
‘ঘাসফড়িং’- একটি স্বপ্নর বাস্তবায়ন
সাজিয়া আফরিন
লেখাপড়া শেষ করার পর একটা সমবায় ব্যাংকে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর সুযোগ হল বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার। ব্যাংকের চাকরিতে ঢোকার পর বুঝতে বেশি সময় লাগল না যে, মেয়েরা সবখানেই শারীরিক এবং মানসিকভাবে নির্যাতিত।
মেয়েদের প্রতি এমন মানসিকতা ভালো লাগেনি বলেই সেদিন কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্তেই চাকরি ছেড়ে চলে এসেছিলাম। আর তখনই সিদ্ধান্ত নিই এ ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমি কাজ করব।
চারদিকে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের খবরগুলো আমাকে খুব ভাবাত। এর মাঝেই বগুড়ায় দেড় বছরের শিশু ধর্ষন ও হত্যার ঘটনাটি আমাকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছিল। এই নির্যাতনগুলোর বিরুদ্ধে তখন কিছু একটা করবার কথা চিন্তা করতে শুরু করি। কিন্তু একার পক্ষে কিছু করাটাও ছিল অনেক কঠিন।
‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’- রবীন্দ্রনাথের গানের এই লাইনটিতে ভীষণভাবে প্রভাবিত আমি। আমি বিশ্বাস করি শুধু মনোবল আর আত্মবিশ্বাস থাকলে একাই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব। আর তাই শুধু এইসব নির্যাতিত শিশুদের কথা মাথায় রেখেই নিজের উদ্যোগেই শুরু করি ‘রিহ্যাবিলিটেশন ফর অ্যাবিউসড চাইল্ড’, সংক্ষেপে ‘আরএসি’য়ের কাজ। বগুড়ায় পুরোপুরি ব্যক্তিগত উদ্যোগেই গড়ে ওঠা একটি সংস্থা ‘আরএসি।’ সংস্থাটি নির্যাতিত,অসহায় শিশুদের জন্য বিভিন্নরকম কাজ করে চলেছে।
একটা শিশুকে ৬-৭ বছর বয়স থেকেই চেনাতে হবে তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো সম্পর্কে। যে অংশগুলোতে রয়েছে শুধু তার এবং একান্তই নিজের অধিকার। কোনটা গুড টাচ, কোনটা ব্যাড টাচ সেটা বোঝাতে হবে। কাজ করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম আমাদের দেশের বেশির ভাগ পরিবারে শিশুদের এসব বিষয়ে জানানো বা শেখানো হয় না। অথচ নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে হলে প্রথমেই নিজেকে অথবা পরিবারকেই সচেতন হতে হবে, জানতে হবে কোনগুলো নির্যাতন, কোন ধরনের নির্যাতনের ক্ষেত্রে কোথায় জানাতে হবে। আর সে কারণেই আরএসি বিভিন্ন স্কুলের শিশুদের মাঝে শিশু যৌন নির্যাতন কি, এর প্রতিকার এবং প্রতিরোধ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে চলেছে।
মেয়েরা বয়ঃসন্ধিকালের বিভিন্ন সমস্যার কথা তাদের পরিবারের কাছে বলতে পারে না। গ্রামের কন্যাশিশুরা এই সময় সঠিক পরামর্শ বা চিকিৎসা সুবিধা পায় না। এই বিষয়টির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে আরএসি স্কুলে-স্কুলে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞর মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার পাশাপাশি পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।

বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া আলতাফ আলী উচ্চ বিদ্যালয়, বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (ভিএম) ও তালোড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু স্কুলে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের শিশু নির্যাতন, তার প্রতিরোধ, বয়ঃসন্ধিকালের বিভিন্ন সমস্যার ডাক্তারি পরামর্শ ইতোমধ্যেই দেওয়া হয়েছে, সেই সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করা হয়েছে।
বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েরা একধরনের হতাশায় ভোগে, সে কারণে আরএসি এসব মেয়ে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করেছে। নির্যাতিত শিশুদের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তাও দিচ্ছে এই সংস্থাটি। এভাবে সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নির্যাতিত শিশুদের জন্য কাজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে আরএসির।
আমাদের সমাজে এতিম শিশুরা তাদের পরিবার-আত্মীয়র কাছে ভীষণভাবে নির্যাতিত। তাদের কথা মাথায় রেখে এতিম শিশুদের জন্যও কাজ করছে আরএসি। বিভিন্ন এতিমখানায় এতিম শিশুদের জন্য বই ও পোশাক কিনে দেওয়া ছাড়াও পড়াশুনার খরচ দিয়েও তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে আরএসি। তাছাড়া বিভিন্ন এতিমখানায় বিকেলের নাস্তা, মাসে একবার ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাসহ এতিম শিশুদের চিকিৎসার জন্যে আরএসি একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ব্যবস্থা করেছে।

এবার ‘আরএসির পরিচালনায় ব্যতিক্রমী আর্ট স্কুল শুরু হয়েছে বগুড়ার একটি গ্রামে। সে গ্রামের শিশুরা কখনই আঁকাআঁকি শেখার কোন সুযোগ পায় নি। সেখানে গ্রামের সেসব শিশুদের নামমাত্র বেতনে চিত্রাঙ্কন শেখাবে আরএসি। আর তাদের কাছে থেকে পাওয়া অর্থের পুরোটাই ব্যয় করা হবে নির্যাতিত আর এতিম শিশুদের কল্যাণে।
পর্যায়ক্রমে অন্যান্য গ্রামেও শিশুদের জন্য এরকম আর্ট স্কুল করার পরিকল্পনা রয়েছে আরএসির। স্কুলের উপার্জিত অর্থ এতিম, নির্য়াতিত শিশুদের লেখাপড়া, পোশাক, চিকিৎসা,আইনি সহায়তাসহ অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যয় করা হবে।
এই কাজগুলো করার জন্যে প্রয়োজন অর্থ আর মনোবল। মনোবলের অভাব আমার কখনই ছিল না। অর্থনৈতিক সহযোগিতাবিহীন আরএসিকে আমার ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিই এগিয়ে নিয়ে চলেছে। নিজের ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার পর এত কিছু করা আমার জন্য সম্ভবও ছিল না। তারপরও আমি মনোবল হারাই নি। সাধ আর সাধ্যকে এক করার চেষ্টা করে গেছি সবসময়; আর সেটা এখনও করে চলেছি।
বগুড়ার জলেশ্বরীতলায় ছোট্ট পরিসরে রয়েছে আরএসির অফিস। এই আরএসি নিয়ে অনেক স্বপ্ন আমার। আমি স্বপ্ন দেখি আগামিতে আরএসি একটা ‘সুইট হোম’ করবে। না, এতিমখানা বলতে চাই না আমি ওটাকে। ‘সুইট হোম’ হবে শিশুদের একটি ‘স্বপ্নের বাড়ি।’ সেখানে থাকা শিশুরা বেড়ে উঠবে পরম মমতা আর যত্নে।
আমার স্বপ্নের সুইট হোমে থাকবে কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চারা, যাদেরকে তাদের বাবা-মা নামধারী মানুষগুলো রাস্তার ধারে বা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে যায়। ‘সুইট হোম’ হবে সেইসব শিশুদের বাড়ি,তাদের ঠিকানা।
আমি জানি,এমন স্বপ্ন পুরণের জন্য আমাকে একা একা হাঁটতে হবে বহুদূরের পথ। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সঠিক পথে হাঁটলে যে কেউ তার গন্তব্যে পৌঁছাবেই।
সাজিয়া আফরিনঃ উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী এবং প্রতিষ্ঠাতা, রিহ্যাবিলিটেশন ফর অ্যাবিউসড্ চাইল্ড।



