বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুর সেই ছবি

পাভেল রহমান


সেনাবাহিনীর কর্নেল রশীদকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সিনিয়র ক্যামেরাম্যান জিয়াউল হক বলেন, ‘গাড়িটা থামান, দৈনিক বাংলার গোলাম মওলাকে তুলে নিই আমরা। আমার ভিডিও ফিল্ম থেকে তো আর ছবি প্রিন্ট করা যাবে না, ওদের স্টিল ফিল্ম থেকে ছবি বড় প্রিন্ট হবে।’ কর্নেল রশীদ, যিনি কুচক্রীদের একজন নেতা জিয়াউল হককে নিয়ে চলেছেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে, তিনি বঙ্গভবনের লন থেকে গাড়িতে তুলে নিলেন গোলাম মওলাকে। গোলাম মওলাসহ অন্য সাংবাদিকরা বঙ্গভবনে এসেছিলেন নতুন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাকের শপথ অনুষ্ঠানের ছবি তুলতে। শপথ অনুষ্ঠানে সে সময়ের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরের নির্দেশে কর্নেল রশীদ বঙ্গবন্ধুর লাশের ছবি সংগ্রহে ছুটছিলেন ধানমণ্ডির পথে। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ‘মুখের কথায় কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না যে বঙ্গবন্ধুর মতো নেতাকে হত্যা করা হয়েছে।’ সে কারণে ছবি প্রচার করতে তারা ছুটছিলেন ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ১৫ আগস্ট বেলা ১১টায়।

সেনাবাহিনীর জিপটা এসে ঢুকল দৈনিক বাংলার ভেতরে। ১ নম্বর ডিআইটি এভিনিউ তখন দৈনিক বাংলার ঠিকানা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা শহরের রাস্তায় ট্যাঙ্ক আর সেনাবাহিনীর জিপ ছাড়া সাধারণ গাড়ির চলাচল নেই বললেই চলে। পথচারী আর দৈনিক বাংলার কর্মচারীরা সে কারণে একটু বাড়তি ঔৎসুক্যে তাকিয়ে দেখেন অফিসের কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়া জলপাই রঙের জিপটার দিকে। জিপ থেকে সেনাসদস্যদের পর পরই নামলেন ছোট্ট ক্যামেরার ব্যাগ হাতে দৈনিক বাংলার তৎকালীন প্রধান আলোকচিত্রী গোলাম মওলা। যেকোনো অ্যাসাইনমেন্ট থেকে ফেরার সময় মোটরসাইকেল থেকে যে উদ্দীপনা নিয়ে গোলাম মওলা অফিস কম্পাউন্ডে নামেন, আজ যেন সেই উদ্দীপনার লেশমাত্র নেই। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় যে উঠবেন, তার সেই শক্তিও আজ নেই। সিঁড়ির পরিবর্তে দৈনিক বাংলার ছোট্ট লিফটায় ঠাসাঠাসি করে গোলাম মওলাসহ সেনা অফিসাররা উঠে এলেন দোতলার বার্তাকক্ষে। আরও একধাপ ওপরে ডার্করুম। দোতলাতেই যিনি উঠতে পারেন না, তিনি কীভাবে পৌঁছাবেন তিনতলার ডার্করুমে! বার্তাকক্ষের বড় টেবিলটার সামনে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন গোলাম মওলা। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। হাতের ইশারায় এক গ্গ্নাস পানি চাইলেন অফিস পিয়নের কাছে। চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে রুমাল দিয়ে ঘামেভেজা মুখটা মুছে নিলেন। ঘামলাগা চশমাটাও। কিন্তু কিছুই দেখতে পারেন না ঝকঝকে পুরু লেন্সের সেই চশমায়। চোখ বন্ধ করতেই বীভৎস দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল। ভয়াবহ সব দৃশ্য। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সিঁড়ির মাঝখানটায় বাঁয়ে দোতলার দিকে ঘুরতেই বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে হৃদযন্ত্রের গতি বেড়ে গিয়েছিল তার। এমনিতেই উচ্চ রক্তচাপ। নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলেন না । হৃদস্পন্দনটা যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে এখনই। সাদা পাঞ্জাবির মধ্যে লাল লাল রক্তের ছোপ। বুকের দিকটায় একটু বেশি লাল। লাল রক্তে সিঁড়ি ভেসে যাচ্ছে। কোথায় পা রাখবেন, শুকনো জায়গাটা পর্যন্ত নেই। সেনাসদস্য ক’জন বঙ্গবন্ধুর লাশ টপকে ওপরে উঠে গেলেন তারই পাশ দিয়ে।

ফ্ল্যাশের আলোতেই জওয়ানরা বুঝে ফেলে ছবি তোলা হয়েছে, ইশারায় গোলাম মওলাকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আসতে বলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শরীর বাঁচিয়ে পা রাখবেন কোথায়? থমকে গেলেন তিনি। উঠবেন কোন দিক দিয়ে। সিঁড়িজুড়ে বঙ্গবন্ধুর বিশাল নিথর দেহ পড়ে আছে। পা রাখার যে এতটুকু জায়গা নেই। যদি ছোঁয়া লেগে যায় বঙ্গবন্ধুর পবিত্র শরীরে? কী করবেন তিনি। ওপর থেকে একজন ধমকে ওঠে- জলদি, জলদি, উঠে আসুন। কর্কশ কণ্ঠের শব্দে সম্বিত ফিরে পান গোলাম মওলা। গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে দু’হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে ধরে যত্ন করে বঙ্গবন্ধুর শরীর বাঁচিয়ে পা রাখলেন গোলাম মওলা। পা রাখতেই চোখে পড়ে গেল তার সিঁড়িজুড়ে লাল-সাদা আলপনার ছাপ। মাত্র ক’দিন আগেই বিয়ের উৎসব লেগেছিল বাড়িটায়। শেখ কামাল আর শেখ জামালের গায়ে হলুদের আলপনা। সিঁড়ির ধাপে ধাপে রেলিংছোঁয়া অংশটায় খুব সন্তর্পণে তিনি পা ফেলে ফেলে উঠতে থাকেন দোতলায়। চোখ মেলে এ দৃশ্য দেখা অসম্ভব। নিজেকে সামলাতে পারেন না। এ কী দেখছেন তিনি। রক্তের বন্যায় ভাসছে বেগম মুজিবের লাশ, পাশেই শিশু শেখ রাসেল। বেগম মুজিব এমনভাবে পথ আগলে আছেন যে তিনি ঘাতককে বাধা দিতে চেয়েছিলেন। সবাইকে বাঁচানোর শেষ প্রচেষ্টায় ছিলেন তিনি। ঘরের মাঝে সুলতানা কামাল। একেকজন একেক জায়গায়। গোলাম মওলা আর এগোতে পারছিলেন না। তার আর ছবি তুলতে মন চাই ছিল না। ফ্লোরজুড়ে শুধু রক্ত। এত নিস্তব্ধতা এ বাড়িজুড়ে! এমনটি কোনোদিনই এ বাড়িতে হয়নি আর আগে। গোলাম মওলা এ বাড়িতে নতুন নন। সারাক্ষণ গমগম করা বাড়িটি আজ এতটাই নিস্তব্ধ হয়েছে।

১৫ আগস্টের বেশ কিছুদিন পর সেনা কর্মকর্তারা দৈনিক বাংলা অফিসে আবার এল আর তুলে নিয়ে গেল গোলাম মওলাকে। বিদেশে ওই ছবি পাচার আর প্রচারের অজুহাতে গোলাম মওলাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো, যার কোনো কিছুই তিনি জানতেন না।

গোলাম মওলা বোঝাতে চেষ্টা করলেন, ‘আপনারা সবই নিয়ে এসেছেন, আমার কাছে কিছুই রাখেন নি।’

ফিরে এসেছিলেন গোলাম মওলা, সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন অপমানের বিশাল এক বোঝা। তবে তার ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। ওই বোঝা তাকে বেশিদিন বইতে হয়নি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে, এ পৃথিবীতে।

আরও পরের কথা। ১৯৮২ সালে দেশে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধুর হতভাগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। মা-বাবা-ভাই ও নবপরিণীতা বধূদের হারানোর যন্ত্রণায় পাগলপ্রায় তিনি। দেশের মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফেরেন হত্যাকা ের বিচার চেয়ে। বাবার ছবির খোঁজেও ছুটেছেন বহু দেশে। ১০ বছর নিরন্তর চেষ্টার পর অর্থের বিনিময়ে পেয়ে যান অমূল্য সেই ছবি, জার্মানির এক আলোকচিত্রীর কাছে। বাবার নিষ্প্রাণ গুলিবিদ্ধ দেহখানি, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে পড়ে থাকেন একাকী। সাদাকালো ছবিতে পরনের সাদা পাঞ্জাবিতে কালো ছোপ ছোপ রক্তের ধারা। নিজেকে সামলাতে পারেন নি তিনি। সন্তানের সামনে যা ছিল বাবার শেষ দৃশ্যের চিত্রায়ণ।

সেই ছবি জার্মানি থেকে সযত্নে নিজ ভ্যানিটি ব্যাগে নিয়ে এলেন বাংলাদেশে। তারপর মতিঝিলে বাংলার বাণীর ডার্করুমে। শেখ সেলিম তখন ওই পত্রিকার সম্পাদক। ভাইবোন দু’জনের সামনে প্রথম ওই ছবির কপি প্রিন্ট করলেন স্বপন সরকার।
বাংলার বাণীর প্রেসেই ছাপা হলো সেই পোস্টার। সারাদেশে ছড়িয়ে গেল গোলাম মওলার তোলা বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ ছবি পোস্টার হয়ে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension