খেলা

বিতর্কিত পেনাল্টি ও ফাউলের ছড়াছড়ি

মিশরকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়, ক্ষোভে ফুঁসছেন এন্টি-আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা

হুমায়ূন কবীর ঢালী:
৭ জুলাই ফুটবলের মাঠে আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের মধ্যকার ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক চরম উত্তেজনা আর নাটকীয়তায়। ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১৪ মিনিটে ৩ গোল করে মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। আগামী ১১ জুলাই কানসাস সিটিতে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবেন মেসিরা। তবে মাঠের এই ঐতিহাসিক জয় ছাপিয়ে এখন মূল আলোচনায় রেফারিং এবং একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। ম্যাচ শেষ হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সবখানেই বইছে ক্ষোভ আর সমালোচনার ঝড়।

খেলার শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। প্রথমার্ধের শুরুতেই মিশরের আক্রমণভাগ দারুণ সমন্বয়ে গোল করে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে চরম সংকটে পড়েছিল।
কিন্তু এরপরই ম্যাজিক পারফরম্যান্স দেখায় লা অ্যালবিসেলেস্তে ব্রিগেড। প্রথমে ব্যবধান কমান ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরো। এরপর দারুণ এক গোলে সমতা ফেরান রোজারিওর রাজপুত্র লিওনেল মেসি। আর শেষমুহূর্তে এনজো ফার্নান্ডেজের জয়সূচক গোলে উল্লাসে মাতে আর্জেন্টিনা। নীল-সাদা ব্রিগেড জিততেই আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কেঁদে ফেলেন মেসি। খেতাব ডিফেন্ড করার মিশনে গতবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সামনে বাকি আর মাত্র তিনটি ম্যাচ। এই তিনটে জিততে পারলেই ইতিহাস গড়বে মেসির দল।

আর্জেন্টিনার জয় ছাপিয়ে তিনটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে এখন ফুটবল বিশ্বে তুমুল বিতর্ক চলছে, যা ‘অ্যান্টি-আর্জেন্টিনা’ সমর্থকদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে—
আর্জেন্টিনা যখন ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে, ঠিক তখনই তাদের পক্ষে একটি পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। মিশরের ডিফেন্ডারের দাবি ছিল, তিনি বল ক্লিয়ার করেছিলেন, কোনো ফাউল করেননি। কিন্তু ভিএআর রিভিউ নিয়েও রেফারি পেনাল্টির সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এই গোলটিই আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে ফেরায়। অন্যদিকে মিশরের দুটি পেনাল্টির দাবি সরাসরি নাকচ করে দেওয়া হয়।
ম্যাচের ৭০ মিনিটে আর্জেন্টিনার এক মিডফিল্ডারের করা একটি মারাত্মক ট্যাকল সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ার যোগ্য ছিল বলে দাবি মিশরীয় শিবির ও সাধারণ ফুটবল বিশ্লেষকদের। তবে রেফারি তাকে কেবল হলুদ কার্ড দেখিয়ে পার করে দেন। বিপক্ষ সমর্থকদের দাবি, সেখানে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হলে ম্যাচের ফলাফল অন্যরকম হতে পারত।
ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা যে ৩-২ ব্যবধানের জয়সূচক গোলটি পায়, সেটি নিয়ে অফসাইডের জোরালো বিতর্ক উঠেছে। খালি চোখে আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড সামান্য অফসাইড পজিশনে ছিলেন বলে মনে হলেও রেফারি লাইন্সম্যানের ইশারায় গোলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
@
আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার ম্যাচে রেফারির ভূমিকায় হতবাক বিশ্ব। ম্যাচ শেষে মিশরের কোচ ও খেলোয়াড়রা এই পরাজয়ের জন্য সরাসরি আঙুল তুলেছেন রেফারির দিকে। বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই রেফারির নাম ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। ১৯৮৯ সালে ফ্রান্সের ব্রিটানিতে জন্ম নেওয়া লেতেক্সিয়ে বিশ্ব ফুটবলের বেশ পরিচিত মুখ।
২০১৬ সালে ফরাসি লিগ ওয়ানে যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির স্বীকৃতি পান তিনি। এরপর দ্রুতই উয়েফার এলিট ক্যাটাগরির রেফারি হন। ২০২১ ইউরোপা লিগ ফাইনাল, ২০২৩ উয়েফা সুপার কাপ ফাইনাল, ইউরো ২০২৪ ফাইনাল ও ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করেছেন তিনি।

ক্যারিয়ারে এবারই প্রথম নয়, ২০২২ সালে নিস বনাম নঁতের ম্যাচে ভিএআর ব্যবহার করে পেনাল্টি না দেওয়ায় ব্যাপক সমালোচিত হন তিনি। সেই ম্যাচে ৭টি হলুদ ও ২টি লাল কার্ডের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। চলতি আসরে এই ম্যাচের আগে দুটি ম্যাচ পরিচালনা করে তিনি মোট আটটি হলুদ কার্ড দেখালেও কোনো পেনাল্টি বা লাল কার্ড দেননি। তবে আর্জেন্টিনার ম্যাচে তার সিদ্ধান্তগুলো তাকে নতুন করে বড় বিতর্কের মুখে ঠেলে দিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের সুনামি
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর থেকেই ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং টিকটকে আর্জেন্টিনা-বিরোধী ফুটবল ভক্তদের ট্রল, মিম আর ক্ষোভ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। অনেকেই এই ম্যাচটিকে ‘রেফারি ও আর্জেন্টিনার মেলবন্ধন’ বলে তীব্র কটাক্ষ করছেন।
“মিশরের মতো লড়াকু একটা দলের স্বপ্ন এভাবে রেফারি খাতির করে ভেঙে দিল? এটা ফুটবল নয়, এটা স্রেফ প্রহসন!” — সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ফুটবল ভক্তের ভাইরাল মন্তব্য।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা ভক্তরা এই জয়কে তাদের দলের ‘লড়াকু মানসিকতা’ এবং ‘যোগ্য জয়’ হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, ফাউল কিংবা পেনাল্টির সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ রেফারি ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং আর্জেন্টিনা শুধু সুযোগের সৎ ব্যবহার করেছে।

মাঠের লড়াইয়ে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে আর্জেন্টিনা হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, কিন্তু মাঠের বাইরের এই বিতর্ক সহজে থামার নয়। ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, ভিএআর-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি আসার পরও যদি এমন বড় ম্যাচগুলোতে রেফারিং নিয়ে এত ধোঁয়াশা থেকে যায়, তবে তা ফুটবল খেলার সৌন্দর্যকেই নষ্ট করবে। আপাতত এই উত্তাপ মাঠ ছাড়িয়ে কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension