
রওশন ভাবি পাইপ হাতে নিয়ে নিজেই ছাদে উঠে এলেন। তার চুল ভেজা, মাথায় গামছা পেঁচানো। ঢোলা কামিজের নিচে টানটান বুক। পাইপটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি গোসল সারো হাফিজ, বাড়িওয়ালা টের পেলে চিল্লাবে, পাঁচ মিনিট পর পানি বন্ধ করে দিব।’
ভাবি নেমে গেলেন একরাশ শ্যাম্পুর গন্ধ ছড়িয়ে। পাইপ দিয়ে পানি বের হতে থাকলে আমার হুঁশ ফেরে। পাইপ দিয়ে পানি নয়, ভাবির প্রেম উপচে পড়ছে।
গোসল শেষ হতে হতে পানি বন্ধ হয়ে যায়। বালতির ধরে রাখা পানিতে গামছা-লুঙ্গি ধুয়ে মেলে দিই।
এ বাড়িতে ভাড়া এসেছি তিনমাস, একটা চৌকির পাশে একটা চেয়ার আর টেবিল। রুম শেষ। চিলেকোঠার ঘর। এমন একটা বাথরুম, মোটা কেউ বসলে বাথরুমের তিনদিকের তিনইঞ্চির দেয়াল ফেটে পশ্চাদ্দদেশ বেরিয়ে পড়বে। পুরো ছাদে বাথরুমেই পানির একটা ট্যাপ। কিপটে বাড়িওয়ালা এত সরু ট্যাপ লাগিয়েছে যে সারাদিন খুলে রাখলেও এক বালতি পানি ভরে না।
এইঘর ভাড়া নেবার পর থেকে শুক্রবারে আফজাল ভাই, অন্যদিনগুলোয় ভাবি বা বাচ্চারা পানির পাইপে চুরি করে ছাদে পানি চালান করে। পাইপটাও ভাবি কিনেছেন। অফিসে বসে অনেকক্ষণ ভাবির বসন্তের দাগওয়ালা পুরুষ্টু মুখটাকে মনে করার চেষ্টা করি। দুধের সরের মতো পাতলা একটা নির্লিপ্ততা সেখানে মাখানো থাকে।
সাতটায় অফিস থেকে ফিরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে ভাবি আর তার মেয়ে মনিরার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। কোচিং থেকে মেয়েকে আনতে গিয়েছিলেন। এখন ভাবিকে দেখলে কেউ আফজাল ভাজাওয়ালার স্ত্রী বলে চিনতে পারবে না। পাশের বিল্ডিংএ ভাড়া থাকা হীড ইন্টান্যাশনালের টিচার বিলকিস বানুর চেয়েও সুন্দর লাগছে। ঠোঁটে কমলা রঙের লিপস্টিক, কমলা স্যালোয়ার কামিজ, গাঢ় সবুজ বড় পার্সব্যাগ। আমি সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে যাবার সময় ভাবি সাৎ করে সরে গেল যাতে শরীরে টাচ না লাগে। যতসব ঢঙ, নখরা, ছিনাল!
সারাদিন ফেরি করে করে সিঙারা, সমুচা, রোল বিক্রি করে আফজাল ভাই পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে সামনের রুমটায় ছাদে ওঠার পথে উঁকি মেরে দেখি। সকাল সাতটায় মিশনারী স্কুল শুরু হয়, তার আগেই সে ভাজার ঝুড়ি বুকে ঝুলিয়ে স্কুলের সামনে হাজির, সারাদিনে সাত-আটবার বড়িতে আসে স্ন্যাকসগুলো নেবার জন্য। পাঁচতলার সিড়ি ভাঙে।
আমি কাপড় পাল্টে নিচে নামলাম খাবার পানি লাগবে। খুব বিতিকিচ্ছিরি জীবন আমার, সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত হোটেলে চাকরি করি। খাবার বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, কখনো ক্যাশে বসা। রাতের খাবারও হোটেল থেকে দেয়। প্লাস্টিকের বক্সে করে নিয়ে আসি।
দুটো ঘরের সামনের ঘরে এখন মনিরা আর আনাম বই পড়ছে। আফজাল ভাই বোধহয় বাজারে গেছেন। আমি পানির জগটা নিয়ে প্রথম ঘর দ্বিতীয় ঘর পেরিয়ে সোজা কিচেনে ঢুকে যাই। ভাবি বিশাল এক ময়দার তাল থেকে ছোট ছোট লেচি কাটছেন সিঙারা রোল তৈরির জন্য। পাশের একটা বড় রেকাবিতে সমুচার জন্য রাইসপেপার সাইজ করে কেটে রাখা। ভাবির মতো একটা মেয়ে অথবা ভাবিকে পেলেই গ্রামের জমি বেচে একটা হোটেল খুলে ফেলবো।
নিঃশব্দে জগটা ফ্লোরে রেখে পিছন দিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরি। প্রথমে ভীষণ চমকে ওঠেন, আফজাল ভাই বোধ হয় কখনো এভাবে সোহাগ করতে আসেন না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার দিকে ঘুরে বিরাশি সিক্কার একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেন গালে। আমি গড়িয়ে পড়তে গিয়ে মিটসেফের কোণ ধরে সামলে নিই। মিটসেফে রাখা বাসন আর্তনাদ করে ওঠে। পুরো গাল ফুলে উঠছে, ওই ময়দা মাখা হাতে কী শক্তি!
চাপা গলায় হিসহিস করে ওঠেন, ‘শুয়োরের বাচ্চা, তোরে আমি মা মরা ছোটো ভাই মনে করছিলাম, কুত্তা তো মানুষ হয় না, লাই দিলে তো মাথায় ওঠে!’
সামনের রুম থেকে মনিরা আর আনাম দৌড়ে আসে, জিজ্ঞাসা করে, ‘কি হয়েছে আম্মু?’
রওশন ভাবী বিদ্রুপের সুরে বলেন, ‘কিছু হয় নাই, পা পিছলাইয়া পড়ছে, যাও তো আম্মু তোমার আব্বার ঘর থিকা এক জগ পানি দাও আঙ্কেলরে।’
শুকনো কিচেন রুমে কেউ কীভাবে আছাড় খেতে পারে! বুঝে উঠতে পারে না মনিরা। আমি তাড়াতাড়ি বা হাতে গাল ঢাকি আর ডান হাতে জগটা এগিয়ে দিই।
সকালে জেগে জানালা দিয়ে দেখি রওশন ভাবি ছাদে কাপড় মেলতে এসেছেন। গামছা পেচানো চুলের ফাঁকে পাকা চুল চকচক করছে। কামিজের মধ্যে ঢলঢল করছে স্তন। হাঁটার ভঙ্গি কী বিশ্রী!
আজও সন্ধ্যায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে দেখা হয়ে গেল। লাল লিপস্টিকে ডাইনির মতো লাগছে, সিঁড়ির অল্প আলোতেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মুখের বলিরেখাগুলো, জঘন্য!❐



