
ডলারের দাম বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে ডলারের দর বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। আন্তঃব্যাংক লেনদেনে আগের মতোই ডলারের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় কমে যাওয়ায় ডলারের দর বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল টাকার মান আরো ৯০ পয়সা অবমূল্যায়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমদানি দায় পরিশোধের জন্য গতকাল রিজার্ভ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। এক্ষেত্রে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য রাখা হয়েছে ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা। এর আগে গত সোমবার ডলারের বিপরীতে টাকার মান ১ টাকা ১০ পয়সা কমানো হয়েছিল।
বাজারে সংকট তীব্র হওয়ায় পুরো মে মাসেই অস্বাভাবিক দামে ডলার কিনতে থাকে ব্যাংকগুলো। এক্ষেত্রে ৯৬ টাকারও বেশি মূল্যে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর কাছ থেকে রেমিট্যান্সের অর্থ কিনে নেয় কোনো কোনো ব্যাংক। আর খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দাম উঠে যায় ১০২-১০৪ টাকায়। এ অবস্থায় ডলারের বাজারে লাগাম টানতে উদ্যোগী হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২৬ মে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর ফজলে কবির বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠক থেকেই অভিন্ন দামে ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এক্ষেত্রে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম বেঁধে দেয়া হয় ৮৯ টাকা। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া দামে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর কাছ থেকে রেমিট্যান্সের অর্থ কিনতে পারেনি কোনো ব্যাংক। আর রফতানিকারকরাও বেঁধে দেয়া দামে রফতানি আয় নগদায়ন করেননি। এ অবস্থায় গত সপ্তাহজুড়ে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যাংকগুলোকে হিমশিম খেতে হয়েছে।
বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ডলারের দাম ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, বেঁধে দেয়া দরে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো রেমিট্যান্স বিক্রি করছে না। এ কারণে ব্যাংক খাতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কিছুটা কমে গিয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই ডলারের একক মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো আগের মতোই বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে ডলারের দাম নির্ধারণ করবে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক দৃষ্টি রাখবে।
সিরাজুল ইসলাম জানান, গতকালও বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ১৩৫ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। এক্ষেত্রে প্রতি ডলারের মূল্য ধরা হয়েছিল ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা। এখন পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করা হয়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক খাতে ডলারের দাম ৮৯ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হলেও কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলার ৯৭ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। দুই বাজারের লেনদেনে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ায় রেমিট্যান্সের একটি অংশ হুন্ডিতে চলে যাচ্ছে। এ কারণে গত সপ্তাহে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মে মাসে দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমেছে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত মাসে দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৮৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। যদিও ২০২১ সালের মে মাসে প্রবাসীরা ২১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন।
২০২০-২১ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ২৮৩ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। বিপরীতে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে ১ হাজার ৯১৯ কোটি ৪৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরে ৩৬৪ কোটি ২৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে কম এসেছে।
রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। এ কারণে সংকট তৈরি হয়েছে ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে। সংকট সহনশীল রাখতে প্রতিদিনই রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তার পরও রেকর্ড আমদানির চাপে সংকট কাটছে না ডলারের বাজারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই ’২১-মার্চ ’২২) ৩ হাজার ৬৬১ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। যেটি ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। বিপরীতে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে দেশে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। রেকর্ড এ আমদানি প্রবৃদ্ধি দেশের ২ হাজার ৪৯০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ হতো। কিন্তু রফতানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্স যুক্ত করেও আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।



