ভারত

ভারতে বাড়ি ফেরা হবে না দিনমজুরদের

ওরা পরিযায়ী দিনমজুর। অর্থনীতির ভাষায় ইমিগ্র্যান্ট ডেইলি ওয়েজ আর্নার। ঘর ছেড়ে তারা ছড়িয়ে থাকেন দেশের সর্বত্র। প্রতিদিন পরিশ্রমের বিনিময়ে যে মজুরি পান, তার থেকে বাঁচিয়ে রেখে রেখে এক-দু মাস অন্তর বাড়িতে পাঠান।

কিংবা হয়ত আরও বেশি ব্যবধানে, যাতে একসঙ্গে বেশ কিছুটা টাকা বাড়ির লোক হাতে পান। করোনা সংক্রমণ রুখতে আচমকা দেশজুড়ে লক ডাউন ঘোষিত হওয়ার পর সব থেকে বিপদে পড়েছেন এই ভিনরাজ্যের শ্রমিকরা। রাতারাতি রোজগার বন্ধ।

যেখানে ঝুপড়ি ঘরে একসঙ্গে অনেকে গাদাগাদি করে থাকেন, তার চারপাশে দোকানপাট বন্ধ। যদিওবা কিছু খোলা, অনুমোদিত দামের থেকে অনেক বেশিতে যেখানে বিকোচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, যা কেনার সামর্থ তাদের নেই। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার গরিবদের জন্য বিনামূল্যে চাল, ডাল, তেল দিচ্ছে, কিন্তু সেই ত্রাণ বণ্টন হচ্ছে রেশন দোকান থেকে, রেশন কার্ডের বিনিময়ে। অন্য রাজ্যের শ্রমিকদের সেটাও নেই, ফলে সব দিক দিয়ে ফাঁকিতে পড়েছেন।

যে কারণে ভারতে লক ডাউনের শুরু থেকেই শোনা যাচ্ছে বিপন্ন পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার মরিয়া চেষ্টার কথা। লোকে পায়ে হেঁটে ফেরার অসম্ভব চেষ্টা করছেন। মুম্বাই থেকে শ্রীনগর। দিল্লি থেকে চেন্নাই। যে রাস্তা বিমানে যেতেও তিন ঘণ্টা লাগে।

পশ্চিমবঙ্গও এই বিপর্যয়ের মানচিত্রের বাইরে নয়৷ গত সপ্তাহেই বীরভূমের সিউড়িতে এক দল পরিযায়ী শ্রমিকের রাস্তা আটকায় পুলিশ, যারা বোলপুর থেকে হেঁটে ঝাড়খণ্ডে নিজেদের গ্রামে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। এভাবে অন্য রাজ্যে আটকে পড়া, অর্থকষ্টে, খিদে-তেষ্টায় দিশেহারা, ঘরে ফিরতে মরিয়া শ্রমিকদের সংখ্যা ঠিক কত, সে হিসেব কারও কাছে নেই।

‘এদের কাছে আর কোনও পয়সা নেই’

জানালেন আন্তর্জাতিক সহায় সংস্থা অ্যাকশন এইড-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার অন্যতম আধিকারিক চিত্তরঞ্জন মন্ডল। এই রাজ্যে আটকে পড়া ভিনরাজ্যের শ্রমিক এবং অন্য রাজ্যে আটকে পড়া পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের সাহায্য করার যে চেষ্টা করছে অ্যাকশন এইড, তার সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন তিনি।

চিত্তরঞ্জন মন্ডল জানালেন, ‌‘‌কেউ ইটভাঁটায় কাজ করে, ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছ্। কেউ দোকানে কাজ করে, কেউ বা দোকান, গার্মেন্টসে, ছোটখাট গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে। এবার বন্ধ আছে ওটা। মালিক এবার আর পয়সা দেয় নি৷। এদের কাছে যতটুকু পয়সা ছিল, তা আস্তে আস্তে এরা খেয়ে ফেলেছে। খেয়ে ফেলেছে এবং এদের কাছে আর কোনও পয়সা নেই এই মুহূর্তে। অনেক পয়সা এদের বাকিও আছে৷ এমপ্লয়ার পয়সা দেয় নি।

চিত্তরঞ্জন মন্ডল বলেন, এখন তারা খুবই প্যাথেটিক সিচুয়েশনে আছে। কেউ মুড়ি খেয়েও আছে, এরকমও আমি খবর পেয়েছি। মারাত্মক চিন্তায়ও আছে, যে আমরা এই কদিন কী করে বাঁচব!‌৩ মে পর্যন্ত লক ডাউন। এবং হট স্পট বা রেড জোনগুলোতে তো টোটালি লক্‌ড। সেখানেও লেবাররা রয়েছে। তারা তো কোথাও বেরোতে পারছে না। যদিও গভর্নমেন্ট বলেছে তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেবে, কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি কতটা খাবার পৌঁছচ্ছে, সেটা একটা ইস্যু৷’

এই দিনমজুরদের পাশাপাশি সমান বিপন্ন অসংগঠিত ক্ষেত্রের অন্যান্য কর্মীরাও, যারা পরিচারকের কাজ করেন। নানা সংস্থার হয়ে জিনিসপত্র ডেলিভারি দেন, ক্যাটারিং বা ওই জাতীয় ব্যবসায় জোগাড়ের কাজ করে কোনওমতে জীবিকা নির্বাহ করেন।

যে ছোট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এঁদের নিয়োগ করে, টানা এক মাস ব্যবসা বন্ধ থাকাও তাদেরও আর্থিক অবস্থা খারাপ। কাজেই এই কর্মীরা ঘরে বসে থাকলেও যে বেতন পেতে থাকবেন, সেটা দুরাশা।

বরং এই পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা, বা বেতন না দেওয়া৷ সে দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর টিভি ভাষণে যতই বলুন, কাউকে চাকরি থেকে তাড়াবেন না।

বরং উঁচু তলার চাকরিতেও শুরু হয়েছে ২০ থেকে ৩০% বেতন ছাঁটাই, তরঙ্গের মতো যার প্রভাব এসে পড়ছে নিচুতলায়।◉

ডয়েচ ভেলে

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension