ও কিংবেন্দিতদের স্বাক্ষর। ১৯৮২ বিশ্বকাপের ইতিহাস দেখে ১৯৮৬তে এসে থমকে দাঁড়ালাম। কারণ একটাই— ম্যারাডোনা। ফুটবলের রাজপুত্রের সেই জাদুকরী বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতিগুলো গ্যালারির দেয়ালে দেয়ালে যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিচ্ছিল।

এরপর সময়কে পেছনে ফেলে আমরা যখন সামনে এগোলাম, তখন দেখতে পেলাম ফুটবল বিবর্তনের এক আধুনিক রূপ। ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপের স্মারক পার হয়ে ২০০২ সালের এশিয়ার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপের রঙিন দিনগুলো ছুঁয়ে আমাদের চোখ আটকে গেল ২০০৬ সালের জার্মানির আসরে। গ্যালারিতে তখন জ্বলজ্বল করছে জিনেদিন জিদানের সেই ঐতিহাসিক শেষ আসরের স্মৃতি, পেলের সেই রাজকীয় ট্রফি জয়ের কালজয়ী ছবি।
একের পর এক কিংবদন্তিদের মহিমান্বিত ছবিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর মতোই আমার হৃদস্পন্দনও যেন বেড়ে যাচ্ছিল। দেখতে দেখতে ২০২২ এ এসে ফের থমকে দাঁড়াতেই হয়। মেসির আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনার মেসি— বিশ্বের অগণিত ভক্তের মেসি। কাতার বিশ্বকাপের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল আর ট্রফি উঁচিয়ে ধরা মেসির সেই ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমরা যেন সেই রূপকথার মহাকাব্যের ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছি।

তবে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও জাদুকরী মুহূর্তটি এলো যখন আমরা সরাসরি সেই আসল বিশ্বকাপ ট্রফির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাঁচের আবরণের ওপাশে রাখা নিটোল সোনার তৈরি সেই ট্রফিটি দেখামাত্রই গা শিউরে উঠল, আবেগ উজ্জীবিত হয়ে উঠল এক অনিন্দ্য আলোড়নে। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ এখনো দরজায় কড়া নাড়ছে। কার ঘরে যাবে এই ট্রফি? কোন দেশের খেলোয়াড়দের হাতে উঠবে এই শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক? সেই মহাক্ষণ আসার আগেই সুদূর বাংলাদেশের একজন সাধারণ ফুটবল প্রেমী হিসেবে নিউ ইয়র্কের বুকে দাঁড়িয়ে এই ট্রফিটিকে এত কাছ থেকে দেখতে পাওয়া এবং পরম মমতায় ছুঁয়ে দেওয়ার মতো অনুভূতি পাওয়া— তা সত্যিই ভাষায় ব্যক্ত করার নয়। এই এক মুহূর্তের অনুভূতি আমার জীবনের অন্যতম সেরা সঞ্চয় হয়ে থাকবে।

আসলে মূল বিশ্বকাপ ট্রফি দেখার পর মিউজিয়ামের অন্য কিছু দেখার আগ্রহ যেন এক নিমেষেই ফিকে হয়ে যায়। তবুও মোহগ্রস্তের মতো যখন আরও কিছুদূর এগোলাম, তখন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও চমৎকার কিছু প্রদর্শনী। সামনেই সাজানো ছিল আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল জার্সি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তারকা খেলোয়াড়দের গোল দেওয়ার পরের চেনা ও ঐতিহাসিক সব উদযাপনের দারুণ সব রেপ্লিকা। সেগুলো দেখতে দেখতে মনে হলো—মিউজিয়ামের প্রতিটি কোণ যেন একেকটি টাইম মেশিন, যা মুহূর্তেই অতীত থেকে আমাদের ভবিষ্যতের মোহনায় নিয়ে দাঁড় করায়।

বাইরে তখনো হয়তো রিমঝিম বৃষ্টি পড়ছিল, নিউ ইয়র্কের ব্যস্ত রাজপথ ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ফিফা মিউজিয়ামের ভেতরে আমরা আটজন তখন সম্পূর্ণ এক অন্য ভুবনের বাসিন্দা, ভাসছিলাম ফুটবলের এক সোনালী অতীতে। ফুটবল যে কেবলই মাঠের ২২ জন খেলোয়াড়ের একটি খেলা নয়, বরং এটি কোটি মানুষের আবেগ, চোখের জল, আনন্দ আর সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন—ফিফা মিউজিয়ামের এই ‘লেগাসিজ অব চ্যাম্পিয়ন্স’ প্রদর্শনীটি নিজের চোখে না দেখলে সেই পরম সত্যটি হয়তো চিরকালই অধরাই থেকে যেত। এক বুক ভালোলাগা আর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতির ডালি নিয়ে আমরা যখন মিউজিয়াম থেকে বের হলাম, তখনো মনের কোণে বাজছিল সেই চেনা ফুটবল উন্মাদনার সুর।
এক বুক ভালোলাগা আর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতির ডালি নিয়ে আমরা যখন মিউজিয়াম থেকে বের হলাম, তখনো মনের কোণে বাজছিল সেই চেনা ফুটবল উন্মাদনার সুর।



