বাংলাদেশ

সাভারে শিক্ষক হত্যা: বান্ধবীর সামনে হিরো সাজতে পরিকল্পিত হামলা

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বান্ধবীর সঙ্গে অযাচিত ঘোরাফেরায় বারণ করেছিলেন। বিষয়টি বান্ধবীর পরিবারের সদস্যদের অবহিতও করেন শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে বান্ধবীর সামনে নিজের ‘হিরোইজম’ দেখানোর জন্য শিক্ষক উৎপলকে বেধড়ক পেটায় বখাটে স্কুলছাত্র আশরাফুল আহসান জিতু। তাকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

জিতুকে আশুলিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল আদালতের মাধ্যমে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

এদিকে শিক্ষক উৎপল হত্যার ঘটনায় গতকালও উত্তাল ছিল সাভার। এদিন ফেডারেশন অব কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে জিতুর সর্বোচ্চ শাস্তিসহ পাঁচ দফা দাবিতে ছয়শ’র বেশি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে। এ ছাড়া নিহত শিক্ষক উৎপলের কর্মস্থল হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির এডহক কমিটি স্থগিত করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব কর্মকর্তা কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ঘটনার কয়েক দিন আগে স্কুলের এক ছাত্রীর সঙ্গে জিতুকে অযাচিত মেলামেশা ও ঘোরাফেরা করতে দেখেন শিক্ষক উৎপল কুমার। তিনি দুজনকেই এভাবে ঘোরাফেরা করতে বারণ করেন। এতেই জিতু শিক্ষকের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ওই ছাত্রীর কাছে নিজের হিরোইজম দেখানোর জন্য শিক্ষকের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সে ২৫ জুন ক্রিকেট খেলার একটি স্টাম্প নিয়ে স্কুলে আসে এবং তা শ্রেণিকক্ষের পেছনে লুকিয়ে রাখে। পরে তার শিক্ষককে আঘাত করার সুযোগ খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে কলেজমাঠে ছাত্রীদের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলাকালে শিক্ষক উৎপল কুমারকে মাঠের এক কোণে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অতর্কিতভাবে আঘাত করতে থাকে। জিতু তার শিক্ষককে প্রথমে পেছন থেকে মাথায় এবং পরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, জিতু এলাকায় ‘জিতু দাদা’ নামে পরিচিত। স্কুলে সে বেপরোয়া চলাফেরা করত। বিভিন্ন সময় ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করত। কলেজের শৃঙ্খলা কমিটি বিভিন্ন সময় অভিযোগ পেয়ে জিতুকে সতর্ক করেছিল। এসব কারণেও সে শিক্ষক উৎপল সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।

খন্দকার আল মঈন বলেন, নিহত শিক্ষক উৎপল কুমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে আশুলিয়ার হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি ওই কলেজের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের স্কুল ইউনিফর্ম, চুলকাটা, ধূমপান করা ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত বিষয়ে কাউন্সেলিং করতেন। এ ছাড়াও, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের খেলাধুলা পরিচালনা করাসহ শিক্ষার্থীদের সুপরামর্শ, মোটিভেশন ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সৃজনশীলতা বিকাশে ভূমিকা রাখতেন। জিতু ওই প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। সে শিক্ষাজীবনে বিরতি দিয়ে প্রথমে স্কুল, পরে মাদ্রাসা ও সর্বশেষ পুনরায় স্কুলে ভর্তি হয়। সে স্কুলে সবার কাছে উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও মারামারিসহ স্কুলের পরিবেশ নষ্টের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এই র‌্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আশুলিয়া থানায় মামলার এজাহারে জিতুর বয়স ১৬ উল্লেখ করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তার বয়স ১৯ বছর। বিষয়টি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে।’

শিক্ষক উৎপল হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার এসআই এমদাদুল হক জানান, জিতুকে গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে গতকাল আশুলিয়া থানায় হস্তান্তর করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিকেলে জিতুর ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে বিচারক ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে উত্তাল সাভার: শিক্ষক উৎপল হত্যার ঘটনায় গতকালও উত্তাল ছিল সাভার। ফেডারেশন অব কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের (ফোকা) উদ্যোগে এদিন বেলা ১১টার দিকে সাভার উপজেলা চত্বরে ছয়শ’র বেশি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা শিক্ষক উৎপলের ওপর হামলাকারী জিতুর সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসিসহ পাঁচটি দাবি জানান।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষকদের নিরাপত্তার জন্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জিতুর দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত, নিহতের পরিবারকে সর্বোচ্চ আর্থিক ক্ষতিপূরণ, জিতুর পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা এবং স্থানীয় ও ভাড়াটিয়া (অভিভাবকদের কর্মস্থলের সূত্রে সাভারে অবস্থান) শিক্ষার্থীদের ভেদাভেদ দূরে ব্যবস্থা গ্রহণ।

মানববন্ধনে ফোকা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জীতু বলেন, ‘আমরা খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যাতে করে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষকদের অবমাননা করতেও সাহস না পায়।’

হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাই কিশোর গ্যাং নির্মূল হোক। জিতু পরিকল্পনা করে শিক্ষক উৎপলকে হত্যা করেছে। সে তার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং এলাকায় নিজেকে জিতু দাদা বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে।’

মানববন্ধন শেষে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

অন্যদিকে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির এডহক কমিটি স্থগিত করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। গতকাল দুপুরে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক আবু তালেব মো. মোয়াজ্জেম হোসেন শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গভর্নিং বডির এডহক কমিটি স্থগিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

অধ্যাপক আবু তালেব মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘অভিযুক্ত শিক্ষার্থী জিতু প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি শাহরুফ আলী মো. সুমনের ভাতিজা। তার প্রভাবেই ওই শিক্ষার্থী প্রভাব দেখিয়ে ইচ্ছেমতো চলাফেরা করত। তবে তাদের গভর্নিং কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন কমিটি গঠনের জন্য গত বছরের ১৪ আগস্ট এডহক কমিটির জন্য আবেদন করা হয়েছিল। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন ছিল। আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) আলোচনা শেষে সেই এডহক কমিটি গঠনও স্থগিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত নোটিস দেওয়া হয়েছে।’

গত ২৫ জুন দুপুরে আশুলিয়ার চিত্রশাইলে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র জিতু ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে অতর্কিত হামলা চালায় শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারের ওপর। প্রথমে ওই ছাত্র শিক্ষকের মাথায় আঘাত করে এবং পরে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। এ ছাড়া স্টাম্পের সূচালো অংশ দিয়ে পেটের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় উৎপলকে প্রথমে আশুলিয়া নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নেওয়া হয়। আঘাত গুরুতর হওয়ায় পরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সোমবার ভোরে সেখানকার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় বুধবার জিতুকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension