
পাতাল মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ উদ্বোধন
স্বপ্নের মেট্রোরেলের পর এবার পাতাল রেলের যুগে বাংলাদেশ। উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল উদ্বোধনের এক মাসের মাথায় বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-১) প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আরেকটি মাইফলক স্থাপিত হলো।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সারা দেশে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে দেশের মানুষের উন্নতি হয়। আওয়ামী লীগ কথা দিলে সেটা রাখে, আমরা সেই কথা রেখেছি।
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে নিয়ে এগিয়ে যাব, বাংলাদেশের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি কেউ থামাতে পারবে না। এজন্য আমি সকলের সহযোগিতা চাই।’
বেলা ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকার ৪ নম্বর সেক্টরে ফলক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে পাতাল রেলের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী, জাপানের রাষ্ট্রদূত আইওয়ামা কিমিনোরি, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান প্রতিনিধি তোমোহিদে ইচিগুচি, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক।
ফলক উন্মোচনের পর রূপগঞ্জের জনতা উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্লটে এক সুধী সমাবেশে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং ডিএমটিসিএলের উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ওবায়দুল কাদের।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে আমরা পাতাল রেলের কাজের উদ্বোধন করলাম। এর আগে আপনাদের উড়াল মেট্রোরেল উপহার দিয়েছিÑ এটা ওপর দিয়ে যাচ্ছে, এবার মাটির নিচ দিয়ে পাতাল রেল। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আরেকটি মাইলফলক স্থাপিত হলো। মেট্রোরেলের সবচেয়ে বড় দিক হলো এতে পরিবেশ দূষিত হবে না।’
দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সারা দেশে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এক দিনে ১০০টা সেতু, ১০০টা সড়ক উদ্বোধন আগে কেউ করতে পারেনি। বাংলাদেশে আজকে আমরা যে যোগাযোগব্যবস্থা করছি এটা শুধু বাংলাদেশ না, আমাদের আঞ্চলিকভাবে বা বিশ্বব্যাপী যাতে একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, সে ব্যবস্থাটাই নিচ্ছি। কারণ ভৌগোলিক অবস্থানটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। আমরা সেটাকেই কার্যকর করতে চাই। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোলমডেল।
পাতাল রেলসহ (এমআরটি-১) নারায়ণগঞ্জের ওপর দিয়ে তিনটি মেট্রোরেল করার পরিকল্পনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, অপর দুটি লাইন হচ্ছে এমআরটি লাইন-২ এবং এমআরটি লাইন-৪। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-২ গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এবং এমআরটি লাইন-৪ কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ হবে দেশের প্রথম স্মার্ট সিটি।
পাতাল রেলের কাজের জন্য মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হবে না বলে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পাতাল রেলের কাজ করার সময় মাটির নিচ থেকে বোরিং মেশিন দিয়ে গর্ত করে টানেল করা হবে। এখানে জনগণের চলাচলের কোনো সমস্যা হবে না। ভূপৃষ্ঠের ১০ মিটার নিচে কাজ হবে, ফলে ওপর থেকে বোঝা যাবে না যে মাটির নিচে কাজ চলছে। এই পাতাল রেলের পূর্বাচল অংশ হবে উড়ালপথ। এ ছাড়া বিমানবন্দর রুটে ১২টি পাতাল রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে। খননকাজের সময় মানুষের যাতে কোনো সমস্যা না হয় তার দিকে খেয়াল রাখা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব কাজ হবে। ইউটিলিটি বা পরিষেবা সরাতে হবে না। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এর নির্মাণকাজ পরিচালনা করব।
মেট্রোরেলের নির্মাণকাজে জাপানের ভূমিকার প্রশংসা করতে গিয়ে হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় নিহত জাপানের সাত নাগরিকের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সাতজনÑ যারা আমাদের মেট্রোরেলের পরামর্শক, তারা জঙ্গি হামলায় মারা গেলেন। তাদের স্মরণে আমরা স্মৃতিস্তম্ভ করেছি। এই ঘটনার পরেও জাপানের নেতারা হাত গুটিয়ে নেননি। এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাব।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘জনগণের সাহায্য-সহযোগিতায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার ঘোষণা দিয়েছিলাম। এখানে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। আমরা মানুষকে কতটুকু দিতে পারি সেটাই আমাদের বিবেচ্য বিষয়। নিজেদের টাকায় সেতু করে আমরা বিশ্বকে দেখিয়েছি। যতক্ষণ জনগণ সঙ্গে থাকবে কেউ কিছু করতে পারবে না।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমরা জনগণের সেবা করতে এসেছি। জনগণের সেবক। জনগণের ভাগ্য তৈরি করতে এসেছি, জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আসিনি। আমরা জনগণকে দিতে এসেছি। কাজে এখানে দুর্নীতির প্রশ্নই আসে না। স্বাধীন বাংলাদেশকে উন্নত করব, এখানে দুর্নীতি কিসের। বাংলাদেশর মানুষকে কতটুকু দিতে পারি সেটাই আমাদের বিবেচ্য বিষয়।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা থাকায় দেশে উন্নয়ন হচ্ছে বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে বলেই আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা শুরু করেছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। ইনশাল্লাহ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ হবে। মানুষ উন্নত জীবন নিয়ে যাতে বাঁচতে পারে সেই পরিকল্পনা ২১০০ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা বাংলাদেশকে নিয়ে এগিয়ে যাব, বাংলাদেশের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি কেউ থামাতে পারবে না। এজন্য আমি সকলের সহযোগিতা চাই।’
কাজের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমরা যে এত বছর কাজ করলাম। যার ফলে মানুষ আমাদের ভোট দিচ্ছে। আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে জনগণের আস্থা বিশ্বাস আমরা পাচ্ছি। জনগণের মন জয় করেই আমরা ভোট পাচ্ছি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কথা দিলে সেটা রাখে, আমরা সেই কথা রেখেছি। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, দেশের মানুষের উন্নতি হয়।’
বিএনপির সমালোচনা করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আজকে যতই আন্দোলন সংগ্রাম করুক যতক্ষণ জনগণ আমাদের সঙ্গে থাকবে, জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাব, এখানে কেউ কিছু করতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রিত্ব না, সব থেকে বড় পরিচয় আমি জাতির জনকের কন্যা। এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই আমার কাজ।’
করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে মন্দার ঢেউ উঠৈছে তা যেন বাংলাদেশে না পড়ে সেজন্য আবারও সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে প্রতি ইঞ্চি জমিতে কিছু না কিছু উৎপাদন করার পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, সবকিছুর দাম বেড়েছে। সবাইকে অনুরোধ করব কৃচ্ছ্রতা সাধন করতে হবে, সাশ্রয়ী হতে হবে। পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। সবাইকে হিসাব করে চলার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। আমরা আছি, সমস্যা হলে দেখব। এখন পর্যন্ত সবকিছু ম্যানেজ করে যাচ্ছি, করে যাব। তবে আপনাদেরও সহযোগিতা করতে হবে, সাশ্রয়ী হতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আন্দোলনের মরণযাত্রায় না গিয়ে নির্বাচনের যাত্রায় আসুন। ইলেকশনে যদি হারাতে পারেন আমরা বিদায় নেব।’
সমাবেশ মঞ্চে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট-১ আসনের এমপি শেখ হেলাল উদ্দীন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি একেএম শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের একেএম সেলিম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের নজরুল ইসলাম বাবু ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে গতকাল নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে গতকাল সকাল থেকেই রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই সমাবেশস্থলে হাজির হন। হলুদ-কমলা-নীলসহ বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও টি-শার্ট পরিহিত নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা বর্ণিল রূপ ধারণ করে। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বাসিন্দা ও উৎসুক মানুষও সমাবেশে যোগ দেন। বিপুল লোকসমাগমের কারণে সুধী সমাবেশটি শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় জনসভায়। সমাবেশস্থলের বাইরেও ছিল মানুষের ভিড়।
সাড়ে ২৪ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর
সংশ্লিষ্টরা জানান, পাতাল রেল চালুর পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কমলাপুর যেতে সময় লাগবে মাত্র সাড়ে ২৪ মিনিট। কমলাপুর থেকে পূর্বাচল যাওয়া যাবে ৪০ মিনিটে।
প্রকল্পের বিবরণ থেকে জানা যায়, এমআরটি লাইন-১ চালু হলে এ রুটে প্রতিদিন আট লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। এমআরটি লাইন-১-এর দুটি অংশ থাকবে। এর মধ্যে একটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত (বিমানবন্দর রুট) ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার। অন্যটি হবে ভূগর্ভস্থ, এতে ১২টি স্টেশন থাকবে। অপর অংশটি নতুন বাজার থেকে প্রায় ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার এলিভেটেড লাইনসহ পূর্বাচল পর্যন্ত (পূর্বাচল রুট)। এতে সাতটি স্টেশন থাকবে। বিমানবন্দর রুটের অংশ হিসেবে নতুন বাজার এবং নদ্দা স্টেশন হবে ভূগর্ভস্থ।
৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার এ প্রকল্পে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা দেবে জাইকা, বাকি ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। এই মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ডিএমটিসিএল। ২০২৬ সালের এমআরটি লাইন-১ নির্মাণ শেষ করতে চায় সরকার। ২০৩০ সাল নাগাদ রাজধানী ঢাকায় মোট ছয়টি মেট্রোরেল রুট উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।



