যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কাল: কঠিন পরীক্ষার মুখে ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র এক দিন বাকি। জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করছে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ওপর। সর্বশেষ জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর ফলই ঠিক করে দিতে পারে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে।

আগামীকাল মঙ্গলবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই ভোট গ্রহণ হবে। আর সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে নির্বাচন হবে ৩৫টিতে। এর মধ্যে ৩৩টি আসনে নিয়মিত নির্বাচন হবে। বাকি দুটি আসনে বিশেষ নির্বাচন। নির্বাচন ঘিরে দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি, নাকি বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে থাকবে– তা এ নির্বাচনে নির্ধারণ হবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের ভোট শুধু কংগ্রেসের আসন দখলের লড়াই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন যাচাইয়েরও পরীক্ষা।

জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে

রিয়েলক্লিয়ারপোলিংয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ, আর রিপাবলিকানদের ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২৮ ও ২৯ অক্টোবর পরিচালিত টিএইচপি/এমএমের জাতীয় জরিপে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন পাওয়া গেছে ৫৪ শতাংশ, আর রিপাবলিকানদের ৪১ শতাংশ। ২৪ থেকে ২৬ অক্টোবর পরিচালিত এমারসন কলেজের একটি জরিপেও ডেমোক্র্যাটরা ১০ শতাংশীয় পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনমত জরিপ বিশেষজ্ঞ ন্যাটালি জ্যাকসন আলজাজিরাকে বলেন, জরিপের ফলাফল থেকে ট্রাম্পের প্রতি জনগণের অসন্তোষ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। জনমত জরিপে এমন একটি পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যা ডেমোক্র্যাটদের জন্য বেশ অনুকূল।

তিনি আরও বলেন, উচ্চমূল্যের চাপে ভুগছেন মার্কিনিরা। শুল্কনীতি ও ইরানের যুদ্ধের কারণে এই ব্যয় আরও বেড়েছে। সাধারণভাবে মানুষের ধারণা, গত দুই বছরে রিপাবলিকানরা তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। তবে জাতীয় পর্যায়ের জরিপের সঙ্গে পৃথক আসনের ফলাফলের পার্থক্য থাকতে পারে বলে মনে করেন জ্যাকসন। বিশেষ করে সিনেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে জরিপের ভুলের কারণে ফলাফল বদলে যেতে পারে।

কানসাসে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্ট-শার স্কুলের জরিপে হ্যামিলটনের সমর্থন ৫২ শতাংশ এবং মার্শালের ৪৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এমারসন কলেজের আরেকটি জরিপে হ্যামিলটনের সমর্থন ৫০ শতাংশ এবং মার্শালের ৪৭ শতাংশ পাওয়া গেছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট-শার স্কুলের জরিপে দুই প্রার্থীর মধ্যে ৯ শতাংশীয় পয়েন্টের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও দলটির জাতীয় কমিটির সাবেক যোগাযোগ পরিচালক ডগ হেই।

প্রচারের শেষ মুহূর্তে অর্থনীতি প্রধান ইস্যু

নির্বাচনের আগে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে সামনে আনছে দুই দলই। ডেমোক্র্যাটরা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে টেলিফোনের মাধ্যমে নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন ট্রাম্প।

ডগ হেইয়ের মতে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়নে রিপাবলিকানদের নীতি কার্যকর হবে– ভোটারদের কাছে এমন বিশ্বাসযোগ্য বার্তা পৌঁছে দিতে দলটি হিমশিম খাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে রিপাবলিকানরা ভোটারদের আকৃষ্ট করার মতো কোনো জোরালো বার্তা দিতে পেরেছেন কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, তারা পারেননি। এটিই তাদের বড় চ্যালেঞ্জের একটি।’ হেইয়ের মতে, জ্বালানির দাম, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যসহ দৈনন্দিন ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের জবাব দিতে হবে প্রার্থীদের।

মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সাইয়েদের প্রচারে কাজ করছেন দলটির কৌশলবিদ ও জনমত জরিপ বিশেষজ্ঞ সেলিন্ডা লেক। তাঁর মতে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা কী করবেন, সে বিষয়েও ভোটারদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে দলটিকে।

আইওয়া ও কানসাসে ট্রাম্প, মিশিগানে এল-সাইয়েদ

গতকাল রোববার আইওয়া ও কানসাসে নির্বাচনী সমাবেশ করেন ট্রাম্প। শুরুতে তিনি এই দুটি কর্মসূচি বাতিল করলেও শুক্রবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। আইওয়ায় রিপাবলিকান প্রতিনিধি অ্যাশলির সঙ্গে প্রচারে অংশ নেন ট্রাম্প। অ্যাশলির প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জশ তুরেক। কানসাসে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার লড়াইয়ে থাকা সিনেটর রজার মার্শালের প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাডাম হ্যামিলটন।

ট্রাম্পের সমাবেশ বাতিলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে হেই বলেন, ‘শুরুতেই এই সমাবেশগুলো বাতিল করা উচিত হয়নি। এগুলো কাজে আসুক বা না আসুক, ট্রাম্প যে তাঁর প্রার্থীদের জেতাতে মাঠে নেমেছেন, তা দেখানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই সহায়ক।’

এদিকে, মিশিগানের ডেট্রয়েট ও সাউথফিল্ডে প্রচারে আছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ। সিনেট নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন ন্যাটালি জ্যাকসন। তবে সিনেটের ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন বলে মনে করেন তিনি। জ্যাকসন বলেন, ‘প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে– এ বিষয়ে আমরা মোটামুটি আত্মবিশ্বাসী হতে পারি। তবে সিনেটের চিত্র এখনও অস্পষ্ট।’

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে মিশিগান, টেক্সাস, কানসাস, আইওয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা ও আলাস্কার আসনগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডগ হেইয়ের মতে, সিনেট নির্বাচনের ফল অনুমান করা তুলনামূলক কঠিন। কারণ, এসব নির্বাচনে রাজ্যভিত্তিক পরিস্থিতি, প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী প্রচারের প্রভাব অনেক বেশি।

পাঁচ কোটির বেশি আগাম ভোট

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতোমধ্যে পাঁচ কোটির বেশি মার্কিন নাগরিক ভোট দিয়েছেন। ডাকযোগে আগাম ভোট দেওয়া কিংবা মঙ্গলবার সরাসরি ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে ভোটারদের উৎসাহিত করছে দুই দলই। তবে আগাম ভোটের সংখ্যা দিয়ে নির্বাচনের বিজয়ী নির্ধারণ করা যায় না। কারণ, ভোটাররা কাকে ভোট দিয়েছেন, তা শুধু আগাম ভোটের পরিসংখ্যান থেকে জানা সম্ভব নয়।

সেলিন্ডা লেকের মতে, নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভোটার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ট্রাম্প কি সত্যিই রিপাবলিকান ভোটারদের উজ্জীবিত করতে পেরেছেন? ডেমোক্র্যাটরা কি রেকর্ডসংখ্যায় ভোট দিতে আসবেন?’

কখন জানা যাবে ফলাফল?

মঙ্গলবার ভোট গ্রহণ শুরু হবে। ওই দিন সন্ধ্যায় ভোটকেন্দ্রগুলো বন্ধ হতে শুরু করলে প্রাথমিক ফলাফল আসতে পারে। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কয়েকটি আসনের ফল জানতে আরও সময় লাগতে পারে।

নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বুঝতে ইন্ডিয়ানা ও কেন্টাকির প্রাথমিক ফলাফলের দিকে নজর রাখবেন বলে জানিয়েছেন ডগ হেই। এই দুই রাজ্যে সবার আগে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার কথা। তবে ন্যাটালি জ্যাকসন সতর্ক করে বলেছেন, সিনেটের পৃথক আসনগুলোর প্রকৃত ফলাফল জনমত জরিপের পূর্বাভাস থেকে ভিন্ন হতে পারে। খবর আলজাজিরা ও সিএনএনের।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension