আন্তর্জাতিক

হিমালয়ে মহাদুর্যোগ: ২৩ দেশের ২৬১ বিদেশি নিখোঁজ

শাহ্ জে. চৌধুরী :
হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যায় চীন-নেপাল সীমান্তজুড়ে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তিব্বতের নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সঙ্গে নেপাল ও চীনের উভয় পাশে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৮০০-তে পৌঁছেছে এবং ৩ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

বুধবার হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদী ও উপত্যকা দিয়ে নেমে আসে। এর ফলে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গিয়েরং কাউন্টিতে এ পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১০৪ জন নেপালি, ৪৯ জন ভারতীয়, ৩৩ জন লাতভিয়ান, ১৮ জন মার্কিন নাগরিক এবং ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন।

নেপালের পরিস্থিতিও অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, নেপালে ৭৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ২,৫০২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ইতোমধ্যে ৭ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়া, পাহাড়ি ভূমির অস্থিতিশীলতা এবং নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি। নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নেপালের ত্রিশূলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় আরও বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গেও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একটি প্রকল্পের সুড়ঙ্গে প্রায় ৩৫০ জন আটকা পড়ার তথ্য পাওয়ার পর উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি, অক্সিজেন সরবরাহ ও জীবন শনাক্তকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান চালাচ্ছেন।

নেপাল ও চীন উভয় দেশেই উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। চীন ২,১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে এবং ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে প্রায় ২২ কোটি ইউয়ান বা ৩২.৭ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে। ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞরাও নেপালের উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করছেন।

এদিকে বন্যায় ভেসে আসা ও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি—এমন মৃতদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নেপালের কিছু এলাকায় গণদাফন শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে স্বজনদের কাছে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য মরদেহের ছবি, ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

চীনা বিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, হিমালয়ের উষ্ণায়ন ও হিমবাহের পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড ও নতুন করে বন্যার আশঙ্কার মধ্যেই উদ্ধারকারীরা জীবিতদের খুঁজে বের করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension