
আব্দুস সালাম
তিন ভাইবোনের মধ্যে কনিষ্ঠ, ফারজানাই যেন বাবা বাদল মিয়ার চোখের মণি—একটি নীরব কুঁড়ি, যার প্রস্ফুটনের অপেক্ষায় তিনি জীবনের সারা জমানো ক্লান্তি ভুলে থাকেন।বাদল মিয়া ঢাকার এক গার্মেন্টসে কাজ করেন, জীবনভর পিঠে বোঝা বয়ে সংসার চালিয়ে এসেছেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন অভাবের বিপরীতে, কিন্তু মুখে একটিবারও ক্লান্তির ছায়া আনেন নি।
বড় ভাই শহরে একটা মুদির দোকান দিয়েছে, নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আর বড় বোন নাবিলা বিয়ের পর যেন জীবনের আরেকটা আকাশে বসবাস করা তারা—দূরে আলোকিত, কিন্তু ছোঁয়ার নয়।
ফারজানা যেন বাদল মিয়ার সংসারে এখনো একটি অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাস মাত্র।
ঘরবাড়ির অভাব ছিল ঠিকই, তবু ফারজানার মুখে ছিল একরকম প্রশান্তি। যেন শিউলি ফুলের মতো—ঝরে পড়েও মাটি ছোঁয় না, আকাশেই গন্ধ বিলায়। তার চোখের পাতা দুটি যেন ছিল পদ্মপাতার জলে টলটল করা শুভ্রতা।
পাড়ার একপ্রান্তে আরহামদের বাড়ি। সে মেধাবী ছাত্র। একসময় ফারজানা তার কাছে পড়তে যেত। শান্ত ও মিষ্টভাষী। শ্যামবর্ণের সুকেশা নারী—যেন শরতের ভোরে কুয়াশার আলতো ছায়া। কাঁচা পাকা ঘরে তার বসবাস। কাঁচা বয়সে কাঁচা আবেগ জন্মায় সহজে, তবু তার আবেগ ছিল পরিপক্ব, নীরব, গভীর—আকাশের অতল তারার মতো।
ওদিকে আরহামের বাড়ি ছিল বেশ ভালো, দোতলা পাকা ঘর, উঠোন জুড়ে আম-কাঁঠাল গাছ। সেই বাড়ি যেন আধুনিক যুগের এক নিঃসঙ্গ জমিদারবাড়ি—উঁচু দেয়াল, লোহার গেটের পাশে নীরব দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরী, বারান্দায় গর্বভরা পায়চারায় ব্যস্ত এক ধবধবে বিড়াল।কিন্তু আরহামের চোখে ছিল একরকম কোমলতা, যা বইয়ের পাতা ছাড়িয়ে ফারজানার হৃদয়ে ঠাঁই নেয়।
আরহাম একদিন মনের গহীনে জেগে ওঠা ভালোলাগার কথাটি ফারজানাকে জানায়।
ফারজানা তার মিষ্টি কণ্ঠে, কিন্তু দৃঢ় উচ্চারণে বলে, ‘আমার আপনার অবস্থান দুই মেরুতে। আমরা আপনাদের যোগ্য নই।’
আবেগের কাছে সে নতি শিকার করে না। সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়, কিন্তু তার চোখের পলকে লুকানো ছিল এক গভীর কাঁপুনি।
ফারজানা আরহামের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় সে তাকে আপন করে পাওয়ার জন্য আরো মরিয়া হয়ে ওঠে।
ফারজানা যেন অধরা। আরহাম যত কাছে আসে, ফারজানা তত দূরে সরে যায়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফারজানা হার মানে—না, আত্মসমর্পণ করে না, কিন্তু ভালোলাগার কাছে নিঃশব্দে নত হয়।
এই ‘ভালো লাগা’ একদিন বিয়েতে পৌঁছায়।
কিন্তু বিয়ের পর সব কেমন বদলে যায়। আরহামের মা ও বোন যেন তাঁর স্ত্রীটিকে আপন ভাবতেই চায় না। যদি কোন তরকারিতে স্বাদ না হয় কিংবা ভালো কোন খাবার রান্না করতে না পারলে শাশুড়ি বা ননদের কণ্ঠ হতে বিষাক্ত তীরের মতো ছুটে আসত কথাগুলো—’ও পারবে কিভাবে? ওরা তো গরিব—জীবনে খেয়েছে কিনা তাই সন্দেহ?’
সেই শব্দে শব্দে যেন ফারজানার আত্মার উপর কাঁটা বিছিয়ে যেত।
মেহমান এলে বলতো, ‘কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তাও শেখো নি। আর শিখবেই বা কিভাবে? তোমরা সেই পরিবেশে মানুষ হওনি।’
জীবনের প্রতিটি দিন যেন অপমানের দহন হয়ে দাঁড়ায়। আর আরহাম… সে যেন এক অদৃশ্য দূরত্বে হারিয়ে যায়।
এক রাতে ফারজানা ধীরে বলে, ‘তুমি তো বলেছিলে, আরহাম‘তোমার হাত ছেড়ে কোনোদিন যাব না।’
তবে আজ এই চোখ ফেরানোর অর্থ কী? তুমি কি সত্যিই বদলে গেছ?’
আরহাম চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘কিছুদিন বাবার বাড়ি গিয়ে থাকো, ফারজানা…’
ফারজানা নত মুখে, নিঃশব্দে এক দীর্ঘশ্বাস বুকের গভীরে চেপে, বাড়ি ফিরে আসে। বাবা বাদল মিয়া মেয়ের মুখ দেখে কিছু বলেন না— শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, যেন তপ্ত দুপুরে ছায়া হারা এক বৃক্ষ।
গ্রামখানার প্রান্তে, এক ছোট্ট কাঁচা পাকা ঘরে ফারজানার বসবাস। চৈত্রের শেষ বিকেল। বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস— যেন কারো না বলা বেদনার স্তব্ধ প্রতিধ্বনি। মুখখানি যেন শুকনো তালপাতার মতো বিবর্ণ, চোখদুটি ক্লান্ত নদীর মতো স্থবির। কতদিন যেন সে কথা কয় না, হাসে না, কাঁদেও না— শুধু সহ্য করে।
এভাবে দিনগুলো চলে যায়। আরহাম একসময় ঢাকা শহরে চাকরি পায়। বাসা ভাড়া করে থাকে। প্রথম প্রথম স্ত্রীর খোঁজখবর না নিলেও স্ত্রীর জন্য তার মনটা পুড়তে থাকে। সে উপলব্ধি করে—দারিদ্রতা কোন অভিশাপ নয়। ভালো রান্না করা কিংবা মেহমানদারী করা সবই অভিজ্ঞতার বিষয়। মা-বোনদের অসাড় অনুযোগে স্ত্রীর প্রতি অবিচার করা যে কত বড় ভুল ছিল—তা তার অনুশোচনায় একে একে স্পষ্ট হয়।
সে ভাবে—’আমার স্ত্রীকে আমার কাছে রাখব। আমি তাকে সবকিছু শিখাবো। বড্ড দেরি করে ফেলেছি আমি। আর নয়—আর দেরি নয়।’
ঠিক তখনই সে শুনতে পায়, ফারজানা হাসপাতালে, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। তার ভিতরে যেন কোনো বরফ গলে যায়। সে ছুটে আসে। হাসপাতালের বিছানায় স্ত্রীকে দেখে চোখে জল আসে তার।
‘ফারজানা…’
‘আরহাম… তুমি… তুমি এলে?’
‘তোমার মুখটা এতদিন না দেখে যেন জীবনটাই থমকে গিয়েছিল, ফারজানা… তোমায় ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না, জানো?’
ফারজানা নিশ্চুপ থাকে। তার কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি আরহামের অপরাধ ধরিয়ে দেয়। আরহাম অনুতপ্ত হয়ে বলে, ‘আমি ভুল করেছিলাম, ফারজানা। আমি তোমাকে বুঝিনি। আমি চোখ বুঁজেছিলাম অন্যের কথায়, কিন্তু হৃদয় তোমাকে ছাড়া কখনো দিক খুঁজে পায়নি, ফারজানা— আমি তোমাকে আবার চাই—এই জীবনে, এই প্রাণে, এই ভালোবাসায়।’
ফারজানার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়ায়। থামতে চায় না।
আরহাম চিকিৎসকের দিকে ফিরে বলে, ‘ডাক্তার সাহেব, রক্ত লাগলে আমার নিন। যত টাকা লাগে আমি দেব। ওর মুখে আবার হাসি দেখতে চাই।’
ফারজানা তার ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে বলে, ‘তুমি পাশে থাকলে, আর দুঃখ বলে কিছু থাকে না, আরহাম… মরেও যেন নতুন করে বাঁচার সাহস পাই।’
আরহাম ফারজানার কপালে চুমু খায়।
‘তুমি আমার, আমি তোমার। এইটুকুই সত্য।’
সুস্থ হওয়ার পর ফারজানাকে নিয়ে সে ঢাকায় ফেরে।
নতুন ভাড়া বাসা, নতুন সাজানো সংসার, কিন্তু এইবার সবটাই সত্যিকার আপন, আপন বললে যেনও কম বলা হয়— এ যেন হৃদয়ের গৃহপ্রবেশ।
একদিন রান্নাঘর থেকে ফারজানা সস্নেহ কণ্ঠে ডাকে, ‘আরহাম, আজ আমি তোমার প্রিয় খাবারটা রান্না করেছি।’
তার কণ্ঠে ছিল এক অমলিন উৎসাহ, এক সহজ-স্নিগ্ধ ভালোবাসার ছায়া।
আরহাম নিঃশব্দে গিয়ে পেছন থেকে তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে, তার চোখে একরাশ প্রশান্তি, ঠোঁটে এক ম্লান হাসি, ‘তুমি থাকলে প্রতিটি দিনই যেন উৎসবের মতো মনে হয়… যেন প্রতিটি সকাল হয় নববর্ষ, আর প্রতিটি সন্ধ্যা হয় পূর্ণিমা।’
রাতের ছাদে বসে তারা আকাশ দেখে— নীল আকাশের আঁচলে ঝলমল করে তারার মিছিল। হাওয়া এসে ফিসফিস করে তাদের দুই হৃদয়ের মাঝখানে।
তারার নিচে ফারজানা ধীরে বলে, ‘জানো, আমি তো ভেবেছিলাম… তুমি আর কোনোদিন ফিরবে না।’ তার কণ্ঠ যেন নীরবতা ভেদ করে উঠে আসে— ভাঙা বাঁশির মতো কাঁপা কাঁপা।
আরহাম ফারজানার হাত ধরে, ‘ভালোবাসা কখনো বিদায় নেয় না, ফারজানা। সে কখনো কখনো নীরব থাকে, অপেক্ষা করে—যতক্ষণ না হৃদয় তাকে চিনে ফেলে।’
তার কণ্ঠে ছিল এক অনুতপ্ত কোমলতা, এক দেরিতে ফোটা বোধের জ্যোৎস্না।
আর তারা দুজন বসে থাকে—
নীরবে, পাশে পাশে—
ভালোবাসার ঘ্রাণে ভেজা বাতাসে, অনুতাপের দীর্ঘশ্বাসে ধুয়ে নেওয়া সম্পর্কের রেখায়,
আর এক নতুন জীবনের স্নিগ্ধ প্রতিশ্রুতিতে…
যেখানে শব্দ নয়, চোখের চাহনি হয়ে ওঠে ভাষা, আর স্পর্শে ফিরে আসে বিশ্বাস।



