
তরুণ রাশান রেডকিন জীবন উৎসর্গ করেছেন সদ্য জন্ম নেয়া বাংলাদেশের জন্য
দিপু তৌহিদুল
বাংলাদেশ তখন সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, কল-কারখানা সবই বিধ্বস্ত। মোট কথা পুরো দেশই তখন একটা ধ্বংসস্তূপ। ১৯৭১ সালের নয় মাসের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরও। বন্দরের প্রবেশমুখে বসানো ছিল প্রচুর মাইন, চল্লিশটিরও বেশি জলযান পানিতে ডুবে থাকার কারণে বিঘ্ন ঘটছিল জাহাজ চলাচলে। এমনই এক জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত করে জাহাজ চলাচলের উপযুক্ত করতে সাহায্য কামনা করে। এজন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৭২ সালের ২২ মার্চ।
চুক্তি অনুসারে চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত ও জলপথ পরিষ্কার করে জাহাজ চলাচলের উপযুক্ত করতে রিয়ার এডমিরাল এস জুয়েঙ্কোর নেতৃত্বে ৮শ’ নৌ সেনা বাংলাদেশে আসেন। এদের মধ্যে প্রথম দলটি পিআই-৪০ জাহাজে করে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছায় ওই বছরের ২ এপ্রিল। চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল করতে গিয়ে সোভিয়েত নৌ সেনাদের প্রচণ্ড বৈরিতার মুখোমুখি হতে হয় তখন। এগুলোর মধ্যে ছিল অসম্ভব গরম, প্রচুর আর্দ্রতা, পলিমাটি জমা পানির তলায় একেবারেই দেখতে না পাওয়া, প্রচণ্ড স্রোত ইত্যাদি।
সে সময় অনেক পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ মনে করেছিলেন যে চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল করতে কমপক্ষে ২ থেকে ৩ বছর লেগে যেতে পারে। কিন’ তাদের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে কাজ শুরুর মাত্র তিন মাস পর ১৯৭২ সালের জুলাই মাসেই চালু হয়ে যায় চট্টগ্রাম বন্দর। এদিকে বন্দরকে মাইনমুক্ত করা আর বন্দরের প্রবেশমুখ পরিষ্কার করার কাজ শেষ করতে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তারপরও চট্টগ্রাম বন্দর পুনর্গঠনে সোভিয়েত নৌ সেনারা ১৯৭৪ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করেন।
তাদের এ অভিযান চলাকালে তারা ২৬টি ক্ষতিগ্রস্ত ও ডুবন্ত জলযান উদ্ধার করেন, অপসারণ করেন লাখ টনের উপর বর্জ্য। চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল করতে গিয়ে তারা প্রায় ১ হাজার ৯শ’ টন স্ক্র্যাপ উত্তোলন করেন নদীর তলা থেকে, বন্দরের প্রবেশমুখকে মাইনমুক্ত করাসহ প্রায় ১ হাজার ২ বর্গমাইল জলসীমা পরিষ্কার করেন। এই অভিযানে সোভিয়েত নৌ সেনারা ৪৪ জন বাংলাদেশীকে প্রশিক্ষণ দেন যারা পরবর্তীতে দেশের প্রথম পেশাদার ডুবুরি হয়েছিলেন। অভিযান শেষ করে চলে যাওয়ার সময় তারা উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত বেশ কিছু সাজসরঞ্জাম উপহার হিসেবে দিয়ে যান।

প্রায় ২৭ মাসের কঠিন অভিযান শেষে ১৯৭৪ সালের ১২ জুন ‘খাবারোভস্ক’ জাহাজে করে অধিকাংশ নৌ সেনা সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্লাদিভোস্তকের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ৮শ’ নৌ সেনার দলটির বাকি সদস্যরাও বাংলাদেশ ত্যাগ করেন ২৪ জুন। কিন’ একজন চিরদিনের জন্য রয়ে যান এদেশের মাটিতে। তিনি হলেন ফ্লোটিং ওয়ার্কশপ পিআই-১৫৬’র সিনিয়র নাবিক ইউরি ভিকতোরোভিচ রেডকিন।
চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত করার সময় ১৯৭৩ সালের ১৩ জুলাই নিহত হন তিনি। বঙ্গোপসাগরের তীরে পতেঙ্গায় তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় নিরিবিলি একটি স্বানে। পরবর্তীতে তার নামে স্বানটির নাম দেয়া হয় ‘রেডকিন পয়েন্ট’। বর্তমানে বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি এলাকায় অবস্থিত এ স্বানটিতে ১৯৮৪ সালে রেডকিনের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়।
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে তিভির শহরে রেডকিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন কোনো এক বছরের ১৮ ডিসেম্বর। শক্তিশালী মধ্যযুগীয় রাজ্যের সাবেক রাজধানী ও রুশ সাম্রাজ্যের প্রাদেশিক শহর তিভির ১৯৩১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কালিনিন নামেও পরিচিত ছিল। রেডকিনের বাবা রেডকিন ভিক্তর আন্দ্রেভিচ ও মা ভ্যালেন্তিনা ইলিনিচনা একবার তার স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করতে এদেশে আসেন।
তাদের প্রিয় ছেলের দুঃখজনক মৃত্যুতে বাংলাদেশের তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে তাদের একটি চিঠি লিখেন সেই সময়। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রশস্ত এক পথের ঠিক শুরুতে তার তরুণ জীবন থেমে গেছে। যাহোক, মানুষের জীবনের মূল্য পরিমাপ করা হয় জীবনের মেয়াদকাল দিয়ে নয়, তার ভাল কাজের মাধ্যমে। সেজন্য, নিঃসন্দেহে আপনাদের ছেলের প্রিয় ও উজ্জ্বল স্মৃতি তার দেশের মানুষ, বাংলাদেশের জনগণ এবং বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মী ও কর্মকর্তাদের হৃদয়ে চিরদিন জেগে থাকবে। আমি আশা করি এটি এরকম এক বিশাল ক্ষতিতে আপনাদের কষ্ট কিছুটা হলেও কমাবে।’
রেডকিনের জন্মদিনে চট্টগ্রামের রুশ কনস্যুলেট, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি প্রতি বছর তার স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানায়। চট্টগ্রামে রুশ কনসাল জেনারেল ওলেগ পেত্রোভিচ বয়কো বাংলাদেশের জন্য তার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তরুণ রেডকিন চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত করে নতুন জন্ম নেয়া একটি দেশকে সামনে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করতে এসেছিলেন। অভিযান চলাকালে মাইন বিস্ফোরণে তাকে জীবন দিতে হয়। তার এ আত্মত্যাগ রাশিয়া ও বাংলাদেশের মানুষ গভীয় শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে আজীবন।’ তাছাড়া রেডকিনের মতো সাহসী এক বীরের স্মৃতি দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর করবে বলে মনে করেন তিনি।
তরুণ রেডকিন জীবন উৎসর্গ করেছেন সদ্য জন্ম নেয়া বাংলাদেশের জন্য। চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন নিজ জন্মভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়। মৃদুমন্দ বাতাস তার কবরের উপর দিয়ে বয়ে যায় প্রতিটি মুহুর্তে। আশপাশের গাছগুলো তাকে ছায়া দেয় পরম মমতায়। পতেঙ্গার মোহনায় কর্ণফুলী নদীর পানি যেমনি বঙ্গোপসাগরে মিশে চলেছে প্রতিনিয়ত তেমনি রেডকিনের এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ বাংলাদেশ আর রাশিয়ার দৃঢ় বন্ধনকে দৃঢ়তর করবে আজীবন, অনন্তকাল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তরকালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকে পাকিস্তানি হানাদারদের পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ করতে গিয়ে আত্মোৎসর্গ করেন রাশিয়ান নাবিক রেডকিন। চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমির রেডকিন পয়েন্টে রয়েছে এই প্রিয় মানুষটির সমাধি। ১৮ ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিন। স্যালুট রেডকিন।



