
সপ্তম নৌবহরের ব্যর্থতা
সপ্তম নৌবহর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডের বাইরে সবচেয়ে বড় নেভাল ফোর্স । এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের একটি অংশ। বর্তমানে এর প্রধান ঘাঁটি জাপানের ইয়োকোসুকাতে। আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত ও শক্তিশালী জাহাজগুলোই সপ্তম নৌবহরে থাকে। ৬০ থেকে ৭০টি যুদ্ধ জাহাজ, ২০০-৩০০টি যুদ্ধ বিমান, প্রায় ৪০,০০০ নৌসেনার সমন্বয়ে এটি আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবহর।
একাত্তরের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত জেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে সপ্তম নৌবহরের বেশির ভাগ জাহাজ ভিয়েতনামের কাছাকাছি থাকায় প্রেসিডেন্ট নিক্সন ৯ ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা দিতে আদেশ দেন। কিন্তু রাশিয়া ও ভারতের হুশিয়ারি ও পাল্টা ব্যবস্থার কারণে নিক্সনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নির্দেশের ভিত্তিতে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহরের কয়েকটি জাহাজ নিয়ে ‘টাস্কফোর্স ৭৪’ গঠন করা হয়। জাহাজগুলো সিঙ্গাপুরে একত্র হয়ে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। সপ্তম নৌবহরে যে সব জাহাজ ছিল সেগুলো-
১. ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ: বহরের জাহাজগুলোর মধ্যে প্রধান জাহাজটি হল ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ। এই ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ সে সময়কার বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী জাহাজ। এখন পর্যন্ত এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ। ৭৫টি জঙ্গি বিমান বহন করছিল যার অধিকাংশ ছিলে এফ-ফোর ফ্যান্টম ফাইটার। বঙ্গোপসাগরে আসার সময় এন্টারপ্রাইজ নিউক্লিয়ার বোমাও বহন করছিল। এটি ছিল টাস্কফোর্স-৭৪ এর প্রধান যুদ্ধজাহাজ।
২. ইউএসএস ত্রিপোলী: এটি একটি অ্যাম্ফিভিয়াস (উভচর) এ্যাসল্ট শিপ। এতে তখন ২০০০ মেরিন সৈন্যের ব্যাটালিয়ন ও ২৫টি এ্যাসাল্ট হেলিকপ্টার ছিল।
৩. ইউএসএস কিং: গাইডেড মিসাইলবাহী ডেস্ট্রয়ার।
৪. ইউএসএস ডেকাটুর: গাইডেড মিসাইলবাহী ডেস্ট্রয়ার।
৫. ইউএসএস পারসন্স: গাইডেড মিসাইলবাহী ডেস্ট্রয়ার।
৬. ইউএসএস বাউসেল (ডিডি-৮৪৫): গান ডেস্ট্রয়ার।
৭. ইউএসএস ওর্যাক (ডিডি-৮৪৫): গান ডেস্ট্রয়ার।
৮. ইউএসএস ম্যাককিন (ডিডি-৭৪৫): গান ডেস্ট্রয়ার।
৯. ইউএসএস অ্যান্ডারসন: গান ডেস্ট্রয়ার।
১০. ইউএসএস হ্যালিয়েকালা (এই-২৫): সামরিক রসদবাহী জাহাজ এবং একটি নিউক্লিয়ার-এ্যাটাক সাবমেরিন।

১০ ডিসেম্বর সপ্তম নৌ বহর মালাক্কা প্রণালীতে অবস্থান নেয়। ১ ডিসেম্বর রাশিয়ার ওয়াশিংটন প্রতিনিধিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার সাবধান করে দিয়ে বলেন, ‘আগামীকাল ভারতকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করাতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
জাহাজগুলো ১৪ ডিসেম্বর মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করে ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। আমেরিকা সরকার প্রচার করে যে পাকিস্তানি সৈন্যদের পাকিস্তানে ফেরায় সহায়তা করতে টাস্কফোর্স ৭৪ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া ও ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণে এই নৌবহর বঙ্গোপসাগরে অবস্থান নিতে সাহস করে নি। এই সময় ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ আইএনএস ভিকরান্ট বঙ্গোপসাগরে ন্যাভাল ব্লকেড দিয়ে রাখে। ‘টাস্কফোর্স ৭৪’ বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা দেওয়ার পর একদিনে চট্টগ্রাম বন্দরের সব জাহজ ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়ন আগে থেকেই সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে আসার আশঙ্কা করেছিল। তাই আগে থেকেই তারা ভারত মহাসাগরে শুভেচ্ছা সফরে একটি মাইন সুইপার জাহাজ, একটি ডেস্ট্রয়ার, একটি ব্যাটল ট্যাংক ক্যারিয়ার জাহাজ ও একটি সাবমেরিন মোতায়েন করে রেখেছিল। এছাড়া আরও একটি মাইন সুইপার জাহাজ ও একটি ডেস্ট্রয়ার ভারত মহাসাগরে এসে অবস্থান নেয়। সোভিয়েত সরকার ৬ টি জাহাজকেই বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি থাকার নির্দেশ দেয়। রাশিয়া থেকে ১ টি নিউক্লিয়ার বোমাবাহী মিসাইলসহ ব্যাটলক্রুজার ও একটি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
১০ ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরের দিকে অফিসিয়াল যাত্রা আরম্ভ করার পরে ১৩ ডিসেম্বর সোভিয়েত সরকার ঘোষণা দেয় সপ্তম নৌবহরকে ঠেকাতে তারা আগের জাহাজগুলোর সঙ্গে আরেকটি এন্টি-ক্যারিয়ার টাস্কফোর্স পাঠাচ্ছে যাতে আছে আরও একটি নিউক্লিয়ার বোমা বহনকারী মিজাইলসহ ব্যাটল ক্রুজার, একটি নিউক্লিয়ার গাইডেড মিজাইল সাবমেরিন, একটি নিউক্লিয়ার এ্যাটাক সাবমেরিন এবং একটি ডেস্ট্রয়ার।
১৫ ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহরের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধজাহাজ নিয়োগ করে। এই দিন ২০টি সোভিয়েত রণতরী ভারত মহাসাগরে অবস্থান নেয়। এরপর সপ্তম নৌবহর যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে এবং আমেরিকা সপ্তম নৌবহর ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্নসমর্পনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের পরে যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকার অবস্থান একা হয়ে পড়ে। এসময় যুদ্ধ বাধলে পাকিস্তানের যোগদানের কোনও রূপ সুযোগ ছিল না। কাছাকাছি ২০টি সোভিয়েত জাহাজ তো ছিলই। তার ওপর একটি গুজব শোনা যায় প্রথম থেকেই যে একটি সোভিয়েত নিউক্লিয়ার এ্যাটাক সাবমেরিন এন্টারপ্রাইজের পিছে আসছে।
১৮ ডিসেম্বর ‘টাস্কফোর্স ৭৪’ কে বঙ্গোপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে নেওয়া হয়। জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত সেখানেই নৌবহরটি অবস্থান করে। ৭ জানুয়ারির পর ‘টাস্কফোর্স ৭৪’কে পুনরায় ভিয়েতনাম যুদ্ধে ফেরত পাঠানো হয়।

সপ্তম নৌ বহরের ইতিহাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডমিরাল আর্থার এস ‘চিপস্’ কারপেন্ডারের অধীনে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে ১৫ মার্চ ১৯৪৩ সালে সপ্তম নৌবহর গঠিত হয়। এটি ডগলাস ম্যাক আর্থারের অধীনে দক্ষিণ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (এসডব্লিউপিএ) নিয়োজিত ছিল। এছাড়াও সপ্তম নৌবহর কমান্ডার দক্ষিণ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (এসডব্লিউপিএ) যৌথ নৌবাহিনী বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রয়েল অস্ট্রেলীয় নৌবাহিনীর অধিকাংশ জাহাজ ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই নৌবহরের টাস্ক ফোর্স ৭৪ (পূর্বে আনজাক স্কোয়াড্রন) এর অধীনে ছিল। ব্যাটেল অব লিট গালফ ; ইতিহাসের বৃহত্তম নৌযুদ্ধের সময় সপ্তম নৌবহর অ্যাডমিরাল টমাস সি কিনকেইড এর অধীনে যৌথ বাহিনীর নৌ শক্তির একটি বড় অংশ হিসেবে ছিল।
যুদ্ধের শেষে, সপ্তম নৌ বহর চীনের কিংডাও-তে তার হেডকোয়ার্ডার বা প্রধান ঘাঁটি স্থানান্তরিত করে। অপারেশন প্ল্যান ১৩-৪৫ এর অধীনে কিনকাইড ১৯৪৫ সালের ২৪ আগস্টে পশ্চিম প্রশান্তমহাসাগরীয় অপারেশনগুলো পরিচালনা করার জন্যে পাঁচটি প্রধান টাস্ক ফোর্স গঠন করেন।
‘টাস্ক ফোর্স ৭১’ ৭৫ টি জাহাজ অন্তর্ভুক্ত করে উত্তর চীনে, ‘টাস্ক ফোর্স ৭২’ দ্রুততম ক্যারিয়ার ফোর্স হিসেবে মেরিন ফোর্সকে এয়ার কভার প্রদান ও কমিউনিস্ট বাহিনীর অপারেশনকে বাধা প্রদান, ‘টাস্ক ফোর্স ৭৩’ ৭৫টি জাহাজ যুক্ত ইয়াংটিজে পেট্রোল ফোর্স, ‘টাস্ক ফোর্স ৭৪’ দক্ষিণ চাইনিজ এরিয়া ফোর্স হিসেবে জাপানি ও চায়নার সৈন্যদের পরিবহনে বাধা প্রদান করতে এবং ‘টাস্ক ফোর্স ৭৮’ উভচর ফোর্স হিসেবে চাইনিজ নৌ বাহিনীর উভচর বাহিনীর (তৃতীয় মেরিন অ্যাম্ফিবিউয়াস) চলাচলকে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়।
যুদ্ধ শেষে ১ জানুয়ারি ১৯৪৭ সালে নৌ বহরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌ বাহিনী। পরবর্তিতে নৌবহরটি তার প্রাধান অপারেশনাল বেইজ ফিলিপিনে সরিয়ে নেয় যেখানে নৌ বাহিনী সুবিক বে তাদের নৌ ফেসিলিটির উন্নয়ন ঘটায় আর স্টেগলি পয়েন্টে তাদের এয়ারফিল্ড সরিয়ে নেয়।
শান্তিকালীন নৌবহরের অপারেশনাল কমান্ড প্রদান করতেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় বহরের কমান্ডার এডমিরাল আর্থার ই রেডফোর্ড, কিন্ত জাপানি সীমায় কিংবা অন্য কোনও জরুরি অপারেশনে নেভাল ফোর্স ফার ইস্ট এর অধীনে জেনারেল ডগলাস ম্যাক আর্থারের অধীনে অপারেশন পরিচালিত হত।
১৯৪৯ সালের ১৯ আগস্ট নৌবহরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেভেন্থ টাস্ক ফ্লিট বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম টাস্ক নৌবহর হিসেবে নাম প্রদান করা হয়। ১৯৫০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কোরিয়ান যুদ্ধের পূর্বে একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর হিসেবে নাম প্রদান করা হয়। যা আজও সপ্তম নৌবহর হিসেবে পরিচয় লাভ করে আছে।
যেসব যুদ্ধে অংশ নেয় সপ্তম নৌ বহর –
কোরিয় যুদ্ধ:
দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার তিন বছরের অধিক সময় ধরে (২৫ জুন ১৯৫০ – ২৭ জুলাই ১৯৫৩) সংঘটিত হওয়া একটি আঞ্চলিক সামরিক যুদ্ধ যা ইতিহাসে কোরিয় যুদ্ধ নামে পরিচিত। উত্তর কোরিয়ার পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে জাতিসংঘের সন্মতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য কয়েকটি দেশ প্রত্যক্ষভাবে এই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল।
১৯৫৩ সালে কোরিয় যুদ্ধ শেষ হলেও এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনও চুক্তি হয় নি। জাতিসংঘ বাহিনীর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয় সেনাবাহিনী ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে ওই যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই যুদ্ধে আড়াই থেকে তিন মিলিয়ন মানুষ হতাহত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
কোরিয় যুদ্ধে প্রাধান অপারেশনগুলোতে সপ্তম নৌ বহরের ইউনিটগুলো অংশগ্রহণ করেছিল। যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রথম নৌ জেটটি ৩ জুলাই ১৯৫০ সালে টাস্ক ফোর্স ৭৭ (টিএফ ৭৭) বিমান ক্যারিয়ার থেকে যাত্রা শুরু করে। কোরিয়ার ইংছনে ল্যান্ড করা প্রথম অপারেশনটি সপ্তম নৌবহরের উভচর জাহাজ থেকে পরিচালিত হয়।
যুদ্ধ জাহাজ লুয়া, নিউ জার্সি, মৌশোরি এবং উইসকনচিং কোরিয় যুদ্ধের সময় সপ্তম নৌ বহরের অধীনে যুদ্ধ করে। যুদ্ধের সময় এয়ার উইং ওয়ান ও এয়ার উইং সিক্স মেরিটাম পেট্রোল ফোর্স হিসেবে টাস্ক ফোর্স ৭০, টাস্ক ফোর্স ৭২ ফর্মজা প্রনালী প্যাট্রোল ইউনিট , টাস্কফোর্স ৭৭ এবং সাহায্যকারী স্কোয়াড্রন হিসেবে টাস্ক ফোর্স ৭৯ সপ্তম নৌ বহরের অধীনে যুদ্ধ করে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ:
পৃথিবীর ইতিহাসে গণহত্যার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধকে। এ যুদ্ধ এখনও মানুষকে আন্দোলিত করে, শিহরিত করে আর শান্তির পথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও পরাশক্তি মানা হয় আমেরিকাকে। এই আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজিত হয়।
প্রায় দুই যুগ স্থায়ী এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় ভিয়েতনামের ৩০ লাখ লোক (নিহতের সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত আছে)। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮ হাজার সেনা নিহত হয়। আধুনিক পরাশক্তির কোনও দেশের জন্য তার সেনাদের এত বড় প্রাণহানির ঘটনা বিশ্বে এটিই প্রথম। এ ছাড়া পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি পক্ষে যুদ্ধ করে হেরে যাওয়ার নজিরও ভিয়েতনাম যুদ্ধ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সপ্তম নৌবহরকে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিশেষ করে এই নৌবহর থেকে পরিচালিত হত ভিয়েতনামের অভ্যন্তরে বিমান আক্রমণ। ভিয়েতনামের পাহাড়ি জঙ্গলময় অঞ্চলে সৈন্য সরবরাহ, সৈন্যদের রসদ যোগানো, সুনির্দিষ্টভাবে কোনও জায়গায় আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের প্রায় ১২ হাজার হেলিকপ্টার। অবশ্য প্রায় ৫ হাজার হেলিকপ্টার ভিয়েতনামি গেরিলারা ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য হেলিকপ্টার ছিল- হিউ : বেল ইউএইচ-১ ইরোকুইস, বেল এএইচ-১ কোবরা, বোয়িং সিএইচ-৪৬ সী-নাইট, বোয়িং সিএইচ-৪৭ শিনুক, সিকোরস্কি এইচ-৩৪ চকটাও, সিকোরস্কি এইচএইচ-৩ জলি গ্রিন জায়ান্ট, সিকোরস্কি সিএইচ-৫৩ সী-স্ট্যালিয়ন।
১৯৬৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সালিসবারী সাউন্ড নামে আমেরিকার একটি নৌ জাহাজ ভিয়েতনামের অভ্যন্তরে অপারেশন দিয়ে সপ্তম নৌ বহরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ শুরু হয়। অপারেশন ফ্লামিং ডার্ট নামে উত্তর ভিয়েনামী সৈন্যদের উপরে বোম্বিং করার জন্যে নৌ সাপোর্ট দিতে সালিসবারী কাজ করে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে টাস্ক ফোর্স ৭১, টাস্ক ফোর্স ৭৫, টাস্ক ফোর্স ৭৬, টাস্ক ফোর্স ৭৭, টাস্ক ফোর্স ৭৮ , টাস্ক ফোর্স ১১৬ ও ১১৭ অংশ গ্রহণ করে। যুদ্ধশেষে ১৯৭৫ সালে সপ্তম নৌ বহর দক্ষিণ ভিয়েতনামে রিফিউজি ইভাকোয়েটে অংশ গ্রহণ করে।
উপসাগরীয় যুদ্ধ:
উপসাগরীয় যুদ্ধের সূচনা হয় ২ আগস্ট, ১৯৯০ সালে। ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম নামে সমধিক পরিচিত এই যুদ্ধের সংঘটিত হয় ইরাক এবং ৩৪টি দেশের জাতিসংঘ অনুমোদিত যৌথ বাহিনীর মধ্যে। ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট ইরাকের সেনাবাহিনীর কুয়েত দখল করা দিয়ে যুদ্ধের শুরু হয়। ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে ইরাকের কুয়েত আগ্রাসন এবং কুয়েতি ভূ-খন্ড দখলের প্রেক্ষিতে ইরাকি বাহিনীর হাত থেকে কুয়েতকে মুক্ত করাই ছিল এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য। যুক্তরাস্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ সৌদি আরবে সেনা মোতায়েন করেন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকেও তাদের সেনা পাঠাতে অনুরোধ করেন।
১৯৯০ সালের আগস্টে কুয়েতের বিরুদ্ধে ইরাকী আগ্রাসনের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ. বুশ সপ্তম নৌ বহরকে নিয়োগ দেন। বহরের কমান্ডার তাৎক্ষণিক জাপানের ইয়াংসোকা থেকে পারস্য উপসাগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করে। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম ও অপারেশন ডেজার্ট শীল্ডের আওতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকান সেন্ট্রাল নৌ কমান্ড অংশগ্রহণ করে। উপসাগরীয় যুদ্ধে ১৩০ টির মত মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ ও ৫০ টির মত যৌথ বাহিনীর যুদ্ধে জাহাজ অংশ গ্রহণ করে। মাইন অপসারণ, মেরিটাইম অপারেশন ও যুদ্ধকালীন অপারেশনে জাহাজগুলো অংশগ্রহণ করে।
নৌ সেন্ট্রাল কমান্ড ছয়টি এয়ার ক্র্যাফট ক্যারিয়ার, দুইটি ব্যাটলশিপ, দুটি নৌ হসপিটাল জাহাজ, ৩১ টি উভচর এসাল্ট জাহাজ, চারটি মাইন অপসারণ ভেসেল এবং আরও বেশ কিছু যুদ্ধ জাহাজ যৌথ বাহিনীর এয়ার ও গ্রাউন্ড ফোর্সের সাহায্যের জন্যে নিয়োজিত করে। উপসাগরীয় যুদ্ধের পরে পুনরায় সপ্তম নৌবহর তার নির্ধারিত স্থানে ফেরত যায়।
গ্রন্থনা: আনিসুজ্জামান মুহাম্মদ



