
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই: মোদি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে গতকাল হোয়াইট হাউজে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সর্বোচ্চ প্রটোকলের সঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে হোয়াইট হাউজে স্বাগত জানান জো বাইডেন ও মার্কিন ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন।
বৈঠক শেষে উভয়পক্ষের একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। এতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অংশীদারত্ব এক নতুন অধ্যায়, দিক ও শক্তি পেল। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশ, কোয়ান্টাম ও টেলিকম খাতে দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াবে।’
বৈঠক-পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে উভয়পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব এখন সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই দেশ দুটিকে একে অন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ভারতে ‘সংখ্যালঘুদের ওপর বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণতন্ত্র আমাদের ডিএনএর অংশ। আমাদের শিরায় প্রবাহিত হয় গণতন্ত্র। ভারত সংবিধানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সরকারও এর ওপরে ভিত্তি করেই চলে। সেখানে বৈষম্যের কোনো জায়গা নেই।’
এ সময় জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমরা প্রকৃতির অপব্যবহারে বিশ্বাসী নই। জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতই জি২০ সম্মেলনে করা প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে। ভারতকে সবুজ জ্বালানির হাবে রূপ দিতে আমরা কাজ করছি।’
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত ও চীনের সম্পর্ক এক রকম নয় বলে উল্লেখ করেন জো বাইডেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আর ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে ঠিক এক কাতারে ফেলা যাবে না। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের একে অন্যের প্রতি অগাধ সম্মান রয়েছে, কারণ আমরা উভয় দেশই গণতান্ত্রিক।’
এর আগে সকালে হোয়াইট হাউজে এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে হোয়াইট হাউজে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন। এ সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে ১৯ বার তোপধ্বনি করা হয়। বাজানো হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জাতীয় সংগীত।
এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে জো বাইডেন বলেন, ‘আমি ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময় থেকে আজ পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের একযোগে কাজ করার বিষয়টি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।’
জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার বন্ধনের ভিত্তি হলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। দুই দেশেই সংবিধানের শুরু হয়েছে ‘আমরা জনগণ…’ দিয়ে। উভয় দেশই নিজ নিজ বৈচিত্র্য নিয়ে গর্বিত। কভিড-পরবর্তী যুগে বিশ্বব্যবস্থা এক নতুন রূপ নিতে যাচ্ছে। বিশ্বের মঙ্গল, শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আমরা একযোগে কাজ করতে আগ্রহী।’
হোয়াইট হাউজের উদ্দেশে রওনা দেয়ার আগে গতকাল এক টুইট বার্তায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জো বাইডেনের সঙ্গে অনুষ্ঠেয় বৈঠকের অপেক্ষায় আছি। আজকের এ বৈঠকের মধ্য দিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে বলে আমি আত্মবিশ্বাসী।’
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে মার্কিন কংগ্রেসের এক যৌথ অধিবেশনে বক্তব্য রাখার কথা নরেন্দ্র মোদির। এরপর হোয়াইট হাউজে আনুষ্ঠানিক এক নৈশভোজে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে নরেন্দ্র মোদির। গতকাল বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে এ প্রতিবেদন লেখার সময় কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে বক্তব্য রাখার জন্য ক্যাপিটল হিলের পথে ছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যেই উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পক্ষ থেকে বেশকিছু বড় ঘোষণা দেয়া হয়। প্রতিরক্ষা খাত থেকে শুরু করে মহাকাশ অভিযান পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্দেশ্য থেকে এসব ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভিসানীতি শিথিলের পাশাপাশি উভয় দেশই পরস্পরের ভূখণ্ডে নতুন কনস্যুলেট খোলার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে।
ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য ফাইটার জেট ইঞ্জিন উৎপাদনে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকসের সঙ্গে একযোগে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন জায়ান্ট জেনারেল ইলেকট্রিকের অ্যারোস্পেস উইং। এর আগ পর্যন্ত অন্য দেশে এ ধরনের প্রযুক্তি স্থানান্তরের অনুমোদন দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে বিখ্যাত মার্কিন চিপ নির্মাতা কোম্পানি মাইক্রন টেকনোলজিকে ভারতে একটি সংযোজন প্লান্ট স্থাপনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। সেক্ষেত্রে মাইক্রন সেমিকন্ডাক্টর টেস্ট অ্যাসেম্বলি প্লান্টটি স্থাপন করা হতে পারে ভারতের গুজরাটে। এতে বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে ২৭৫ কোটি ডলার।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এইচ-১বি ভিসা প্রক্রিয়াকরণে পরিবর্তন ও নতুন কনস্যুলেট খোলার ঘোষণা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের ষষ্ঠ কনস্যুলেট খোলা হবে সিয়াটলে এবং আলাস্কা অঞ্চলকেও এর আওতায় আনা হবে।
মার্কিন নেতৃত্বে ২০২৫ সালে চাঁদে পুনরায় মানুষ পাঠানোর উদ্যোগ আর্টেমিস অ্যাকর্ডেও যোগ দিতে যাচ্ছে ভারত। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, এ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো মঙ্গল বা আরো দূরের গ্রহগুলোয় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো।



