সাহিত্যউপন্যাস

সুন্দরতম সর্বনাশ

তাহমিদ হাসান

এক

ক.
—ওমর, একটু পানি খাওয়াবি আব্বা।

—আনছি, আম্মা।

এখন রাতের প্রায় শেষ প্রহর; বারো বছরের বালক ওমর সারারাত আম্মার শিয়রে বসে আম্মার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। বিলকিস বানুর শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল; মাঝে মাঝে তিনি ভুলও বকছেন। স্ত্রীর অসুখের ব্যাপারে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই হুমায়ূনের; সে গেছে পাশের গ্রাম কুমোর পাড়ায় গানের আসরে—ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে যাবে। ওমরের বৃদ্ধ দাদা-দাদি পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছেন। আম্মাকে খাওয়ানোর জন্য কোনো ওষুধ ঘরে নেই—গত হাটবারে হুমায়ূন কিছু ওষুধ এনেছিল, গতকাল তা শেষ হয়ে গেছে। অগত্য নিরুপায় হয়ে ওমর রাত জেগে বসে বসে আম্মার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল; যদিও আম্মার সেবায় তার ক্লান্তি নেই; বলা যায় এই বাড়িতে আম্মার দুঃখ-কষ্টের একমাত্র ভাগিদার সে।

রাতের অন্ধকারের মাঝেও একটা আবছা আলোর রেশ থাকে; সেই আলোয় পথ চিনে ওমর ঘর থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরের মাটির কুঁজো থেকে এক ঘটি পানি নিয়ে আম্মার ঘরে ফিরে এলো।

—আম্মা, পানি এনেছি।

—দে আব্বা, একটু খাইয়ে দে।

বিলকিস বানু মাথাটা একটু উঁচু করলেন; ওমর পরম যত্নে আম্মার মুখে ঘটি ধরলো; বিলকিস বানু তৃপ্তির সাথে সবটুকু পানি পান করলেন; তারপর বালিশে মাথা এলিয়ে দিলেন। ওমর আবার আম্মার মাথায় জলপট্টি দিতে শুরু করল। পানি পান করে বিলকিস বানু কিছুটা স্বস্তি অনুভব করলেন; ক্লান্ত গলায় তিনি ওমরকে বললেন,—’ওমর, আমি যদি মরে যাই, তবে তুই আর এ বাড়িতে থাকিস না আব্বা; এখানে থাকলে তুইও তোর আব্বার মতো নিষ্ঠুর হয়ে যাবি। তাছাড়া এখানে তোর বিদ্যা অর্জনেরও কোনো সুযোগ নেই।’

—তোমার কিচ্ছু হবে না আম্মা।

—আর একটা কথা আব্বা, জীবনে যাকে ভালোবাসতে পারবি না, তাকে কোনদিনই বিয়ে করবি না।

আম্মার এই দ্বিতীয় উপদেশের গূঢ় অর্থ ওমর বুঝলো না, বোঝার কথাও না এই বয়সে; সে শুধু কান্নার স্বরে আম্মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো,—’আম্মা, তোমার কিছু হবে না, তুমি ভালো হয়ে যাবে।’
বিলকিস বানু নীরব হয়ে গেলেন, আর ওমর আম্মার মাথায় জলপট্টি দিতে লাগল।

রাত প্রায় শেষ, কিন্তু ওমরের চোখে ঘুম নেই; খোলা জানালা দিয়ে সে বাইরে তাকিয়ে দেখলো—রাতের আকাশ ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে; বাইরের গাছ-পালার আকার আকাশের ধূসর ক্যানভাসের উপরে ধীরে ধীরে ফুটে উঠেছে—আলো আর আঁধারের এ এক অদ্ভুত খেলা, ওমর যেটা আজই প্রথম খেয়াল করল; যদিও বালক ওমরের এখন আকাশ দেখার সময় নয়, এখন তার ঘুমিয়ে থাকার কথা। জানালা ভেদ করে ভোরের সেই নরম আলোয় ঘরের অন্ধকার যেন পালিয়ে যাচ্ছে; আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে ওমর দেখলো—আম্মা ঘুমিয়ে আছেন, তাই ওমর একটু নিশ্চিন্ত হলো; কিন্তু বেচারা ওমর জানতেই পারলো না যে—রাতে পানি পান করে, তাকে শেষ উপদেশ দিয়ে আম্মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন; আর সারারাত ধরে পরম যত্নে সে তার মৃত আম্মার মাথায় জলপট্টি দিয়ে গেছে।

ভোরে কখন যে আম্মার বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছিল তা ওমরের মনে নেই; দাদা জানের ডাকা-ডাকিতে তার ঘুম ভাঙলো। ওমর দরজা খুলে দিলে দাদাজান জিজ্ঞাসা করলেন,—’ওমর, তোমার আম্মার শরীর এখন কেমন?’
—দাদাজান, সারারাত আমি আম্মার মাথায় জলপট্টি দিয়েছি—আম্মা এখন ঘুমাচ্ছে।

দাদার পিছনে পিছনে ওমরের দাদি ঘরে ঢুকে বৌমার গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন—বিলকিস বানুর সারা শরীর ঠাণ্ডা, বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলো না। গুলবাহার বানু তার স্বামী দরমুজ খাঁকে ঘরের এক কোণে ডেকে নিয়ে বললেন,—’বিলকিস আর নেই,, মারা গেছে।’

এই কথা শোনার সাথে সাথে ওমরের দুনিয়া দিনের আলোতেও অন্ধকার হয়ে গেল। সে বজ্রাহত বালকের মতো আম্মার বিছানায় পড়ে গেল, আর আম্মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিলো।

এতো বড় বাড়িতে আম্মাই ছিল ওমরের সব কিছু; তার আব্বা রাতে খুব একটা বাড়িতে থাকতো না, আর দিনে তার মেজাজ খুব গরম থাকতো; তাই ওমর পারোতোপক্ষে তার আব্বার সামনে পড়তে চাইতো না। দাদা জান সারাদিন ব্যস্ত থাকতো গ্রাম্য সালিশ-বিচার নিয়ে, তাই তিনিও ওমরকে খুব একটা সময় দিতে পারতেন না; ফলে বেচারা ওমর আম্মার মৃত্যুতে একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে গেল।

বিলকিস বানুর মৃত্যুর খবর শুনে পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে এসেছে, বাড়ি ভর্তি লোকজন; বিলকিসের লাশ ঘর থেকে বাইরের বারান্দায় এনে রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাড়িতে ফিরেছে হুমায়ূন। গুলবাহার বানু তার ছেলেকে বললেন,—’সারারাত কুমোর পাড়ায় কাটিয়ে এলি, এদিকে বউটা বিনা চিকিৎসায় মারা গেল।’

—আম্মা, আমি রাতে বাড়ি থাকলেই কি বিলকিস বেঁচে যেতো?

—হুমায়ূন, তোর সাথে কথা বলাই বৃথা।

গুলবাহার বানু অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ওমর তখনও আম্মার লাশের পাশে বসে ফুুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আকুতি ভরা চোখে সে তার আব্বার দিকে তাকালো; কিন্তু হুমায়ূন তার ছেলেকে কিছুই বললেন না, কোনো সান্তনাও দিলেন না।

খ.
গৌড়ের অত্যাচারী রাজা লক্ষণ সেনের রাজপ্রাসাদে আক্রমণকারী বীর সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির দ্রুত গতির সাথে যে সতেরো জন সৈন্য তাল মেলাতে পেরেছিলেন—দরমুজ খাঁ ছিলেন তাদেরই একজন। যুবক বয়সে ভাগ্যান্বেষণে তিনি গৌড়ে এসেছিলেন, তারপর এখানে বিয়ে-শাদি করে, এই মুরাদনগরে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন; বখতিয়ার খিলজির সহযোদ্ধা হিসেবে এখন তিনি বিপুল ধন- সম্পদের মালিক। বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি পেরিয়ে গেলেও এখনও তিনি যথেষ্ট শক্তিশালী, সুঠাম ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী; ওমরও তার দাদার মতো শারীরিক গঠন পেয়েছে। এই এলাকায় দরমুজ খাঁর উপরে কথা বলার কেউ নেই—তিনিই এই এলাকার শেষ কথা।

এটা কার্তিক মাস, স্বচ্ছ নীলাকাশে খণ্ড-খণ্ড সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে; গ্রামের শেষ প্রান্তে বড় বাবলা গাছটার মাথায় বসে এক ঝাঁক শকুন ঝিমাচ্ছে; বাড়ির উঠান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই শকুনের ঝাঁক। প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসন্ন—পাতা ঝরা হেমন্তের শেষ বিকেল চলে যেতে যেতে সেই কথাই বলে যাচ্ছে। ওমরদের বাড়ির সামনের মসজিদের খোলা মাঠে বিলকিস বানুর লাশ আনা হয়েছে; বাদ আছর জানাজা শেষে মসজিদের পাশের কবরস্থানে লাশ দাফন করা হবে। সকালেই বিলকিসের বাড়িতে লোক পাঠানো হয়েছে, বিলকিসের আব্বা আসলেই জানাজা শুরু হবে।

সকাল থেকে ওমর তার আম্মার লাশের পাশে বসে আছে, কোথাও নড়েনি; এর মধ্যে দাদি শুধু জোর করে তাকে গোসল করিয়ে খাইয়ে দিয়েছে। জানাজা শেষে লাশ কবরস্থানে নেওয়া হয়েছে, আগেই কবর খুঁড়ে প্রস্তুত করা ছিল। লাশ কবরে নামানোর পর ওমর কবরে নেমে শেষবারের মতো আম্মার মুখ দেখে নিলো; কবরে মাটি দেওয়া শেষ হলে সে কবরের মাটি জড়িয়ে কাঁদতে লাগল, যেন সে তার আম্মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে মোনাজাত করে, বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা—দাদার হাত ধরে বাড়ি ফেরার পথে, গতকাল আম্মার দেওয়া শেষ উপদেশের কথা মনে পড়লো ওমরের—মানুষ হতে চাইলে, বিদ্যা অর্জন করতে চাইলে তাকে বাড়ি ছাড়তে হবে। ওমর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—যে বাড়িতে অবহেলা ও বিনা চিকিৎসায় তার আম্মার মৃত্যু হয়েছে, সেই বাড়িতে সে আর থাকবে না। কিন্তু সে কোথায় যাবে এবং কীভাবে যাবে? ওমরের ছোট্ট মনে ঘুরপাক খেতে লাগল হাজারও প্রশ্ন।

অনেক রাত পর্যন্ত দাদা-দাদির সাথে বাড়ির উঠানে বসে থাকলো ওমর; দুজনে তাকে সান্ত্বনা দিলো, কিন্তু তাতে ওমরের মন শান্ত হলো না; সে তার আম্মার মতো চাপা স্বভাবের, তাই তার মনে যে ঝড় চলছে—দাদা-দাদি তা অনুমান করতে পারলেন না। রাতে দাদির পাশে ঘুমিয়েছিল ওমর; সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখলো—সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে, আগের মতোই চলছে সব; কিন্তু কোথায় যেন একটা ছন্দ পতন ঘটে গেছে, আম্মার মায়াভরা মুখ সে আর কোথাও দেখতে পেলো না। দাদা বাড়িতে নেই, সামনের কাছারি ঘরে গ্ৰামের লোক জনের সাথে আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত; অনেক খোঁজাখুঁজির পরও আব্বার সন্ধান না পেয়ে, বাড়ির পিছনে বিশাল পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে একা একা মনমরা হয়ে বসে থাকলো সে।

কিছুদিন আগেও আম্মার সাথে রোজ এই পুকুর ঘাটে আসতো ওমর; আম্মার অনেক কাজ করে দিতো, আম্মা ঘাটে কাজ করতো, আর ওমর পুকুরে নেমে সাঁতার কাটতো, আম্মাই তাকে সাঁতার কাটতে শিখিয়েছিল। আজ সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে—সেই ঘাট, পুকুর পাড়ের গাছগুলো, এমন কী পুকুরের যে মাছগুলোকে সে আম্মার সাথে রোজ খাবার দিতো—সেই মাছগুলো আগের মতো নীরবে তার চারপাশে সাঁতার কেটে ঘুরতে লাগল, একজন শুধু নেই—আম্মা। একথা ভাবতেই ওমরের ছোট্ট মন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।

—একা একা কী করছিস ওমর?

দাদির ডাকে ওমরের ভাবনাগুলো মুহূর্তে কাঁচের টুকরোর মতো ভেঙে গেল।
—কিছু না, দাদি; এমনি বসে আছি।

—বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল, নে দেখি, গোসল করেনে।

—দাদি, আম্মা আর আসবে না?

—না, বাবা; যারা একবার চলে যায়, তারা আর ফিরে আসে না—এটাই দুনিয়ার নিয়ম।

ওমরের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে দাদি তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।

আম্মা বেঁচে থাকতে প্রতিদিন ভোর বেলা ফজরের নামাজ শেষে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে আরবী ও ফার্সি তালিম নিয়ে, বাড়িতে এসে বিভিন্ন প্রশ্নবাণে আম্মাকে জর্জরিত করে ফেলতো ওমর; আর আম্মা সব সময় তার সকল প্রশ্ন অতি মনোযোগ সহকারে শুনে, যতটুকু সম্ভব উত্তর দেবার চেষ্টা করতো। আসলে আম্মাই ছিল ওমরের সকল প্রশ্নের শেষ সমাধান; ওমরের মনে প্রশ্ন ছিল প্রচুর এবং কৌতুহল ছিল অপার। সব প্রশ্নের উত্তর যে আম্মার জানা ছিল তা নয়, আর উত্তর ওমরকে দিতেই হবে তা ও নয; প্রশ্ন করতে পারাটাই ওমরের কাছে ছিল মুখ্য। শত শত প্রশ্নের ভিড়ে ওমরের একটা প্রশ্নের উত্তর আম্মা খুব ভালো করেই জানতেন, কিন্তু ওমরের নির্মল মনে তার আব্বা সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি হবে তাই স্বজ্ঞানে বিলকিস বানু সব সময় প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতেন; প্রশ্নটি হচ্ছে—রোজ রাতে আব্বা কুমোর পাড়ায় যায় কেন?

আসলে অজানাকে জানার প্রতি ওমরের যে অদম্য কৌতুহল তার খবর একমাত্র আম্মাই রাখতো; হয়তো আম্মা জানতো তার মনের সমস্ত কৌতূহল মসজিদের ইমাম সাহেবের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়, তাই ওমরের জ্ঞানের দরজা খুলে দিতেই মৃত্যুর আগে তাকে ঘর ছাড়ার উপদেশ দিয়ে গিয়েছেন বিলকিস বানু; হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার মৃত্যুর পরে এই বাড়িতে ওমর তার প্রাসঙ্গিকতা হারাবে, সে অবহেলার শিকার হবে—আসলে মায়ের মন অনেক কিছুই আগাম অনুমান করতে পারে।

গ.
প্রায় দশ বিঘা জমির ওপর বিশাল ভিটে বাড়ি দরমুজ খাঁর; মুরাদনগর গ্ৰামে একমাত্র পাকা ইটের দালানের মালিক আর কেউ নন, স্বয়ং দরমুজ খাঁ। গ্ৰমের শেষ মাথায় একাকী একটি বাড়ি; কিন্তু বাড়িটি দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে আভিজাত্য ও ঐশ্বর্যের সংগা কী? দরমুজ খাঁর বাড়ি থেকে কিছু দূরে গ্রামের একমাত্র মসজিদ; তার উদ্যোগে তৈরি হয়েছে এই মসজিদ; মসজিদের খরচের সিংহভাগ তিনি বহন করেন। মসজিদের পিছনে বিল, বিশাল সেই বিলের শেষে ধলেশ্বরী নদীর বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে কুমোর পাড়া। সমস্ত শীতকাল জুড়ে নদীর ওপারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এক-একটা বৈরাগীর দল কুমোর পাড়ার আসে, কিছুদিন থাকে, তার পর চলে যায়; আর যতো দিন থাকে ততোদিন প্রতিটি রাতে গান-বাজনা, আর মদিরার আসরে মাতোয়ারা হয়ে থাকে কুমোর পাড়া। কুমোর পাড়ার এই রাতের আসরের মধ্যমণি আর কেউ নয়—প্রবল প্রতাপশালী দরমুজ খাঁর একমাত্র পুত্র হুমায়ূন খাঁ। দরমুজ খাঁ তার ছেলেকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে বহু চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সবই বৃথা—কিছুতেই হুমায়ূন কে এই পথ থেকে ফেরানো যায়নি, এমনকি বিলকিসের মৃত্যুও তা পারেনি।

আসরের নামাজ শেষ; মসজিদে অল্প যে কয়জন মুসল্লী ছিল সবাই বাড়ি চলে গেছে; খান সাহেবের ওঠার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, তিনি চিন্তিত মনে বসে আছেন। ইমাম সাহেব পাশে এসে বসলেন।
—বাড়ি যাবেন না খান সাহেব?

—দেখতে দেখতে মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে যাবে—একেবারে নামাজ পড়েই যাই।

—আপনাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে!

—চিন্তার কী আর শেষ আছে ইমাম সাহেব—ছেলেটার সংসারে মন নেই, ওমরেরই বা কী হবে? ছেলেটা ওর আম্মার মতো খুব চাপা স্বভাবের; কাউকেই কিছু বলে না; কষ্ট হলেও নিজে সহ্য করবে, তবু কিছু প্রকাশ করে না। এই অল্প বয়সে আম্মার মৃত্যু শোক ওমর কীভাবে সামলাবে—এই কথা ভাবলেই আমার আর কিছু ভালো লাগে না, ইমাম সাহেব।

—আপনার ব্যথা আমি বুঝতে পারছি, আমারও অল্প বয়সে আমার আম্মা ইন্তেকাল করেছেন; ওমরের মনের অবস্থা আমার চাইতে ভালো আর কে অনুধাবন করতে পারবে? তবে কী জানেন খান সাহেব—সব মহান আল্লাহর ইচ্ছা; আপনি চিন্তা করবেন না, আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন।

—সে তো অবশ্যই; কিন্তু কী জানেন? মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়ে হুমায়ূনের আম্মাকে নিয়ে মক্কায় চলে যাই।

—খান সাহেব, বাবা হুমায়ূনকে কি কোনো ভাবে কুমোর পাড়ায় যাওয়া আটকানো যায় না?

—ইমাম সাহেব, চেষ্টা তো অনেক করলাম, কিন্তু তাতে তো কোনো লাভ হলো না। যে রাতে বউটা মারা গেল, সেই রাতেও তো ছেলেটা কুমোর পাড়ায় ছিল।

—আমি বলি কী, হুমায়ূনকে আর একটা বিয়ে দিয়ে দেন।

—হাতে করে যাকে আনলাম, চোখের সামনে দিয়ে সে চলে গেল; আবার আর একটা মেয়ের জীবন নিয়ে টানাটানি করবো? তাছাড়া হুমায়ূনের নতুন বউ যদি ওমরকে মেনে না নেয়, তখন কী হবে?

—খান সাহেব, এতো চিন্তা করবেন না; ওমরকে আল্লাহ রক্ষা করবেন। আপনার পোতা খুব মেধাবী, এবং ওর সহ্য শক্তি অনেক; একটা না একটা ব্যবস্থা ওর হবেই। অতো চিন্তা না করে আমার মনে হয় বাবা হুমায়ূনকে আবার বিয়ে করিয়ে দেন—আল্লাহ চায় তো এবার ভালো হতেও পারে।

মুয়াজ্জিন সাহেব আযান দিচ্ছেন, কথা এখানে শেষ করে দুজনেই উঠে নামাজ পড়তে চলে গেলেন।

ঘ.
জোছনা রাত। কুমোর পাড়ার সর্দার ভূবন পালের উঠানে বসেছে গানের আসর; গত সপ্তাহে বৈরাগীদের একটি দল এসেছে নদীয়ার ওই দিক থেকে; মূলত তারাই জমিয়ে রেখেছে এই রাতের রহস্যময় চঞ্চলতা। জোয়ারের জলে ফুঁলে উঠেছে ধলেশ্বরী; নদীর তীরে বাঁধা নৌকাগুলো উঠান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন আকাশে ভাসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে এই কুমোর পাড়ার যোগাযোগের একমাত্র পথ হচ্ছে এই ধলেশ্বরী। উত্তরের হিমালয় থেকে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী হিসেবে নাচতে নাচতে দক্ষিণে বিভিন্ন ভাটি অঞ্চলের বুক চিরে, কুমোর পাড়ার পাশ দিয়ে বাঁক নিয়ে চলে গেছে এই নদী। আরও বহু জনপথ মাড়িয়ে অবশেষে মিলিত হয়েছে সমুদ্রের সাথে—দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন, কাঁধে হাত দিয়ে কুমোর পাড়াকে আগলে রেখেছে ধলেশ্বরী। এই নদী পথ দিয়ে দূর-দূরান্তের গ্রামে পৌঁছে যায় কুমোর পাড়ার যাবতীয় মাটির জিনিস-পত্র; আবার মাটির তৈজসপত্র বানাবার উপযুক্ত পলিমাটির যোগানদাতা এই নদী—কুমোর পাড়ার রক্ত নালী ও প্রাণের স্পন্দন এই নদী, তাই কুমোর পাড়ার দিন শুরু হয় এই ধলেশ্বরীকে প্রণাম করে।

পঁচানো পান্তা ভাত দিয়ে বিশেষ উপায়ে ঘরে বানানো চোলাই মদ হচ্ছে রাতের আসরের আবেগের জ্বালানী। খেজুর পাতার চাটাই এর উপরে বসে সবাই তন্ময় হয়ে সরমা বোষ্টমির গান শুনছে। মদিরায় পূর্ণ পান পাত্র হাতে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে হুমায়ূন; কিসে মগ্ন সে—সুরে নাকি সুরায়—বোঝার কোনো উপায় নেই। একতারা হাতে হেলেদুলে মায়াবী সুরের জাদুতে সবাইকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে সরমা; জোছনার নরম রূপালি আলো ও একতারার মধুর মূর্ছনার সাথে গভীর আবেগ ঢেলে দিয়ে সরমা গাইছে—
‘যৌবন আমার পথে গেল ধুলায় আমার বাস,
সুখের লাগিয়া ঘুরি—আমার দুঃখ বারো মাস।
একতারাতে দুঃখ জানি একতারাতেই সুখ
নাগর আমায় ডাকে, তবু কেন জলে ভাসে বুক।’

সরমা শুধু সুন্দরী নয়—সে পরমা সুন্দরী; দীঘল কালো চুল মাথার উপরে পর্বত চূড়ার মতো উঁচু করে বাঁধা, লাল পাড়ের সাদা শাড়ি ও সাদা কটি বন্ধনি ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে তার জ্বলন্ত যৌবন; যেন মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে প্রগাঢ় পূর্ণিমা। গায়ের রং দুধে আলতা, তার চঞ্চলা চোখের চোরা চাহনিতে বহু পুরুষ পতঙ্গ আত্মাহুতি দিয়েছে, আরও কতো শত দেবে তার হিসেব রাখার কোনো তাগাদা কোনো কালে অনুভব করেনি সরমা। কারণ, সে মুক্ত বিহঙ্গিনী, ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোই তার সৌন্দর্য ও সার্থকতা; কোনো প্রাসাদের সোনার পিঞ্জিরায় সুন্দরী সরমাকে মানাবে না।

এই জোছনা সুন্দর, কিন্তু তার চেয়েও বেশি সুন্দর রক্ত-মাংসের অপরূপ সরমা; জোছনার আবির মাখা রাত যতো গভীর হতে থাকে— তার সাথে তাল মিলিয়ে ততোই উদ্ভাসিত হতে থাকে সরমার সৌন্দর্য। জোছনায় হুমায়ূনের চোখে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার; মায়াবিনী ও মদিরার মায়ায় সে ভুলে গেছে তার বর্তমান; তার কাছে এখন পৃথিবীর কোনো অস্তিত্ব নেই—আছে শুধু নাগিনীর মতো দুলতে থাকা সুন্দরী সরমার।

—সরমা, আমার সাথে চলো, আমি তোমাকে রাজরানী করে রাখব।

—কেন মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছিস খান সাহেবের বেটা?

—এটা মিথ্যা নয়, সত্যি আমি তোমার জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেবো।

—আমাকে হাসালি বাবু—তাহলে তোর বউটা বিনা চিকিৎসায় মরে গেল কেন? সে রাতেও তো তুই এখানে বসে মদ গিলে ছিলি।

মুহূর্তে হুমায়ূনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল; কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে সে খুব ক্ষীণ স্বরে বললো,—’বিলকিস তো আমাকে বেঁধে রাখতে পারেনি।

—আমিও পারবো না, বরং আমাকে তুই ঘরে তুলতে পারলে—তখন অন্য এক সরমার সামনে বসে মদ খাবি, পুরুষরা এমনই হয় বাবু।

সরমা যতই হাসতে হাসতে হেঁয়ালি করেই বলুক না কেন, হুমায়ূনের জন্য কথাটা শতভাগ সত্য। ভূবন খুঁড়ো উঠে এসে হুমায়ূনের পাশে বসলো, বয়স তার হুমায়ূনের বাবার মতো। হুমায়ূনের গায়ে তিনি হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,

—’এসব থাক ছোট কর্তা, এমনিতে খান সাহেব আমাদের উপরে নাখোশ; তার ওপর তুমি যদি সরমাকে নিয়ে বাড়ি যাও, তবে খান সাহেব রাগে আমাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে—তুমি কি চাও আমরা সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে যাই?

—না, কাকা; আমি তা চাই না।

—তবে ছেলে মানুষী করো না; বাড়ি যাও, ভোর হয়ে গেছে।

ভোরের আলো ফুটে উঠেছে; ধলেশ্বরী নদীতে লেগেছে ভাটার টান; উঠান থেকে এখন আর সেই নৌকা দেখা যাচ্ছে না, নদীর জল অনেক নিচে নেমে গেছে।

সকালের খাবার খেয়ে খান সাহেব উঠানে একটি খাটিয়ায় বসে মিষ্টি রোদ উপভোগ করছেন; গুলবাহার বানু কাজের লোকদের নিয়ে রান্নাঘরে ব্যস্ত, সেখান থেকে জিনিস-পত্রের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। খান সাহেব গলা উঁচু করে বললেন,—’হুমায়ূনের মা, তোমার ছেলে কি ফিরেছে?’

গুলবাহার বানু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে খান সাহেবের সামনে দাঁড়ালেন।

—ঘরের দরজা তো বন্ধ দেখলাম।

—ওমর কোথায়?

—মসজিদ থেকে এসে, খাওয়া দাওয়া করে বন্ধুদের সাথে বিলে খেলতে গেছে।

—কাউকে পাঠিয়ে দেখো তো হুমায়ূন ঘরে আছে কিনা?

—পাঠাচ্ছি।

গুলবাহার বানু রান্নাঘরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে হুমায়ূন একটি বেতের মোড়া নিয়ে আব্বার সামনে এসে বসলো। আব্বার গম্ভীর মুখ দেখে সে অনুমান করতে লাগল—নিশ্চই কোনো জরুরি বিষয়ে আলাপ করার জন্য তাকে ডাকা হয়েছে; নয়তো এই সাত সকালে তাকে ঘর থেকে ডেকে আনার কথা নয়।

—হুমায়ূন, আমার ছেলে হয়ে তুমি যা করে বেড়াচ্ছো, তা তে মানুষের কাছে আমার মান সম্মান থাকছে না।

হুমায়ূন কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে বসে আছে; কারণ বলার মতো তার কিছু নেই—সন্তান হিসেবে সে অপদার্থ, আর পিতা হিসেবে সে ব্যর্থ।

—নিজের ছেলেটাকে একটু সময় দিলে তো পারো; মা মরা ছেলেটা সারাদিন চুপচাপ থাকে—আমার খুব কষ্ট হয় ওমরের জন্য।

তবুও হুমায়ূন নিশ্চুপ, পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে।

—কাল ফজরের নামাজের পরে ইমাম সাহেবের সাথে মাটি ভাঙা গ্ৰামে যাবে; ওখানে আমার বন্ধু কলিমুল্লাহ খান থাকে, তার বাড়িতে যাবে।

—কেন, আব্বা?

—কলিমুল্লাহর ছোট মেয়ে মেহের বানুর সাথে তোমার নিকাহ ঠিক করেছি আমি।

—কিন্তু আব্বা।

—কোনো কিন্তু নেই, যা বলেছি তাই করো।

আব্বার সাথে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল হুমায়ূন।

ঙ.
ধান কাটা শেষ; বিশাল বিল এখন ফাঁকা মাঠের মতো। বছরের এই সময় গ্রামের ছেলেরা বিলে বিভিন্ন প্রকার খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে সারাদিন। ওমর তার প্রিয় বন্ধু রহিমকে নিয়ে বিলের কিনারে বসে ঘোড়ার দৌড় উপভোগ করছে; রহিমের আব্বা ওমরদের জমি বর্গা চাষ করে, তার নিজেরও কিছু জমি আছে। কয়েক জন বন্ধু মিলে মোরগ যুদ্ধ খেলছে; খেলার জন্য সবাই ওমরকে ডাকছে; কিন্তু বসে বসে খেলা দেখতে ওমরের ভালো লাগছিল, তাই সে খেলতে না গিয়ে রহিমকে নিয়ে বসে আছে। বছরের এই সময় বিলের আশপাশের গাছ-পালায় প্রচুর পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে; তাদের সম্মিলিত কোলাহল আসন্ন শীতের নিষ্প্রাণ প্রকৃতিতে প্রাণের সঞ্চার করে।

—রহিম, আমার না অনেক দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করে।

—কোথায়।

—তা তো জানি না।

—তবে কোথায় যাবে, আর কীভাবে যাবে?

—আম্মা নেই, আমাকে আদর করার কেউ নেই; এখানে আমার আর ভালো লাগে না।

—চলো, আমিও তোমার সাথে যাবো; খুব মজা হবে।

—না, তোমার যাবার দরকার নেই; তাছাড়া তুমি চলে গেলে তোমার আম্মা তো কাঁদবে।

—কিন্তু তুমি চলে গেলে আমার ভালো লাগবে না; আর তোমার জন্যও তো সবাই কাঁদবে।

—না, আমার জন্য কেউ কাঁদবে না।

এই ভাবে খেলা আর গল্পে দুপুর হয়ে গেল, বাড়ির পথে পা বাড়ালো দুই বন্ধু। ওমর মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে, বাড়ি ছেড়ে সে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে; কিন্তু যেটা এখনো ঠিক করতে পারেনি, তা হলে—কোথায় এবং কখন?

গত দুইদিন আগে ইমাম সাহেবের সাথে হুমায়ূন মাটিডাঙ্গা গ্রামে গেছে, এখনো ফেরেনি। দাদা-দাদির ঘরে ছোট একটা খাটে রাতে ওমরের শোবার ব্যবস্থা হয়েছে—যদি তার ভয় লাগে, তাই। আগে ওমর আম্মার ঘরে ঘুমাতো; কারণ, অধিকাংশ রাতেই তার আব্বা বাড়ি থাকতো না। এখন আম্মা বেঁচে নেই—রাত দিন সব সময় ওমর এখন আক্ষরিক অর্থে একা। ওমর ঘুমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু ঘুম আসছে না; তাই সে জানালার দিকে তাকিয়ে অনেক কিছুই ভাবছে—যার কোনো কূল কিনারা নাই। দাদিকে সে জিজ্ঞাসা করল,—’দাদি, আব্বা কোথায় গেছে?’

—তোর জন্য নতুন আম্মা আনতে গেছে, ওমর।

—নতুন আম্মা কেন?—আমার আম্মা আর আসবে না?

—না, ওমর; তোর আম্মা বেহেস্তে চলে গেছে, আর যারা একবার বেহেস্তে চলে যায়, তারা আর ফিরে আসে না।

এতো কিছু বোঝার ক্ষমতা ওমরের এখনো হয়নি; সে শুধু ভাবছে আম্মাকে ছাড়া সে কীভাবে বাঁচবে; ভাবতে ভাবতে তার দুই চোখ দিয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে; অথচ দাদা-দাদি তা টেরও পেলেন না।

সকালে হুমায়ূন নতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে; দাদি নতুন বউ বরণ করা নিয়ে ব্যস্ত; পাড়া পড়শীদের ভিড়ে ওমর এক প্রকার হারিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর উঠানের এক কোণে ওমরকে পেয়ে দাদি বললেন,—’ওমর চল, তোর নতুন আম্মাকে সালাম করবি।’

যন্ত্রের মতো দাদির পিছনে পিছনে এসে আব্বার নতুন বউ মেহের বানুর সামনে দাঁড়ালো ওমর; দাদি পরিচয় করিয়ে দিতেই ওমর সালাম দিলো; কিন্তু মেহের বানুর শীতল চাহনির শীতল প্রতিক্রিয়ায় দাদি বেশি কিছু বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। আসলে গর্ভের সন্তানের প্রতি মাতৃস্নেহ প্রদর্শন নারী হৃদয়ের একটি স্বাভাবিক অনুভূতি, কিন্তু অন্যের সন্তানকে মাতৃস্নেহে কাছে টেনে নিতে প্রয়োজন স্বাভাবিকতার উর্ধ্বে এক অতিমানবিক গুণাবলী—প্রথম দর্শনেই ওমরের প্রতি সেই স্নেহ দেখাতে ব্যর্থ হলেন মেহের বানু।

সমস্ত সামাজিকতা সম্পন্ন করে নতুন আম্মাকে বরণ করে ঘরে তুলতে অনেক ধকল সামলাতে হয়েছে দাদির, তাই ক্লান্ত হয়ে আজ একটু আগেই শুয়ে পড়লেন তিনি। সারাদিন গভীর মনোযোগ সহকারে ওমর খেয়াল করেছে তার পিতার দ্বিতীয় বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা। তার জীবনে এটা এক নতুন অভিজ্ঞতা; কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সে তার আব্বার জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে নিজের কোনো স্থান খুঁজে পেলো না; হঠাৎ এখানে আজ তার নিজেকে মনে হলো— অচ্ছুত, অনাহুত এবং আগুন্তক।

গভীর রাত, কিন্তু ওমরের চোখে ঘুম নেই;; সে তার আম্মার কথা ভাবছে। মৃত্যুর আগে আম্মার দেওয়া শেষ উপদেশের কথা ভীষণভাবে অনুভব করতে লাগল সে—তাকে বিদ্যা অর্জন করতে হবে, প্রয়োজনে বাড়িও ছাড়তে হবে; কারণ, এখানে থাকলে সে-ও পিতার মতো আর এক পাষণ্ডে পরিণত হতে পারে। অথবা আম্মা আগেই অনুমান করেছিলেন আব্বার দ্বিতীয় বিয়ের কথা। বাড়ির প্রতি ওমরের মায়া উঠে গেছে—এখানে ওমরের কোনো স্থান নেই, তাই বাড়ি ছাড়লেও তার দুঃখ পাবার কিছু নেই; বরং আম্মার শেষ উপদেশ রক্ষা করার জন্য হাসি মুখে সে এখন বাড়ি ছাড়তে প্রস্তুত।

খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে ওমর; জানালার বাইরে শেষ রাতের সেই আলো আর আঁধারের চিরায়ত খেলা শুরু হয়ে গেছে; যে খেলা সে প্রথম দেখেছিল আম্মার মৃত্যু শয্যার পাশে বসে। আঁধারের বুক চিরে আলো ফুটতে শুরু করেছে, স্পষ্ট হতে আরম্ভ করেছে প্রকৃতির অবয়ব। হঠাৎ ওমরের মনে হলো—হয় এখন, অথবা কখনোই নয়। দাদা-দাদির যাতে ঘুম না ভাঙ্গে—সন্তর্পণে বিছানা থেকে নেমে, গায়ে একটি চাদর জড়িয়ে নিঃশব্দে বাইরে বের হয়ে গেল ওমর। কেউ টের পেলো না, বারো বছরের বালক ওমর চিরদিনের জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension