গল্পসাহিত্য

অনুবাদ গল্পঃ আগন্তুক

অনুবাদঃ সুলতানা পারভীন শিমুল

 

মূল গল্পকার: পেরি ম্যাকগি

লোকজনের বোকামি দেখে আমি মাঝেমাঝে খুবই বিরক্ত হই।

আজকের কথাই ধরুন, বিরক্ত হয়েই সিদ্ধান্তটা আমাকে নিতে হলো। গ্যাস নেবার পর সবুজ রঙের গাড়িটা স্টার্ট করতেই লাফাতে শুরু করলো, লাফাক। আমার আপত্তি নেই। কিন্তু তাই বলে কাদা ছিটিয়ে দেবে আমার গায়ে! আবার প্যাঁ পোঁ করে হর্ণ দিচ্ছে তো দিচ্ছেই। কানের বারোটা বাজিয়ে দিলো। এই বেকুব লোকটা আমার সামনেই কেন তখন এই কাজ করতে গেলো, কে জানে।

কারণটা সেও জানাতে পারবে না আর। তার মাথায় সংকেত পাঠিয়ে দিয়েছি আমি। কখন যেন পাঠালাম ..উমম, সকাল দশটা হবে বোধহয়। আর এখন বিকেল। এতোক্ষণে তো ব্যাটা নিশ্চয়ই মরে গেছে। অন্তত তাই তো হওয়ার কথা। বেক্কল লোকজন আমার দু’চোখের বিষ।

দিনের বেলা এই গ্যাস স্টেশনটাতে কাজ করি আমি। আর রাতের বেলা করি তাজা মাংসের ভুরিভোজ। মন্দ না কিন্তু ব্যাপারটা। গৃহহীন মানুষ আর বিভিন্ন পথে আসা হরেক রকম ভাসমান মানুষের সংখ্যা এই মেট্রোপলিটন শহরে নেহায়েত কম না। অন্তত লম্বা একটা সময়ের মধ্যে আমার খাবার দাবার নিয়ে তেমন সমস্যা হওয়ার কথা না। সমস্যা মানে, লোকাল পুলিশ আর কি। রাস্তার মানুষ হারিয়ে গেলে সেটা নিয়ে পুলিশে নিখোঁজ সংবাদ দিতে যায় না কেউ। কাজেই ঝামেলা হয় না।

বাইরে থেকে যারা এই শহরে আসে, অনেকেই তুলনামূলকভাবে সস্তা হোটেলগুলোর খোঁজ জানতে চায়। ব্যাপারগুলো সবসময় একইভাবে শুরু হয়। যখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করি, কতোটুকু গ্যাস লাগবে, নিজে থেকেই তারা বলতে শুরু করে, কোন হোটেলে তারা উঠেছে, সেখানে সুযোগ সুবিধা কিরকম, কেন এসেছে, কিছু টুকটাক কাজের কথা। লোকজন আসলে কথা বলতে ভালোবাসে। আর সেটা বরং আমার খোঁজাখুঁজির পরিশ্রম কমিয়ে দেয় অনেকখানি। কাজ শেষ করে ডিনার করার জন্য আমি শুধু জায়গামতো পৌঁছে যাই।

মালিকের নাম বব। বব ডোবারম্যান। তার কড়া নির্দেশ, কর্মক্ষেত্রে আমাদেরকে নেমপ্লেট পরেই থাকতে হবে, এবং সেটা ডাক নাম। বব বলে, তাতে লোকজনের মনে রাখতে আর ডাকতে সুবিধা। কাজেই আমার বুকে লাগানো নেমপ্লেটে সাদার ওপর কালো দিয়ে লেখা চারটে অক্ষর ফুটে থাকে, এম, এ, সি, কে। নীল আর ধুসরে চেক একটা শার্ট আর একই কম্বিনেশনে ডোরাকাটা একটা প্যান্ট হলো আমাদের ইউনিফর্ম। কিম্ভুত! এটা কোনো ইউনিফর্ম হলো! পরলে এতো হাস্যকর লাগে, যে মাঝেমাঝে আমার ইচ্ছে করে ব্যাটাকে এই পোশাক পরিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখি। হালার পো! তবে উল্টাপাল্টা কিছু করা যাবে না। আপাতত বোকা বোকা চেহারা নিয়ে নিরীহভাবেই কাজ করে যাই। এমন একজন মানুষ, যাকে আলাদা করে চোখে পড়ার কিছু নেই। চোখে পড়লে ঝামেলা অনেক।

যেমন কাল রাতে আমি এক নিশিকন্যাকে হাপিশ করে দিলাম, অথচ খুঁজে দেখলাম, আজকের কোনো পেপারে তার উল্লেখ পর্যন্ত নেই। যেন হারিয়ে যাওয়া মেয়েটার কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। এমনিতে নিশিকন্যারা আমার খুব একটা পছন্দ না। কিন্তু মাঝেমাঝে পছন্দের খাবার ঠিক হাতের কাছে মেলেও না। কাজেই কী আর করা! ওই দিয়েই চালাতে হয়। মাঝেমাঝে রুচি বদলানো খারাপ না। তবে অবাক ব্যাপার হলো, মেয়েটা আমার সাথে লড়াই করেছে। এরকম আগে হয়নি কখনো। প্রথমে আর সবার মতোই ওর মাথায় সংকেত পাঠালাম আমি। কাজ হলো না বলে এর পরেরটা আরো শক্তিশালি করলাম। আজব! মেয়েটার কিছুই হলো না! বাধ্য হয়ে ওকে আঘাত করতে হলো। কেটে ছড়ে যাওয়া খাবার আমার ভীষণ অপছন্দ। কিন্তু কী আর করা, ক্ষিদেও যে পেয়েছিলো ভীষণ।

ডেজার্ট হিসেবে খুলির ভেতরের অংশটা কিন্তু দারুণ! ওটার ব্যবস্থা করতে গিয়েই আসলে ব্যাপারটা খোলাসা হলো। বুঝতে পারলাম, কেন সে আমার সংকেত ধরতে পারছিলো না। তার মাথায় বসানো একটা ধাতব প্লেট। কোনো দুর্ঘটনার ফসল। এরকম তো হবেই। তবে, টেকনিক জানা থাকলে মানুষের মাথার খুলি ফাটানো এক চুটকির ব্যাপার মাত্র। ঠিক লবস্টারের খোসা ছাড়িয়ে খাওয়ার মতোই সহজ। জায়গামতো ধরে মেঝেতে ঠুকে দেয়া, একেবারে দুই ফাঁক। তারপর চামড়া সরিয়ে নারকেলের শ্বাসের মতো তুলে খাওয়া। আহ! জিভে পানি এসে গেলো! জায়গামতো ধরাটাই আসল কথা। কিন্তু নিশিকন্যার খুলির ভেতরের অংশে পৌছাতে পৌছাতে ওটার অবস্থা প্রায় ন্যাতা ন্যাতা হয়ে গেলো। শেষমেষ যখন নরম প্যাঁচানো প্যাঁচানো অংশটা দেখতে পেলাম, ততোক্ষণে আমার ডেজার্ট খাওয়ার ইচ্ছেটাই মরে গেছে। তবু খেলাম। অতো কষ্ট করলাম যখন।

মগজ খেতে ভালোই। কিন্তু তারচেয়ে বেশি ভালো হৃৎপিন্ড। তুলনামূলকভাবে নতুন রক্তে মাখামাখি হয়ে থাকা নরম জিনিসটার স্বাদই অন্যরকম। ইয়ামি! প্রত্যেকবার একটা হৃৎপিন্ড যেন আমাকে নতুন একটা জীবন দেয়।

ওহ.. আমি আসছি। একটু দাঁড়ান প্লিজ। একজন কাস্টোমার এসেছে…….

হ্যাঁ, তারপর, কী যেন বলছিলাম… ওহ। আমার খাওয়ার কথা…

পরিষ্কার করার ব্যাপারটা যে কি বিরক্তিকর! এমনিতেই পেট ভরে খাবার পর আমার আর নড়াচড়া করার মতো অবস্থাই থাকে না, সব পরিষ্কার করার কথা ভাবতেই তাই বিরক্ত লাগে। ইশ! যদি ভরপেট খেয়েদেয়ে ইচ্ছেমতো শুয়ে থেকে থেকে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যেতো! কি যে ভালো হতো! কিন্তু হায়! বিধি বাম। অতো বিলাসিতা করার মতো কপাল কি আর আছে আমার!

হাতের কাছে নদীটা ছিল বলে রক্ষা। নইলে আশেপাশে পুলিশ আমার ভালো লাগে না। তবে প্রথম প্রথম এতো বুদ্ধি ছিলো না আমার। স্রেফ খাবারের অবশিষ্টাংশ নিয়ে গিয়ে নদীতে ফেলে দিতাম। ভাবতাম, ভেসে চলে যাবে দূরে। কিন্তু কাজটা বোকার মতো হয়েছিলো। তখন শহরের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামে কিসের যেন একটা খেলা চলছিলো, জমজমাট লোকজন, পুলিশ দুটো লাশ খুঁজে পেলো, ভাটার টানে চলে আসা। যদিও লাশ দুটো কয়েকদিনে যথেষ্ট পঁচে-গলে চেনার উপায় ছিলো না। তবুও দেখা গেলো যে স্থানীয় পুলিশরা একেবারে ঘাস খায় না। মাছে খাওয়া, আর অন্য জিনিসে খাওয়ার মধ্যে পার্থক্যটা তারা ঠিকই ধরতে পেরেছিলো। ওইটুকুই। এর বেশি করার সাধ্য ওদের ছিলো না। শেষে এফবিআই এসে নাক গলালো। অবশ্য তারাও বেশি কিছু করতে পারলো না। সন্দেহজনক কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। মৃতদের পরিচিত কেউ না থাকায় ব্যাপারটা চাপা পড়ে যেতে সময় লাগেনি।

তবে তারপর থেকে আমি সতর্ক হয়েছি। এখন ক্যানভাসের ব্যাগে ভরে কোনো ভারি মোটর পার্টসের সাথে বেঁধে তারপর পানিতে ফেলি। ববের গ্যাস স্টেশনে বারো ফুট উঁচু জঞ্জাল স্তুপ করা আছে কী করতে। বব এই পার্টস হারানোর ব্যাপারটা টের পায় কি না, বুঝি না। কখনো তো কিছু বলেনি। গতরাতের মেয়েটাকে ফেলে দেবার আগে মিশরীয় মমির মতো করে শক্ত করে বাঁধতে হয়েছে। কী করবো, হাতের কাছে কোন ক্যানভাস ব্যাগ পেলাম না। তবে আশা করি ঝামেলা হবে না। কোনোভাবে যদি ওকে উদ্ধার করা যায়ও, মাছের ভুরিভোজনের পর চেনার মতো অবস্থা নিশ্চয়ই থাকবে না। সত্যি বলতে কি, পুলিশের বরং আমার ওপর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আমি ওদের ভাসমান মানুষ উচ্ছেদে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছি। তাই না, বলুন?

ওহ, আরেকজন কাস্টোমার। এক মিনিট। এক্ষুনি আসছি……

আরিব্বাহ! এই লোক তো আজব দেখি! গ্যাসের দাম পরিশোধ করে বাড়তি একশো টাকা দিলো আমাকে। চোখ টিপে বললো, রাজি হলে আরো দেবে। সমকামী, বুঝতে দেরি হলো না। সঙ্গী খুঁজছে। আমার পছন্দের তালিকায় পুরুষরা নেই। আর সপ্তাহে দুই তিনবারের বেশি খেতেও হয়না আমার। কিন্তু যেচে পড়েই হাতের মুঠোয় আসতে চাইছে যখন, পায়েই বা ঠেলি কেন। আসুক ব্যাটা। পাঁচ বছরের এই সময়ে আমি তিনটে পুরুষ উদরস্থ করেছি মাত্র। প্রতিবারই ঠেলায় পড়ে। সেগুলো স্বাদ ভুলিনি এখনো। কেমন শক্ত শক্ত আর আঁশওয়ালা মাংস। আর হৃৎপিন্ড শেষ করার পরে কেমন একটা তিতকুটে স্বাদ লেগে থাকে মুখে। মোট কথা, আমার ভালো লাগেনি। মেয়েরাই ভালো। যাই হোক, আমিও একটু খেললাম তার সাথে। সন্ধ্যার পর, ডিউটি শেষ হলে আমাকে নিতে আসবে সে।

পাঁচ বছরের বেশি আগের কথা আমার মনে পড়ে না। কোথ্থেকে এসেছি, কোনো আত্মীয়-স্বজন আছে কি না, জানি না আমি। মাঝেমাঝে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি একটা জায়গা, বসতিবিহীন, বাতাসবিহীন, স্পন্দনবিহীন কিন্তু বিপদসংকুল, ভীষণ অন্যরকম একটা জায়গা। কে জানে, হয়তো অন্য একটা গ্রহ থেকে কোনোভাবে ছিটকে এসেছি, কিংবা কোনো ল্যাবরেটরিতে হয়তো পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা হয়েছে, জানি না আমি। কিন্তু এটুকু জানি, কারো মনে সন্দেহের উদ্রেক না করেই, এখানকার আর সবার সাথেই মিশে থাকতে পারি আমি, যতোক্ষণ না কোনো ভুল করে ফেলছি। একটা ভুল, আর আমি শেষ।

আর আরেকটা জিনিস বলতে চাই… ইয়াল্লা! এটা সেই গাড়িটা না, সকালের সবুজ করোনা? কিন্তু কিভাবে সম্ভব! ওর তো বেঁচে থাকার কথা না! আমার হলোটা কী! সংকেত পাঠানোর ক্ষমতা কি হারিয়ে ফেলছি নাকি? স্বল্পস্মৃতির ছোট্ট এই জীবনে প্রথমবারের মতো আমি ভয় পেলাম। লোকটা সত্যিই অদ্ভুত। সোজা আমার দিকে তাকালো। উফ, গাড়ির ভেতরে বসে থেকেও যেন সে আমাকে ছূঁয়ে দিতে পারছে! মাথা কেমন ঝিমঝিম করছে। চিন্তা করতে পারছি না। কী যেন একটা হচ্ছে.. আমার ধারণা… না না, ধারণা না… হ্যাঁ.. সে সংকেত পাঠাচ্ছে আমার মাথায়। ঠিক আমারই মতো… ও ঠিক আমারই… কিন্তু..

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension