Uncategorized

ব্রোকেন ফ্যামিলি

সাজিয়া আফরিন

নিম্মি নানীর কাছে কবে থেকে থাকে সেটা তার জানা নাই, নানী তার আদর আবদারের জায়গা। ছো বেলায় বাবা মাঝে মাঝে ঘুরতে নিয়ে যেত, কিছু চাওয়ার আগেই কিনে দিতো কত কিছু, তারপর দাদু বাড়ি নিয়ে যেতো বেড়াতে। দাদুবাড়ির সবাই কাড়াকাড়ি করত নিম্মিকে নেওয়ার জন্য। নিম্নির কি যে ভালো লাগত। অপেক্ষায় থাকত আবার কবে বাবা আসার দিনটা আসবে!

মা তো আসতই না,মার মুখ ছোট্ট নিম্মি ঠিক মত মনে করতেই পারে না। কোন কোন দিন মা আসত একটু সময়ের জন্য, এসে নিম্মিকে কাছে নিয়ে আদর করেই বলত, ‘নিম্মি সোনা যাও খেলা করো।’

নিম্মির খুব ইচ্ছা করতো মায়ের গা ঘেঁষে লেগে থাকতে। মায়ের ওড়নার সাথে নিজেকে পেঁচিয়ে খেলতে,ঠিক যেমন লুবনা আপু মামীর সাথে সব সময় লেগে থাকে। কিন্তু নিম্মি তা পারত না। মায়ের নাকি ভীষণ তাড়া।

নিম্মি বেরিয়ে গেলে নিম্মির মা আর নানী চুপি চুপি কি কি সব কথা বলত তারপর কোন এক ফাঁকে নিম্মিকে না জানিয়েই মা বেরিয়ে পরতো, কারণ তিনি চান না নিম্মি তার সাথে যাবার বায়না ধরুক। নানী বলত, নিম্মির মা নাকি অফিস থেকে একটু ছুটি নিয়ে এসেছিলো এই বাড়িতে কি এক কাজে, তাছাড়া তো তার আসবার উপায় নাই। নিম্মি ভেবে পায়না কেন উপায় থাকবে না! বাবা যেমন আসে তেমন করে মা ও আসবে। তা ছোট্ট মন ভাবে হয়ত বা মায়ের অফিসে রাগী কেউ আছে যে হয়ত বকা দিবে এলে।

আরও একটু বড় হল যখন, দেখত তরী ওর বাবা মা দুজনের সাথেই ঘুরত, স্কুলের বন্ধুরা বাবা মা কে নিয়ে কত কত গল্প করত, কিন্তু নিম্মির তো এরকম কোন গল্প নাই। ওর তো মনে পড়ে না মায়ের সাথে ও কখনও ঘুমিয়েছে কিনা।

নানী বলত মা বাবা ওকে খুব আদর করত। কই! নিম্মি তো সেটা দেখেনি! ফিসফিস করে অনেককে বলতে শুনেছে ‘নিম্মির বাবা মার তো ছাড়াছাড়ি হয়েছে।’

নিম্মি ছাড়াছাড়ি বোঝেনা। তবে অনুমান করে এমন কিছু হয়েছে যেটার কারনে বাবা-মা রাগ করে এক সাথে ওর কাছে আসে না, যেমন মামী যখন কোন কিছু ছেড়ে কোথাও যায় তখন মামা যেমন রাগ করে তেমন কিছু।

আরও একটু বড় হলে নিম্মি বুঝল বাবা মা এখন আর ওর একার না। বাবা এখন আরও দুইজনের মাঝে ভাগ হয়েছে। আর মা, সে তো আগেই অন্য কারো মা হয়েছে। তারপর নিম্মির আর একটা বোনের সাথে নিজেকে ভাগ করেছে। সেই নতুন বোনের বাবা নিম্মির মাকে নিম্মির কাছে আসতে দেবে না, আর নিম্মিকে সাথে রাখা যাবে না এই পাকা কথা বলেই নিয়ে গেছে।

নিম্মির বাবা-মা তারা যে যার মত নতুন সংসার পেতেছে আর নিম্মি শুধু এখনও পুরাতন সম্পর্কের সাথেই আছেই যেখানে তার কোন অস্তিত্ব নাই। সবাই বলে সে নাকি ব্রোকেন ফ্যামিলির। নিম্মি বড় হয়েছে। সবাই এগিয়ে এসেও এখন পিছিয়ে যায়। কারণ তারা ভাবে আত্মীয় স্বজনের কাছে ব্রোকেন  ফ্যামিলির মেয়ে পরিচয় দিতে খারাপ লাগবে।

নিম্মি সুন্দর মনের একজন মানুষকে পেয়েছে জীবনসঙ্গী হিসেবে। তারপরেও কোথাও কোন ভুল হলে আড়াল থেকে ঠিকই  বলতে শুনেছে, ‘শিখবে কি করে শিখানোর কেউ থাকলে তো শিখবে?’

একটু নিজের মতামত জোর দিয়ে জানাতে গেলে শুনতে হয়, ‘তুমি তো আমাদের মতামত নিবে না কারণ তুমি কম্প্রোমাইজ করতে কখনই শেখো নি!’

নিম্মির বাবা মা বলেছিল ‘নো কম্প্রোমাইজ।’ আসলেই তাই; আমরা আধুনিক সমাজের শিক্ষিত মানুষ আমরা কেন কম্প্রোমাইজ করব! কেন একা স্যক্রিফাইস করব? নিম্মির বাবা মাও করেন নি। তারা নতুন করে সব শুরু করেছেন, কিন্তু নিম্মি? সে তো কম্প্রোমাইজ করেছে আর করেই যাচ্ছে!

বাবা-মা কে মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া, নানীর কাছে থাকা,ইচ্ছে হলেও মাকে ছুঁয়ে দেখতে না পাওয়া, বাবা-মা নিজেদের সুখে খুঁজে চলে যাওয়ায় নিম্মিকে শ্বশুর বাড়িতেও কথা শোনা এসব তাহলে কি?

বাবা-মার না করা কম্প্রোমাইজ আজ নিম্মিকে করতে হচ্ছে। আমরা স্যাক্রিফাইস বা কম্প্রোমাইজ না করলেও নিম্মির মত আমাদের সন্তানদের সারাজীবন সেটা করতে হয়।কিন্তু এটা কি ভেবে দেখবার বিষয় নয়? আধুনিকতা আর স্বাধীনতার কারণে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত ঠিকানা কোথায় বা তাদের মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে আমরা যদি ভাবতাম তাহলে হয়ত বা একটু কম্প্রোমাইজ করতাম যেন আমাদের সন্তানরা ভালো থাকে, যেন তাদের কম্প্রোমাইজ করতে না হয়,শুনতে না হয়-‘ও তো এসেছে ব্রোকেন ফ্যামিলি থেকে।’

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension