
জাকির হোসেন
শিগগিরই দেশব্যাপী আন্দোলনের সমন্বিত কর্মসূচি ঘোষাণা করবে নবগঠিত রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। ফ্রন্টের নেতারা জানিয়েছেন, সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে তারা জোটের ৭ দফা এবং ১১ লক্ষ্যর ভিত্তিতে জনগণের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে চান। এ লক্ষ্যেই এখন জোটনেতৃবৃন্দের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে চলেছে সমন্বিত কর্মসূচি নির্ধারনের তৎপরতা। এক সঙ্গে চলছে ফ্রন্টের পরিধি বাড়ানোর জন্য কৌশলী দৌড়ঝাপ। তবে ঐক্যফ্রন্টের দাবি সমূহকে অসংবিধানিক হিসেবে উল্লেখ করে তা নাকচ করে দিচ্ছেন সরকারি দলের নেতারা। একই সঙ্গে তারা এই নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দুর্নীতিবাজ এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের জোটে হিসেবে উল্লেখ করে তাদেরকে অসাংবিধানিক দাবি না তুলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আর জাতীয় পার্টি বলছে, ভোটের আগে জোট স্বাভাবিক বিষয়। এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের আভাস দিচ্ছে বলেই মনে করেন দলটির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টে যোগ না দেওয়া বিকল্পধারা বলছে, ১/১১ এর কুশীলবদের নিয়ে আবারও খালেদা জিয়াকে মাইনাস করারই ষড়যন্ত্র করছে নয়াজোটের নেতারা। বিএনপিকে সঙ্গে নিতে তাদের জোটসঙ্গী জামায়াত ও ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে ১৫০ আসন প্রশ্নে শুরু থেকেই মতবিরোধ চলছিল বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের মধ্যে। যেটি গড়িয়েছে মুখ না দেখাদেখি পর্যন্ত।
এদিকে শিগগিরই বৃহত্তর কর্মসুচি আসছে দাবি করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা, জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেন, তাদের জোটের আকার আরও বাড়বে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অনেকেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেবে।
তিনি বলেন, জোটে ভবিষ্যতে কে থাকবে, কে থাকবে না এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। ১৪ দলের জোট থেকেও অনেকে চলে আসবে। ক্ষমতাসীন দল একা হয়ে যাবে, এটা আমি বলতে পারি। কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় চলে যেতে চায়; সেটা ভিন্ন কথা।’
বিকল্পধারা বাংলাদেশ যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে যারা পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে চুক্তি করে, শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভে, বিকল্পধারা তাদের সাথে কখনও কোন চক্রান্তে যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘১/১১ এর সময় ব্যারিষ্টার মঈনুল হোসেন যখন ক্ষমতায় ছিলেন, সে সময়ে করা মামলাতেই বেগম খালেদা জিয়া এখন জেলে। আর মঈনুল হোসেন সাহেব এখন আসছেন বিএনপির সাথে ঐক্য করতে। আসলে এটা তাদের পুরাতন মাইনাস টুর চক্রান্তের অংশ কিনা; তিনি মওদুদ আহামদের সাথে হাত মিলিয়েছেন কিনা? এটা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, এ নিয়ে আরও দেখতে হবে কি হচ্ছে।’
নয়া এই জোট নেতারা বলছেন, ঐক্যের ঘোষণা হয়ে গেছে। আসছে সমন্বিত কর্মসূচি। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এ ফ্রন্টের তরফ থেকে এখন যে সব কর্মসূচি দেওয়া হবে; সেটা সবাই মিলে একসাথে দেওয়া হবে। আশা করছি খুব শিগগিরি আমরা কর্মসুচি ঘোষণা করব।’
আর মাজার জিয়ারত করে মাঠে নামার কথা উল্লেখ করেন জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব। তিনি হযরত আমানত শাহ, বদর শাহ, শাহাজালাল ও খানজাহান আলীর নাম উল্লেখ করে বলেন, আমরা চট্টগাম অথবা সিলেট থেকে সমাবেশ শুরু করতে পারি এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশ করব।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তৎপরতা বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় ১৪ দলের মুখপাত্র, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি অনেক আগেই জনবিচ্ছিন্ন দল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এই দলটি রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। তারা এখন দু’একজন লোক নিয়ে গড়া তথাকথিত রাজনৈতিক দলের পরিত্যক্ত নেতাদের ভাড়া করছে। আর এক পরিত্যক্ত নেতার অধীনতা স্বীকার করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তারা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তারা যেসব নেতাদের ভাড়া করেছেন, তাদের অবস্থা অনেকটা ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সরদার ’ এর মত।
তিনি বলেন, অনেক রাজনৈতিক নেতা এখন মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন। তাদের মানসিক চিকিৎসা দরকার। তারা আবার জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন। কিন্তু জনগণের সমর্থন ছাড়া জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করার জন্য বিএনপি নেতাদের দেয়া বক্তব্যের জবাবে ১৪ দলের মুখপাত্র বলেন, আপনাদের দাবি অযৌক্তিক ও অসাংবিধানিক। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে আপনারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবিধানিকভাবে দেশ পরিচালনার নেতৃত্বে আছেন। তাঁকে পদত্যাগ করতে বলার বিষয়টিই অসাংবিধানিক।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক, প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল মতিন খসরু বলেন, ‘এখন এ দাবিগুলি সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক এবং অবাস্তব। ভোটারদের কাছে যান; আপনারা যদি পাশ করেন তবে সরকার গঠন করে, সংবিধান সংশোধন করতে পারবেন; নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে পারবেন; নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিধান করতে পারবেন। তারা(ঐক্যফ্রন্ট) জানে তারা নির্বাচনে পাশ করতে পারবে না। তাদের শতকরা আশি জনই পাশ করতে পারবে না। কারণ তাদের মাটি ও মানুষের সাথে কোন সম্পর্ক নেই।’
এদিকে জাতীয় পার্টি নতুন জোট গঠনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, নির্বাচনের আগে মধ্যপন্থা অবলম্বনের কোন সুযোগ নেই। তবে ভোটের মাঠে মহাজোটের পাল্লাই ভারী থাকবে বলে মনে করেন দলটির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি বলেন, ‘বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল নয়। বোঝাযাচ্ছে যে তাদের জনসমর্থন খুব নগণ্য নয়। তাদের এ মুহুর্তে ঘাটতি যেটা, সেটা হল তাদের নেতৃস্থানীয় যারা ছিলেন, শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা দু’জনই এ মুহুর্তে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে পারছেন না। ড. কামাল হোসেনের মত একজন ব্যক্তিত্ব আসাতে, নেতৃত্বের দিক থেকে যে ঘাটতি ছিল তা পূরণ হওয়াতে, তারা ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে বলে আমি মনে করি।
তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’-এর নেতৃত্বে থাকা ড. কামাল হোসেন ‘জঙ্গি-দুর্নীতিবাজ’ বিএনপির আশ্রয়ন সংস্থা বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। তিনি বলেন, ‘এটা জোট নয়, এটা ঘোঁট। এই ঘোঁট পাকানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যের মধ্যে কিছু অমিশন আছে, কিছু কমিশন আছে। কিছু জিনিস উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কামাল হোসেন ও বিএনপির ওনারা বাদ দিয়েছেন, কিছু জিনিস উদ্দেশ্যমূলকভাবে যোগ করেছেন।
তিনি বলেন, কী কী বিষয়ে এই জোট নিরব সেই বিষয়ে আমি বলব- রহস্যজনকভাবে তারা বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে দৃঢ় ঐক্যের বিষয়ে নিরব। বিএনপি রাজাকারদের সম্পর্কের ব্যাপারে নিরব। বিএনপি সব জঙ্গি সন্ত্রাস হত্যা-খুনের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে- সেই ব্যাপারে ঐক্যফ্রন্ট নিরব। বিএনপি সংবিধানের চার নীতিকে সরাসরি অস্বীকার করে, সেই ব্যাপারেও ঐক্যফ্রন্ট নীরবতা পালন করেছে। বিএনপি সরাসরি ৩০ লাখ শহীদের ব্যাপারটিকে বিতর্কিত করেছে, সেই ব্যাপারেও নীরবতা পালন করেছে ফ্রন্ট।
ঐক্যফ্রন্ট তারেক, কোকো, খালেদা জিয়ার মহাদুর্নীতির ঘটনা অমিশন বাদ দিয়েছেন মন্তব্য করে জাসদ সভাপতি বলেন, ‘আর কমিশন হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াত-রাজাকার-জঙ্গি ও সব অপরাধীদের হালাল করার একটা প্রস্তাব হচ্ছে ৭ দফার প্রস্তাব। আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে চাচ্ছি- জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধাপরাধী, স্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধারের ঘোষণাটা হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জাতির সঙ্গে একটা ঠাট্টা-মশকরা।



