
আদালতের নির্দেশে মুক্তির পরও অভিবাসীদের পুনরায় গ্রেপ্তার করছে ICE
আদালতে আইনি লড়াইয়ে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও আটক—যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অন্তত ২০টি ঘটনার তথ্য প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান
হোসনেআরা চৌধুরী :
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিষয়ক আইনি লড়াইয়ে আদালতের নির্দেশে মুক্তি পাওয়ার পরও অভিবাসীদের পুনরায় গ্রেপ্তার করছে দেশটির অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (ICE)। এতে আদালতের নির্দেশনা মানা, আটক ব্যক্তিদের আইনি অধিকার এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০টি এমন ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে ফেডারেল আদালতে আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে মুক্তি পাওয়ার পর অভিবাসীদের আবারও আটক করা হয়েছে।
আদালতের নথি, আইনজীবীদের সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
অভিবাসীরা সাধারণত Habeas Corpus নামের আইনি আবেদনের মাধ্যমে সরকারের কাছে তাঁদের আটক রাখার আইনগত ভিত্তি চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। এ ধরনের আবেদনের মাধ্যমে আদালতের কাছে আটক ব্যক্তির মুক্তি চাওয়া হয়।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে প্রোপাবলিকার গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, অভিবাসীরা এ পর্যন্ত ৯১ হাজারের বেশি হেবিয়াস করপাস আবেদন করেছেন। ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারির পর দায়ের করা আবেদনের সংখ্যা আগের তিনটি প্রেসিডেন্ট প্রশাসন—এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সম্মিলিত সময়ের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশের পরও পুনরায় আটক
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি ঘটনায় ৭৭ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নাগরিক আকরাম মাহমুদ ওমরের কথা উঠে এসেছে। লুইজিয়ানায় ICE-এর একটি আটককেন্দ্রে থাকা অবস্থায় তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। আদালতে আবেদনের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়ার মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তাঁকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মিনেসোটায় আরও সাতজন অভিবাসীকে আদালতের নির্দেশে মুক্তি দেওয়া হলেও মিনিয়াপোলিসের কাছে হুইপল ফেডারেল বিল্ডিংয়ের আটককেন্দ্র থেকে বের হওয়ার আগেই ICE কর্মকর্তারা তাঁদের পুনরায় আটক করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিবাসীদের পক্ষে কাজ করা আইনজীবীদের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ ফেডারেল আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
লুইজিয়ানার আরেকটি ঘটনায় ইব্রাহিম মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তিকে ICE তিনবার পুনরায় আটক করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় একজন ফেডারেল বিচারক অভিবাসন কর্তৃপক্ষের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং ওই ব্যক্তির মুক্তির নির্দেশ দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেনসিলভানিয়া ও মিনেসোটার কয়েকজন ফেডারেল বিচারকও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার পদক্ষেপ নিয়েছেন অথবা এমন পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তৃতীয় দেশে নির্বাসন নিয়ে উদ্বেগ
আইনজীবীদের ধারণা, পুনরায় গ্রেপ্তারের কিছু ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের তৃতীয় দেশে অভিবাসী বহিষ্কারের নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই নীতির আওতায় যেসব অভিবাসীকে তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো আইনগতভাবে সম্ভব হচ্ছে না, তাঁদের অন্য দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিবাসীদের নাগরিকত্ব কিংবা পূর্বপরিচিত সম্পর্ক নাও থাকতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজ দেশের পরিবর্তে তৃতীয় দেশে ২৫ হাজারের বেশি অ-নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ নতুন দেশে নির্যাতন বা নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরা।
গত সেপ্টেম্বরে একটি আপিল আদালত তৃতীয় দেশে বহিষ্কারের আগে অভিবাসীদের যথাযথ নোটিশ দেওয়া এবং সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট জরুরি স্থগিতাদেশ জারি করায় আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন বহিষ্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
বাড়ছে আইনি লড়াই
অভিবাসীদের আইনজীবীরা এখন আদালতের কাছে আরও সুরক্ষা চাইছেন। এর মধ্যে রয়েছে আটক ব্যক্তিদের অন্যত্র স্থানান্তর বা বহিষ্কারের আগে আগাম নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ।
পুনরায় গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় কিছু আইনজীবী নতুন করে হেবিয়াস করপাস আবেদন প্রস্তুত করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন আটকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ফেডারেল আদালতগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে লুইজিয়ানা ও টেক্সাসে অনেক মামলা নিষ্পত্তি হতে কয়েক মাস সময় লাগছে।
আদালতের নির্দেশে মুক্তি পাওয়ার পরও পুনরায় গ্রেপ্তারের এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি, বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব এবং আটক অভিবাসীদের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ২ নভেম্বর ২০২৬।



