
জামায়াতের জাতীয় সমাবেশ অনেক কথা বলছে

হাসান মামুন
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশটি সুবিশাল হবে– অনুমেয় ছিল। কর্মী-সমর্থকদের অল্প সময়ে জড়ো করে সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা তার বরাবরের। বিগত শাসনামলে কঠিনভাবে আক্রান্ত হওয়ার পরও দলটি যে দুর্বল হয়নি– এই সমাবেশ তারও প্রমাণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানও জামায়াত-শিবিরের মধ্যে নব-উদ্দীপনা এনেছে। এতে দলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ক্ষমতাচ্যুতদেরও মানতে হবে, নজিরবিহীন দমনপীড়নেও জামায়াত কিংবা বিএনপিকে দুর্বল করা যায়নি। পতনের আগমুহূর্তে শেখ হাসিনা সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধও করেছিল।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তার আগে নিষিদ্ধ হয় ছাত্রলীগ। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। এর বিচারিক নিষ্পত্তি একান্ত প্রয়োজন। কেউ কেউ বলছেন, বিচার সম্পন্নের আগে নির্বাচন নয়। অন্য কেউ বলছেন, নির্বাচনের পরও বিচার থাকবে অব্যাহত। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের অভিযোগমুক্ত অংশটি নিয়ে কী করা, সে প্রশ্ন উঠছে। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার কি তাদের থাকবে না? এর মানে কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নয়; নিজ পছন্দে সংগঠিত হওয়ার অধিকারও। দলটির অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইসিটিতে বিচার সম্পন্নের আগে অভিযোগমুক্তরা কি অন্য নামেও সংগঠিত হতে পারবে না?
জামায়াতের নব-উত্থান দেখেও প্রশ্নটা জাগা স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধে রাখা ভূমিকা ঘিরে এর শীর্ষ নেতাদের বিচারে একের পর এক মৃত্যুদণ্ডেও দলটি কিন্তু নিঃশেষ হয়নি। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে আর ফিরতে না দেওয়ার যে আওয়াজ তোলা হচ্ছে, সেটাও কি সম্ভব হবে চলমান ব্যবস্থা গ্রহণের ধারায়? যারা সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত, তাদের ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। সবকিছুর পরও আওয়ামী লীগের সমর্থকগোষ্ঠীর অস্তিত্ব তো অনস্বীকার্য। কোনো না কোনোভাবে তাদের ‘অন্তর্ভুক্ত’ করেই দেশ পুনর্গঠনে এগিয়ে যেতে হবে। হালে গোপালগঞ্জে যা ঘটেছে, সেটি অবশ্য ভিন্ন বিষয়। তবে সারাদেশেই দলটির যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে, তা বিভিন্ন জরিপেও উঠে আসছে। জাতিসংঘসহ পশ্চিমা মহল থেকেও বলা হচ্ছে এদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে না রাখার কথা।
জামায়াতের সুবিশাল সমাবেশ দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর মন খারাপের কারণ হবে। কিন্তু দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা যে এ দেশের একাংশ, সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না। সেনাশাসন অবসানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তার ভোট হয়তো আরও বাড়বে। নির্বাচনের অবশ্য ক’মাস বাকি। এর মধ্যে যা যা ঘটবে, তারও প্রভাব থাকবে ভোটার মনস্তত্ত্বে। বিগত শাসনামলে তিনটি ভুয়া নির্বাচন এবং এর মধ্যে নতুন অনেক ভোটার যুক্ত হওয়ায় আগামীতে কোন দল কেমন করবে, বলা কঠিন। রাজধানীতে সুবিশাল সমাবেশ করার সক্ষমতা মানেই ভোট বৃদ্ধি নয়। তবে ভোট বাড়বে ধরে নিয়েই জামায়াত সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন চাইছে। জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলো একত্রে নির্বাচনে লড়বে, এমনটাও শোনা যাচ্ছে। সেটা সম্ভব হলে ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিএনপির জন্য নির্বাচন চ্যালেঞ্জপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন লাভের আশা।
জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে অনেক রাজনৈতিক দল আমন্ত্রিত হলেও বিএনপি আমন্ত্রণ পায়নি। সেটা নাকি পিআর ঘিরে জামায়াতের সঙ্গে তার গভীর মতপার্থক্যের কারণে। তবে জামায়াত আমির বক্তৃতা মঞ্চে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে তাঁকে দেখতে যান বিএনপির দুই সিনিয়র নেতা। জামায়াতের সমাবেশে দলটিকে উদ্দেশ করে কম সমালোচনামূলক বক্তব্য রাখা হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর দলটির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চাঁদাবাজি শুরুর অভিযোগ উঠেছে। ইঙ্গিতে সেটা বলতেও কেউ ভোলেননি। বিএনপির জন্যই পিআরসহ ‘মৌলিক সংস্কার’ কার্যক্রমে অগ্রগতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে সরাসরি। সংস্কারে দলটি সতর্ক বটে। নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতায় যাবে– এটা ধরে নিয়েই সতর্ক। অধিক শাসনতান্ত্রিক সংস্কার দেশ পরিচালনা কঠিন করে তুলতে পারে বলে শঙ্কা তারা গোপন করছেন না। এ ক্ষেত্রে জামায়াত ও তার মিত্ররা স্বভাবতই চাইছে পিআর পদ্ধতিতে পার্লামেন্টে অধিক আসন নিশ্চিত করতে।
রাজনীতিতে কৌশল থাকবেই। ক্ষমতায় যেতে কিংবা পার্লামেন্টে বেশি ক্ষমতাবান হতে চাওয়া কোনোটাই দোষের নয়। তবে কেউ কাউকে চাপে ফেলে সংস্কারে বাধ্য করা অগ্রহণযোগ্য। এ অবস্থায় পিআর পদ্ধতিতেই নির্বাচন হতে হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হলে সংকট বাড়বে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন থেকে কিন্তু বলা হচ্ছে, ‘রাজনৈতিক ঐকমত্য’ না হলে কোনো সংস্কার নয়। মাঠের রাজনীতিতে অবশ্য অনেক বেপরোয়া কথাবার্তা বলা হয়ে থাকে, যা মনের কথা নয়। এসব বলে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে যেটুকু আদায় করা যাবে, সেটাই হয়তো লক্ষ্য। পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে আসন বণ্টনের দাবিটুকুও যদি এভাবে আদায় হয়, সেটা কম হবে না।
জামায়াতের সমাবেশে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে তেমন কিছু বলা হয়নি; বলা হয়েছে মূলত বিএনপিকে উদ্দেশ করে। বিএনপির সমাবেশগুলোয় কিন্তু বিপরীতটাই বলা হচ্ছে। একই দিন এক সভায় দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ‘অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো একটি অংশের সহায়তায় কেউ কেউ দেশে উদ্দেশ্যমূলক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে কিনা’ এবং এ সরকারের পক্ষে ‘আদৌ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব কিনা’– জনমনে সৃষ্ট এমন সব ধারণার উল্লেখ করেছেন। লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর বৈঠকে নির্বাচনের সময় নিয়ে যে ‘সমঝোতা’ হয়েছিল, সেটা ফিকে হয়ে এসেছে বলেও মনে হচ্ছে। ‘সরকার-ঘনিষ্ঠ’ বলে বিবেচিত এনসিপি ও জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির বিরোধ বৃদ্ধিতে এর প্রতিফলন রয়েছে বললে কি ভুল হবে? জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে বিএনপির না যাওয়ার ঘটনাকে হালকা করে দেখা যাবে না। এতে রাজনৈতিক মেরূকরণ স্পষ্টতর বলেই মনে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হবে, এটা স্বাভাবিক। জুলাই পদযাত্রায় এনসিপি অনেক ক্ষেত্রে ভালো সাড়া পাচ্ছে অবশ্য। কিন্তু রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে আরও সময় লাগবে তাদের। হতে হবে কুশলীও। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সহযাত্রী জাতীয় পার্টি পড়েছে অন্তর্দ্বন্দ্বে। জামায়াতে এমন সংকট নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দলটির স্লোগানও জনগণের একাংশে আগ্রহ জাগাবে। জামায়াত কখনও একা সরকার পরিচালনা করেনি; সেটাও একটা বিষয়। এসব দিক দলটিকে চাঙ্গা রাখবে নির্বাচন পর্যন্ত। এর মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন দেশে ফিরলে অবশ্য পরিস্থিতি বদলে যেতেও সময় লাগবে না।
জুলাই সনদ ও এর ঘোষণাপত্র নিয়ে জটিলতা না বাড়লে নির্বাচনে যাওয়া সহজতর হবে। থেকে থেকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে কেন, সেটা নিয়ে অবশ্য চলছে জল্পনা। এক বছর হতে চললেও অন্তর্বর্তী সরকার বিচার, সংস্কার, নির্বাচন কোনো ক্ষেত্রেই পরিপূর্ণ আস্থা জাগাতে পারছে না বলেও এত শঙ্কা চারদিকে। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ পরিস্থিতি আবার বলে দিচ্ছে, জায়গায় জায়গায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগও কিছু চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সক্ষম। গণঅভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান বিভেদ ও সরকারের নানাবিধ দুর্বলতায় চ্যালেঞ্জ বেড়ে উঠলে অবাক হওয়া যাবে না।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক



