
নাসা-সিনেটসহ মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় নজর চীনা হ্যাকারদের
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ও সিনেটসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে চীন-সমর্থিত হ্যাকারদের দীর্ঘদিনের সাইবার অভিযান চালানোর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সবকটিতে সফলভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেনি বলে পরে স্পষ্ট করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। কিছু ক্ষেত্রে হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, আবার কয়েকটি নেটওয়ার্কে সফল অনুপ্রবেশ ও তথ্য চুরির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন বুধবার (২৬ আগস্ট) জানায়, চীন-সমর্থিত হ্যাকারদের একটি সাইবার অভিযান তারা নস্যাৎ করেছে।
ওই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সংবেদনশীল নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ব্যবহৃত ‘কিউস্ক্যান’ (QScan) ও ‘কিউটিআরাউটার’ (QTRouter) নামের দুটি হ্যাকিং প্ল্যাটফর্মের ডোমেইন জব্দ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ ও এফবিআই।
মার্কিন বিচার বিভাগের আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, চীন-সমর্থিত ‘কিউটিএফওয়াই’ (QTFY) নামের একটি হ্যাকিং গোষ্ঠী এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করত। গোষ্ঠীটি নানজিংভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘নানজিং শিনজিউওয়েই নেটওয়ার্ক টেকনোলজি কোম্পানি’র হয়ে কাজ করত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের মধ্যে চীনের বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি এবং দেশটির সামরিক বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মি রয়েছে।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, কিউটিএফওয়াইয়ের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল নাসা, ফেডারেল রিজার্ভ, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ) এবং মার্কিন সিনেট।
পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করা হয়েছিল।
তবে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) মার্কিন বিচার বিভাগ তাদের আগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনে। আগের বিজ্ঞপ্তিতে ওই সরকারি সংস্থাগুলোকে হ্যাকারদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সংশোধিত বিবৃতিতে বলা হয়, তারা ছিল হ্যাকারদের ‘লক্ষ্যবস্তু’—সব ক্ষেত্রে সফলভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেনি।
সংশোধিত বিবৃতিতে বিচার বিভাগ জানায়, ২৬ আগস্টের বিজ্ঞপ্তিতে সব সংস্থাকে ভুক্তভোগী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। কিন্তু হ্যাকিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ডোমেইন জব্দের পক্ষে দাখিল করা সরকারি হলফনামায় স্পষ্ট ছিল যে সব প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা হলেও কেবল কয়েকটিতে সফলভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। এই পার্থক্য স্পষ্ট করতে বিজ্ঞপ্তিটি সম্পাদনা করা হয়েছে।
ফলে নাসা, ফেডারেল রিজার্ভ ও সিনেটসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ‘সফল সাইবার হামলা’ হয়েছে—এমন দাবি এখন আর নিশ্চিতভাবে করা যাচ্ছে না। বরং এসব প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে মার্কিন তদন্তের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
রয়টার্সও জানিয়েছে, সংশোধনের পর নিশ্চিতভাবে কোন কোন প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল এবং কোনগুলো শুধু লক্ষ্যবস্তু ছিল, সে বিষয়ে পরিধি আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে।
এফবিআইয়ের হলফনামায় বলা হয়েছে, অন্তত ২০১৮ সাল থেকে কিউটিএফওয়াই বিভিন্ন মার্কিন সরকারি নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। নাসার নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের একটি চেষ্টাও এর অংশ ছিল।
তবে নাসাকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলার চেষ্টা সফল হয়নি। এফবিআইয়ের তদন্তে দেখা যায়, নাসা লক্ষ্য করা সফটওয়্যারের দুর্বলতা সময়মতো প্যাচ করায় হ্যাকাররা নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারেনি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের তিনটি জাতীয় গবেষণাগার, এনআইএইচ, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের একটি সংস্থা এবং একটি মার্কিন নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে সফল অনুপ্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি নথিতে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া এফবিআই, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) ও ইউএস সাইবার কমান্ডের যৌথ সাইবার নিরাপত্তা পরামর্শে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মে মাসে প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য চুরির ঘটনা ঘটেছিল। ২০২৬ সালের মার্চে মার্কিন সিনেট ও একটি হাসপাতালের নেটওয়ার্কে প্রবেশের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
যেভাবে কাজ করত হ্যাকিং প্ল্যাটফর্ম
মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কিউস্ক্যান ও কিউটিআরাউটার পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করত। কিউস্ক্যানের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ইন্টারনেট-সংযুক্ত ডিভাইস, বিশেষ করে ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ বা আইওটি ডিভাইস শনাক্ত ও আক্রান্ত করা হতো।
এরপর আক্রান্ত ডিভাইসগুলো কিউটিআরাউটার নিয়ন্ত্রিত একটি নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হতো। এই নেটওয়ার্ককে ‘অবফাসকেশন নেটওয়ার্ক’ হিসেবে ব্যবহার করে হামলার প্রকৃত উৎস আড়াল করা সম্ভব হতো। ফলে হামলাটি চীন থেকে পরিচালিত হলেও যোগাযোগ অন্য দেশের কম্পিউটার বা ডিভাইস থেকে এসেছে বলে মনে হতে পারত।
মার্কিন বিচার বিভাগ ও এফবিআই জানিয়েছে, এসব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত ডোমেইনগুলো জব্দ করার ফলে কিউস্ক্যান ও কিউটিআরাউটার অকার্যকর হয়ে পড়ে।
চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার হামলার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও ওয়াশিংটন চীনা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত বিভিন্ন হ্যাকিং গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করার অভিযোগ এনেছে।
তবে বেইজিং এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। সর্বশেষ ঘটনার পরও ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
চীনা পক্ষের দাবি, ওয়াশিংটন সাইবার নিরাপত্তার বিষয়কে ব্যবহার করে চীনকে ‘কলঙ্কিত বা হেয়’ করার চেষ্টা করছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কিউটিএফওয়াইয়ের কার্যক্রম অন্তত ২০১৮ সাল থেকে চলছিল এবং এর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও প্রতিরক্ষা, আর্থিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতকে লক্ষ্য করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সাইবার গোয়েন্দা তৎপরতার আশঙ্কা নতুন করে সামনে এসেছে।



